অ্যাকর্ড রাখতে চাপ বাড়ছে

0
30

ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত প্রাথমিকভাবে সমর্থন করেনি বাংলাদেশ সরকার ও তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। তবে এইচঅ্যান্ডএম, প্রাইমার্ক, সিঅ্যান্ডএ, অ্যাডিডাসসহ ৪৬টি ব্র্যান্ড ইতিমধ্যে অ্যাকর্ডের পরবর্তী সংস্করণে স্বাক্ষর করেছে। বাকি ব্র্যান্ডদের স্বাক্ষর করতে চাপ দিচ্ছে শ্রম অধিকার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক তিন জোট গ্লোবাল ইউনিয়ন, ইন্ডাস্ট্রিঅল ও ইউএনআই।
বিজিএমইএর একাধিক নেতা বলছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে অ্যাকর্ডের কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার পক্ষে চাপ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে আগামী বছরই জোটের কার্যক্রম বন্ধ করা সহজ হবে না, বরং জোটটির বিষয়ে চিন্তাভাবনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় পোশাক রপ্তানি হুমকির মধ্যে পড়তে পারে। কারণ অ্যাকর্ডের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ আছে ২০০-এর বেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান।
অ্যাকর্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবে ব্র্যান্ডগুলোকে স্বাক্ষর করতে চাপ দিচ্ছে গ্লোবাল ইউনিয়ন, ইন্ডাস্ট্রিঅল ও ইউএনআই। গত সপ্তাহে তারা এক বিবৃতিতে বলেছে, বাংলাদেশের পোশাক কারখানার ঝুঁকি চিহ্নিত ও প্রতিকারে অ্যাকর্ড হচ্ছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য সংস্থা।
ইন্ডাস্ট্রিঅল নিজেদের ওয়েবসাইটে জানিয়েছে, ৭ অক্টোবরের মধ্যে (বিশ্ব শোভন কাজের দিবস) অ্যাকর্ডের নতুন সংস্করণে স্বাক্ষর করতে চুক্তিবদ্ধ সব ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠানকে অনুরোধ করেছিল ইন্ডাস্ট্রিঅল ও ইউএনআই। তবে ২১৯ ব্র্যান্ডের মধ্যে এখন পর্যন্ত স্বাক্ষর করেছে ৪৬টি।
ইউএনআইয়ের ডেপুটি জেনারেল সেক্রেটারি ক্রিস্টি হফম্যান গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে বলেছেন, অ্যাকর্ডের অগ্রগতি বন্ধ করে দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীন হবে। সাম্প্রতিক দুটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে অ্যাকর্ডের কার্যক্রম অব্যাহত রাখা ও আওতা বাড়ানো দরকার।
২০১৩ সালে সাভারের রানা প্লাজা ধসে এক হাজারের বেশি পোশাকশ্রমিক নিহত হন। এ ঘটনার পর পোশাকশিল্পের কর্মপরিবেশ উন্নয়নে ইউরোপীয় ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও উত্তর আমেরিকার ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্স গঠিত হয়। উভয় জোটই পাঁচ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ, যা আগামী বছরের মাঝামাঝিতে শেষ হবে। অ্যালায়েন্স জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের পর কার্যক্রম গোটাতে তারা সর্বোচ্চ ছয় মাস থাকবে। তবে অ্যাকর্ড ঘোষণা দিয়ে বলেছে, ২০২১ সালের ৩১ মে পর্যন্ত কার্যক্রম চালাবে তারা। জোটের এই মেয়াদ বৃদ্ধির নতুন সংস্করণটিকে ‘২০১৮ অ্যাকর্ড’ বলা হচ্ছে।
অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে একটি সমীক্ষা করবে। এ সময় তারা দেখবে বাংলাদেশ সরকারের কোনো প্রতিষ্ঠান জোটের কার্যক্রম পরিচালনা করার সক্ষমতা অর্জন করেছে কি না। তেমনটি হলে অ্যাকর্ড তার কার্যক্রম গোটাবে। অন্যথায় ২০২১ সালের মে মাসের পর অ্যাকর্ডের সময়সীমা আরও এক বছর পর্যন্ত বাড়বে। অ্যাকর্ডের নতুন সংস্করণ বাস্তবায়িত হলে পোশাক খাতের সরবরাহ ব্যবস্থায় থাকা সুতা, বস্ত্র, সরঞ্জাম ও মোড়কীকরণ পণ্য উৎপাদনের কারখানা পরিদর্শন ও কারখানার অভ্যন্তরে শ্রমিক সংগঠনের স্বাধীনতার বিষয়টি তদারকি করার অধিকার পাবে অ্যাকর্ড।
গত ২৮ জুন নতুন চুক্তির বিষয়ে ই-মেইল বার্তায় বিজিএমইএকে জানায় অ্যাকর্ড। পরে পাল্টা জবাবে বিজিএমইএর সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অ্যাকর্ডের সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়ায় সরকার ও পোশাক খাতসংশ্লিষ্টদের যুক্ত করতে হবে। একতরফা এগোতে চাইলে সমস্যার সৃষ্টি হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিজিএমইএর একজন নেতা গতকাল বলেন, কারখানার অগ্নি, বৈদ্যুতিক ও ভবনের কাঠামোগত ত্রুটি সংস্কারকাজে নতুন নতুন শর্ত আরোপ করায় অ্যাকর্ডের ওপর ক্ষুব্ধ পোশাকশিল্প মালিকেরা। অ্যালায়েন্স যে কারখানাকে নিরাপদ বলছে, অ্যাকর্ড সেটিকে ঝুঁকিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বন্ধ করে দিচ্ছে। সব মিলিয়ে অ্যাকর্ড পোশাকমালিকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে গেছে।
আগামী বছর অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্সকে বিদায় করে তাদের কার্যক্রম বুঝে নিতে ‘সম্মান’ নামে আলাদা প্ল্যাটফর্ম করার উদ্যোগ নেয় বিজিএমইএ। দেড় মাস আগেই উদ্যোগটির খসড়া পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে তারা। বিজিএমইএ সম্মানের মূল পরিকল্পনা করলেও বাস্তবায়ন করবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। উদ্যোগটি আন্তর্জাতিক মহলে গ্রহণযোগ্য করতে এটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বিদেশি ব্র্যান্ড ও ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান এবং শ্রমিক সংগঠনকে যুক্ত করা হবে বলে জানায় বিজিএমইএ।
এদিকে গত মাসে প্যারিসে বিজিএমইএর প্রতিনিধি ও অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটির সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। বৈঠকের পর বিজিএমইএ এক বিবৃতিতে বলেছে, সরকারের একটি সংস্থা অ্যাকর্ডের কার্যক্রম বুঝে নেওয়া পর্যন্ত জোট ও বিজিএমইএ একসঙ্গে কাজ করবে। সেই সংস্থা যতক্ষণ না বিভিন্ন শর্ত পরিপালন করতে পারছে, ততক্ষণ অ্যাকর্ড তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারবে।
জানতে চাইলে বিজিএমইএর সহসভাপতি মাহমুদ হাসান খান গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, চলতি সপ্তাহে অ্যাকর্ডের স্টিয়ারিং কমিটির সঙ্গে সরকার ও বিজিএমইএর পৃথক বৈঠক হবে। দুই বৈঠকে সংস্কার কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি অ্যাকর্ডের তিন বছর মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে।
আগামী বছরের পর অ্যাকর্ডের কার্যকর চালিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধির বিষয়ে মাহমুদ হাসান খান বলেন, যত বেশি ব্র্যান্ড স্বাক্ষর করবে, চাপ তত বাড়বে। তবে অ্যাকর্ড থাকবে কি থাকবে না সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার চাপাচাপিতেই ব্র্যান্ডগুলো অ্যাকর্ডের নতুন সংস্করণে স্বাক্ষর করেছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here