আজ ২৩ শর্ত মেনেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করবে বিএনপি

0
103

প্রায় দুই বছর পর আজ রোববার রাজধানীতে ব্যাপক শোডাউন করার প্রস্তুতি নিয়েছে বিএনপি। পুলিশের ২৩ শর্ত মেনেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দুপুর ২টায় সমাবেশ করবে দলটি। এতে রাজধানী ও আশপাশের জেলার বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীও যোগ দেবেন। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন দলের  চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সহায়ক সরকারের অধীনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য দ্রুত সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাবেন তিনি। পাশাপাশি দলের নেতাকর্মীদের সকল মতানৈক্য ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নির্বাচনের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাবেন বিএনপিপ্রধান। এদিকে পুলিশের শর্ত মেনে দলের নেতাকর্মীদের শান্তিপূর্ণভাবে দুপুরের মধ্যে সমাবেশস্থলে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপি হাইকমান্ড। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারির পাশাপাশি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও প্রস্তুত থাকবে। সমাবেশে কোনো বিশৃঙ্খলা হলে কঠোর হাতে মোকাবেলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে দলটি। এ পরিস্থিতিতে আজ সবার চোখ থাকবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে।

সমাবেশের অনুমতি পাওয়ার পর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের উদ্দেশে বলেন, সমাবেশে বাধা দিয়ে গণতান্ত্রিক যে পরিবেশ আছে তার বিঘ্ন ঘটাবেন না। উস্কানি দিয়ে কোনো সমস্যা তৈরি করবেন না। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ সফল করতে চান। তবে সমাবেশ বানচাল ও আতঙ্ক সৃষ্টি করতে বিভিন্ন স্থানে নেতাকর্মীদের বাড়ি ও বাসায় তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ অনেককে গ্রেফতার করছে বলেও অভিযোগ করেন বিএনপি মহাসচিব। তিনি বলেন, যত বাধাই আসুক, সমাবেশ সফল করবেন তারা। এ জন্য দলের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দেন মির্জা ফখরুল।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপি সমাবেশে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি করলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। তবে বিএনপির সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হলে সরকার সহযোগিতা করবে। বিএনপির আজকের সমাবেশ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, বিএনপির সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হওয়া দলটির আচরণের ওপর সব কিছু নির্ভর করবে। বিএনপি বিশৃঙ্খলা করলে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যা যা করণীয়, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তা করবে।

বিএনপি নেতারা দাবি করছেন, অনেক দিন পর রাজধানীতে বিএনপির এ সমাবেশকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঙ্গাভাব দেখা দিয়েছে। দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই সমাবেশকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা। সম্প্রতি বড় দুটি শোডাউন করেছে বিএনপি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর বিমানবন্দর থেকে বাসভবন পর্যন্ত রাস্তার দু’পাশে বিপুলসংখ্যক লোকসমাগম ঘটেছিল। কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের দেখতে যাওয়া-আসার পথেও রাস্তার দু’পাশে হাজার হাজার নেতাকর্মীর সমাগম ঘটে। পরপর দুটি শোডাউনের পর এবার রাজধানীতে বড় সমাবেশ ঘটিয়ে বিএনপি তাদের সাংগঠনিক ক্ষমতা ও জনপ্রিয়তা দেখাতে চায়।

সমাবেশ সফল করতে কয়েকদিন ধরে দফায় দফায় প্রস্তুতি সভা করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপি নেতারা। ঢাকাসহ আশপাশের জেলার নেতাদের সমাবেশে বিপুলসংখ্যক লোকসমাগম করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অবশ্য আগামী নির্বাচনে সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেক নেতা নিজ উদ্যোগেও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে নেতাকর্মীদের সমাবেশে এনে নিজের জনপ্রিয়তা দেখানোর চেষ্টা করছেন। গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক নেতাকর্মী ঢাকায় পৌঁছে গেছেন। রাত সাড়ে ১১টায় এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছিল। ঢাকা মহানগর বিএনপি দক্ষিণের সভাপতি হাবিব-উন-নবী খান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাসার প্রস্তুতির কাজ তদারকি করেন।

গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন খালেদা জিয়া : সূত্র জানায়, সমাবেশে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল যাতে অংশ নিতে পারে সরকারকে সেই পরামর্শ দেবেন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একতরফা নির্বাচনের ব্যবস্থা করলে সরকার জনগণের রোষানলে পড়বে বলেও হুঁশিয়ারি দেবেন তিনি। একই সঙ্গে খালেদা জিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানাবেন।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনার পাশাপাশি আগামীতে তারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারলে কী কী করবেন- সংক্ষেপে সে সব বিষয়ও তুলে ধরতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেন, শুধু জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস পালনই এই গণসমাবেশের মূল লক্ষ্য নয়। জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে আনা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য যে আন্দোলন ও এই আন্দোলনকে সুসংহত করার জন্য জনগণের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখবেন।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যদের মধ্যে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, দলের কেন্দ্রীয় নেতা আবদুল্লাহ আল নোমান, আহমেদ আজম খান, নিতাই রায় চৌধুরী, আতাউর রহমান ঢালী, রুহুল কবির রিজভী, খায়রুল কবির খোকন, হাবিব-উন-নবী খান সোহেল, হারুনুর রশীদ, ফজলুল হক মিলন, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানীসহ অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

যেসব শর্ত মানতে হবে : বিএনপিকে দেওয়া ২৩ শর্ত অনুযায়ী দুপুর ২টায় শুরু করে বিকেল ৫টার মধ্যে সমাবেশ শেষ করতে হবে। দুপুর ১২টা থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে ঢুকতে পারবেন। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসে- এমন কোনো ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শন করা যাবে না। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত আসতে পারে সে ধরনের বক্তব্য দেওয়া বা প্রচার করা যাবে না। উস্কানিমূলক কোনো বক্তব্য দেওয়া যাবে না। উস্কানিমূলক প্রচারপত্র বিলি করা যাবে না। সমাবেশে রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্য বা প্রচারপত্র বিলি বা এ ধরনের কর্মকাণ্ড চালানো যাবে না। আইন-শৃঙ্খলা পরিপন্থী বা জননিরাপত্তাবিরোধী কিছু করা যাবে না।

বিএনপিকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমাবেশস্থল ও আশপাশে সিসিটিভি বসাতে হবে। সমাবেশস্থলে ঢুকতে গেটে আর্চওয়ে বসাতে হবে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অঘ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পরিচয়পত্রসহ নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক থাকতে হবে। এ ছাড়া ব্যানার, ফেস্টুনের আড়ালে লাঠি বা রড বহন করা যাবে না। মিছিল নিয়েও সমাবেশে আসা যাবে না।

সমাবেশস্থলের নির্ধারিত স্থানের বাইরে জনসমাগম করা যাবে না। অনুমোদিত স্থানের বাইরে সাউন্ড বক্স বা মাইক ব্যবহার করা যাবে না। সমাবেশের নির্ধারিত সময়ের আগে উদ্যান বা আশপাশের রাস্তা-ফুটপাতে জড়ো হওয়া যাবে না। যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়, এমন কিছু করা যাবে না।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সমকালকে বলেন, সমাবেশ করে জনজীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না- বিএনপিকে সমাবেশের অনুমতিতেই সেই শর্ত দেওয়া হয়েছে। ডিএমপির এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সমাবেশের নামে বিশৃঙ্খলা হলে, নিরাপত্তা বিঘ্ন হলে পুলিশ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে। পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন এলাকায় যানজট হতে পারে। তবে তা সহনীয় রাখতে বিভিন্ন পয়েন্টে ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকবেন।

পুলিশের তল্লাশি ও গ্রেফতারের অভিযোগ :সমাবেশে ব্যাপক লোকসমাগম ঠেকাতে রাজধানীতে বিএনপি নেতাকর্মীদের বাসায় পুলিশ তল্লাশি চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দাবি করেন, অসংখ্য নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। শুক্রবার রাতে শাহজাহানপুরে স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের বাসা থেকে গণসমাবেশের প্রস্তুতি বৈঠকের পর বাসায় ফেরার পথে ২০ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তল্লাশির নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে গ্রেফতারকৃত নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবি জানান মির্জা ফখরুল। গতকাল শনিবার দুপুরে নয়াপল্টন দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ অভিযোগ করেন।

পরে গণমাধ্যমে এ প্রসঙ্গে একটি বিবৃতিও পাঠানো হয়। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি আতিক উল্লাহ আতিক, শ্রমিক দলের নেতা আবুল খায়ের খাজাসহ মহানগরীর বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডের প্রায় অর্ধশত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অনেক নেতাকর্মীর বাসা তল্লাশি ও ভাংচুর করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন- বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি ইউনুস মৃধা, নবী উল্লাহ নবী, সিরাজুল ইসলাম সিরাজ, সাংগঠনিক সম্পাদক তানভীর আহমেদ রবিন, যুবদল ঢাকা মহানগর উত্তরের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর হোসেন, সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা জামাল রিয়াদ, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তফা জামাল রিয়াদ, সহসাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম রাহিমী, যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ভিপি হানিফ, সাবেক কমিশনার আবদুল মজিদ, রমনা থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাজমুল হক মাসুম প্রমুখ। এদিকে পিরোজপুর জেলা বিএনপির সভাপতি গাজী নুরুজ্জামান বাবুল ঢাকায় আসার পর গতকাল রাতে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে বলে দাবি করেছে বিএনপি।

তবে বিএনপির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশ সদরদপ্তরের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, সমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির কাউকে গ্রেফতার বা বাসায় তল্লাশির নির্দেশনা নেই। পুরনো মামলায় হয়তো কেউ গ্রেফতার হতে পারেন।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here