উত্তর কোরিয়া এখন বিশ্বে এক সংকটের নাম

0
67

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান আছে পরমাণু বোমার আতঙ্কে। অন্যদিকে চীন, রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে উত্তর কোরিয়া হলো বিশ্বরাজনীতিতে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণের দাবার ঘুঁটি। সংকটের সমাধান যে পরাশক্তি করতে পারবে—এশিয়া ও বিশ্বের রাজনীতিতে একাধিপত্য বিস্তারের সুযোগও পাবে সে।

তবে এই ক্ষমতার লড়াই কিন্তু আজ থেকে শুরু হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সৃষ্টি হয় কোরিয়া। এর বছর খানেক পর তা ভাগ হয়ে যায়। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থনে আবির্ভূত হয় উত্তর কোরিয়া। আর যুক্তরাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় জন্ম হয় দক্ষিণ কোরিয়ার। ১৯৫০-এর দশকে দুই কোরিয়ার যুদ্ধ হয়। এরপর থেকে বিশ্বের দুই পরাশক্তির স্নায়ুযুদ্ধকালীন উত্তেজনার রেশ পড়ে দুই কোরিয়ার সম্পর্কে।

চীনের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার সম্পর্ক ঐতিহাসিক। দুই কোরিয়ার যুদ্ধের সময় একমাত্র চীনের সমর্থনের কারণেই গো-হারা হারতে হয়নি উত্তর কোরিয়াকে। সামরিক দিক থেকে চীনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্তর কোরিয়ার মৈত্রী সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্বের মধ্যে একমাত্র এই দেশটিকে রক্ষার ব্যাপারেই চুক্তিবদ্ধ চীন। এ দেশটির কারণেই এখনো টিকে আছে কিম জং-উনের দেশের অর্থনীতি এবং পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে বিনিয়োগ করতে পারছে। জাতিসংঘ উত্তর কোরিয়ার ওপর অত্যন্ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে চাইলেও চীনের আপত্তির কারণে তা করা যায়নি। ফলে দেশটির কয়লা ও তেল সরবরাহে বড়সড় কোনো বাধা আসেনি, চালু থেকেছে অর্থনীতির চাকা।

উত্তর কোরিয়ার পতাকাএক নজরে উত্তর কোরিয়া
রাজধানী: পিয়ংইয়ং
জনসংখ্যা: প্রায় আড়াই কোটি (জাতিসংঘের দেওয়া ২০১২ সালের হিসাব)
ভাষা: কোরিয়ান
গড় আয়ু: পুরুষদের ৬৬ বছর; নারীদের ৭২ বছর (জাতিসংঘের দেওয়া হিসাব)
মুদ্রা: ওন
সূত্র: বিবিসি

উত্তর কোরিয়ার জন্মই হয়েছিল তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ার প্রত্যক্ষ সমর্থনে। প্রতিষ্ঠাতা কিম ইল-সাং একসময় সোভিয়েত রেড আর্মির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। কোরীয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান হওয়ার পর সোভিয়েত ব্লকের সহযোগিতায় ১৯৪৮ সালে উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠায় নেতৃত্ব দেন তিনি। স্নায়ুযুদ্ধের সময় দেশটির ওপর সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রভাব ধরে রাখতে পারলেও জার্মানির বার্লিন দেয়াল পতনের পর তা কমে আসে। সোভিয়েত ব্লক ভেঙে যাওয়ায় রাশিয়ার পক্ষে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া সম্ভব হয়নি। সেই জায়গাটিই নিয়ে নেয় চীন। এখন আবার কোরীয় সংকটে নাক গলিয়ে আগের অবস্থা ফিরে পেতে চাইছে পুতিনের রাশিয়া।

উত্তর কোরিয়া নিয়ে এ দুই দেশের মাথাব্যথার কারণটি পুরোপুরি ভূরাজনৈতিক। উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত আছে চীন ও রাশিয়ার। তাই এশিয়ার ওই অঞ্চলে প্রাধান্য বিস্তারের জন্য উত্তর কোরিয়াকে বাগে আনা প্রয়োজন। রাশিয়া ও চীন—উভয়ই কিন্তু উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি-সংক্রান্ত নীতিকে সমর্থন করে না। পিয়ংইয়ংয়ের নীতির পরিবর্তন চায় এই দুই পরাশক্তি। এ জন্য সীমিতভাবে অর্থনৈতিক সহায়তা কর্মসূচিও চালু করার পক্ষে তারা। তবে তা করতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়ার রাজনীতিতে জায়গা ছেড়ে দিতে নারাজ চীন ও রাশিয়া।

সেনা সমাবেশে কিম জং উন। ছবি: এএফপিযেভাবে ক্ষমতায় কিম জং-উন
উত্তর কোরিয়ার জন্ম থেকেই সর্বোচ্চ নেতার পদে থাকছেন কিম বংশের উত্তরাধিকারীরা। প্রতিষ্ঠার পর দেশটির প্রথম সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন কিম ইল-সাং। এরপর ক্ষমতায় আসেন তাঁর ছেলে কিম জং-ইল। ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয় তাঁর। এরপর দেশটির সর্বেসর্বা হন কিম জং-ইলের ছেলে কিম জং-উন। তাঁর অধীনে উত্তর কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। একই সঙ্গে দেশটির পরমাণু কর্মসূচি-সংক্রান্ত কৌশলও আগ্রাসী হয়ে ওঠে। এ নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তিদের সঙ্গে শুরু হয় উত্তেজনা।

অন্যদিকে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমল থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এশিয়ায় নতুন চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করছে। নরমে-গরমে পরিস্থিতি সামলাতে চাইছে মার্কিন কর্তৃপক্ষ। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি চলছে মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে একের পর সামরিক মহড়া। কোরীয় উপদ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় বন্ধু হলো জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। এদের রক্ষা করতে গিয়ে ডলারও খরচ হচ্ছে বেশ।

যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক কার্ল শ্যুস্টার বলেন, ‘কমিউনিস্ট বিশ্বে আগে পরস্পরের প্রতিযোগী ছিল চীন ও রাশিয়া। ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে তারা সীমান্তে যুদ্ধও করেছে। এখন উত্তর কোরিয়া প্রশ্নেও এরা প্রতিযোগী। দুই দেশই এশিয়ার এই অঞ্চলে প্রভাবশালী হতে চাইছে।’

সংকটের সমাধান কী?
উত্তর কোরিয়া সংকটে অনেকেই চীনকে সমাধানের একমাত্র চাবিকাঠি মনে করেন। মনে রাখতে হবে, গত ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পর উত্তর কোরিয়া থেকে কয়লা আমদানি নিষিদ্ধ করেছিল চীন। এর কড়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছিল কিম জং-উনের সরকার। চীনকে সতর্ক করে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছিল, ‘উত্তর কোরিয়ার ধৈর্যের সীমা পরীক্ষার চেষ্টা না করাই ভালো।’

উইলসন সেন্টারের বিশেষজ্ঞ জেমস পারসন বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পসহ ওয়াশিংটনের লোকজন সাধারণভাবে মনে করে, বেইজিংয়ের একটি ফোন কলেই উত্তর কোরিয়ার সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু আদতে পরিস্থিতি তেমন নয়। চীনের পক্ষেও এত সহজে উত্তর কোরিয়াকে পোষ মানানো সম্ভব নয়।’
পারসনের মতে, উত্তর কোরিয়ার বর্তমান নেতৃত্বকে পছন্দ করে চীন। নিজেদের স্বার্থেই এই নেতৃত্বকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করবে তারা।

এখন মূলত নানামাত্রিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে উত্তর কোরিয়াকে বাগে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। দেশটিকে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে। কিন্তু সে ক্ষেত্রেও ভাবতে হবে, কোন জায়গায় কতটুকু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যায়। যুদ্ধ কোনোভাবেই এই সংকটের সমাধান নয়। ইউনিভার্সিটি অব ভারমন্টের কূটনৈতিক ও সামরিক ঐতিহাসিক মার্ক স্টোলার বলেন, ‘যুদ্ধ যদি নীতি হিসেবে গৃহীত হয়, তবে এটি কীভাবে শেষ হবে, তা নিয়ে কোনো পূর্বানুমান করা সম্ভব নয়।’

কোরীয় যুদ্ধের একটি মুহূর্ত। ছবি: এএফপিঐতিহাসিক মুহূর্ত
১৯৪৫: জাপানের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে কোরিয়া।
১৯৪৮: কোরিয়া ভাগ হলো। সৃষ্টি হলো উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার সমর্থনে ছিল তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৫০-৫৩: কোরীয় যুদ্ধ।
১৯৯৪: উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট কিম ইল-সংয়ের মৃত্যু। ক্ষমতায় আসেন তাঁর ছেলে কিম জং-ইল।
২০০২: উত্তর কোরিয়াকে ‘শয়তানের অক্ষরেখা’ বলে অভিহিত করে যুক্তরাষ্ট্র। শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার দশকব্যাপী দ্বন্দ্ব।

 

পলিটিকোর সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, উত্তর কোরিয়াকে শুধু এক কোনায় না পাঠিয়ে, বরং বিষয়টি আরও বৃহৎ দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। পারমাণবিক অস্ত্র বৈশ্বিক নিরাপত্তায় যে সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে, সেটিকে সামনে নিয়ে আসতে হবে।

অর্থাৎ কোরীয় সংকট শুধু পরাশক্তিদের শক্তি প্রদর্শনের জায়গা হলে চলবে না। বৈশ্বিক নিরাপত্তার সংকটের প্রশ্নে চীন, রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রকে এক হতে হবে এবং একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু অস্ত্রের কর্মসূচি থেকে সরিয়ে আনতে হবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় হতে হবে। তা না হলে ‘কিন্ডারগার্টেনের শিশুদের ঝগড়া’ দেখে যাওয়া ছাড়া গত্যন্তর নেই।

পলিটিকো, সিএনএন, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও বিবিসি অবলম্বনে অর্ণব সান্যাল

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here