এক আসনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপনির্বাচন

0
74
এক আসনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপনির্বাচন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এখনো কয়েক মাস বাকি। তার আগেই এক আসনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে উপনির্বাচন। উপনির্বাচন করতে প্রস্তুত রাজনৈতিক দল ও সম্ভাব্য প্রার্থীরা। চলতি ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তার পরও গাইবান্ধার সর্বত্র এখন নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। শহর-বন্দর হাট-বাজারে এখনই নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দলকে সংগঠিত করার জন্য নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছেন। দলীয় সদস্য সংগ্রহ এবং পুরনো সদস্যদের নবায়ন করার মধ্য দিয়ে গোটা জেলায় সভা, সমাবেশ এবং কর্মী বৈঠকসহ ব্যাপক গণসংযোগ চলছে। গাইবান্ধা জেলায় সাতটি উপজেলা। কিন্তু সংসদীয় আসন সংখ্যা ৫টি। সুন্দরগঞ্জ উপজেলাকে কেন্দ্র করে গঠিত হয়েছে গাইবান্ধা-১ আসন। একসময় এ আসনটি জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত হলেও এখন এ আসন রয়েছে আওয়ামী লীগের দখলে। পর পর দুই আওয়ামী লীগ এমপির মৃত্যুর কারণে বর্তমানে এ আসনটি শূন্য রয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন আগামী ১৩ মার্চ উপনির্বাচন করার তফসিল ঘোষণা করেছেন।

২০০১ সালে অর্থাৎ ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন চারদলীয় জোটের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মওলানা আব্দুল আজিজ। অপর ৫টি নির্বাচনে এমপি পদে বিজয়ী হয়েছিলেন জাতীয় পার্টির হাফিজুর রহমান প্রামাণিক ৩ বার, ওয়াহেদুজ্জামান সরকার ১ বার এবং অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. মো. আব্দুল কাদের খান ১ বার। এ কারণে এ আসনটিকে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তবে ২০০১ সালে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ায় সাংগঠনিকভাবে এখানে জামায়াত শক্তিশালী অবস্থানে যায়। গোটা উপজেলায় জামায়াতের ব্যাপক প্রভাব বৃদ্ধি পায়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ওই দলের কেন্দ্রীয় নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির আদেশ ঘোষিত হলে গোটা সুন্দরগঞ্জ জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবে তছনছ হয়ে যায়। ওই ঘটনায় সারাদেশে সুন্দরগঞ্জকে পরিচিতি এনে দেয়। পরবর্তী সময়ে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর শিশু সৌরভের পায়ে গুলি করার দায়ে গ্রেফতার হওয়ার ঘটনায় সুন্দরগঞ্জ আরো আলোচনায় উঠে আসে সারাদেশে।

একটি পৌরসভা ও ১৫ ইউনিয়ন নিয়ে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) সংসদীয় আসন গঠিত। এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা গত দু’মাস আগের তথ্য অনুযায়ী ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২৬ জন। স্বাধীনতা পরবর্তী ১৯৭৩ সালে দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী অ্যাডভোকেট মো. শামসুল হক সরকার নির্বাচিত হন। এরপর আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ আসনে বিজয়ী হতে পারেননি। দীর্ঘ সময় এ আসনটি জামায়াত ও জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির বহুল আলোচিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টি প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ডা. আব্দুল কাদের খানকে পরাজিত করে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হলে তার শূন্য আসনে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক প্রবীণ নেতা গোলাম মোস্তফা আহমেদ। তিনিও এক সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হন এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের হাফ ডজন সম্ভাব্য প্রার্থী দলের মনোনয়ন পেতে এখন থেকেই জেলা এবং কেন্দ্রীয় পর্যায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। এমপি গোলাম মোস্তফা আহমেদ নিহত হওয়ার পর এখন আসনটিতে উপনির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা দলের মনোনয়ন পেতে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। বর্তমান পৌর মেয়র উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন উপনির্বাচনে প্রার্থী হতে জোর লবিং করছেন।

এ ছাড়া জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দা মাসুদা খাজা আওয়ামী লীগের তালিকার প্রথম সারিতে রয়েছেন। মরহুম গোলাম মোস্তফা উপনির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে এলাকার উন্নয়নে বিদ্যুৎ লাইন সম্প্রসারণ, সড়ক পাকাকরণ ও ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একাডেমিক ভবন নির্মাণ, নদী শাসন, তিস্তা সেতু নির্মাণে কাজ দ্রুত বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। অল্প কয়েক মাসে তিনি এলাকার বেশ উন্নয়নে সাড়া ফেলেছিলেন। বর্তমানে পৌর মেয়র উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সৈয়দা মাসুদা খাজা ছাড়াও ওই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশাীদের মধ্যে অন্যতম রয়েছেন নিহত এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনের স্ত্রী জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খুরশীদ জাহান স্মৃতি। তিনি স্বামীর সহচর হিসেবে রাজনৈতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন। ভোটাররা তার পরিচিত। তিনি স্বামীর অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে দলীয় মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। অপরদিকে এমপি লিটনের বড় বোন আনন্দ গ্রুপ অব কোম্পানিজ অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আফরোজা বারীও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী। তিনি ভাইয়ের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে চান। উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম, উপজেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ভালোবাসি সুন্দরগঞ্জ’ সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি রেজাউল আলম রেজা ও সুন্দরগঞ্জ ডিডব্লিউ ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ দলের সাবেক উপজেলা সহসভাপতি আব্দুল হান্নান এবং জেলা পরিষদ সদস্য এমদাদুল হক নাদিম দলের মনোনয়ন পেতে আগ্রহী। তবে মহাজোট হিসেবে নির্বাচনে গেলে অনেক হিসাব-নিকাশই পাল্টে যেতে পারে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

একসময়ে জাতীয় পার্টির দুর্গ হিসেবে পরিচিত সুন্দরগঞ্জ নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পরিচালনা পর্যদের ভাইস চেয়ারম্যান এবং জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আইন ও বিচার বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সংগঠনের উপজেলা সভাপতি ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী দলের একমাত্র মনোনয়ন প্রত্যাশী। এমপি লিটন নিহত হওয়ার পর অনুষ্ঠিত গত উপনির্বাচনে তিনি দলের প্রার্থী ছিলেন। সুন্দরগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে তিনি সরব। তিনি প্রথম নির্বাচনে এসেই ৬০ হাজার ২শ’ ভোট পেয়ে পরাজিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী গোলাম মোস্তফা আহমেদের কাছে।

তিনি বলেন, গত উপনির্বাচন ছিল জাল ভোটের কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। আগামী উপনির্বাচনে মহাজোটের কিংবা দলীয়ভাবে পৃথক নির্বাচনে জাপা প্রার্থী হিসেবে এই তরুণ আইনজীবী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। শামীম পাটোয়ারী বলেন, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে তার বিজয় সুনিশ্চিত। পারিবারিকভাবে ঢাকা, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা ছাড়াও তাদের ২৮টি দাতব্য প্রতিষ্ঠান জনগণের সেবায় কাজ করছে। দলের মুখপাত্র হিসেবে শামীম পাটোয়ারী বিভিন্ন চ্যানেলে টক শো’তে অংশ নিচ্ছেন। এ কারণে ভোটারদের কাছে তিনি অতি পরিচিত মুখ।

এ আসনে বিএনপি কখনোই শক্তিশালী অবস্থানে ছিল না। এখনো সাংগঠনিকভাবে দুর্বল। এ আসনে তাই বিএনপি অনেকটাই জোট নির্ভর। তবে হঠাৎ করে আসটি শূন্য হওয়ায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগেই এ উপনির্বাচনী হাওয়া ওঠায় নড়েচড়ে উঠেছেন দলের নেতাকর্মীরা। তারা দল গোছাতে এখন ব্যস্ত। ২০ দলের জোটই নির্ধারণ করবে কোন দলের প্রার্থী এখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। তার পরও বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় পর্যায়ে তৎপরতা শুরু করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি বর্তমানে জেলা সহসভাপতি ও সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম এবং বর্তমান উপজেলা সভাপতি ও হরিপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোজাহারুল ইসলাম। তারা সাংগঠনিক তৎপরতার পাশাপাশি জনসংযোগও চালিয়ে যাচ্ছেন।

জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিশেষ আদালতে ফাঁসির আদেশের পর সুন্দরগঞ্জে জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডবের ঘটনায় সরকার কঠোর অবস্থানে যায়। এ কারণে মামলা এবং গ্রেফতার আতংকে জামায়াত এখানে এখন কোণঠাসা। নেতাকর্মীদের প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম নেই। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের কঠোর দণ্ড হওয়ায় নেতাকর্মীদের অনেকেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তাদের অধিকাংশই রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। তবে এ উপনির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ডামাডোল শুরু হওয়ায় সুন্দরগঞ্জে জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে তার কিছুটা প্রভাব পড়েছে। তবে তাদের কার্যক্রম একেবারে নীরবে। তারা নিজস্ব প্রার্থী হিসেবে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান মো. মাজেদুর রহমানের নাম মাঠে-ময়দানে ছড়িয়ে দিয়েছে। ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে মাজেদুর রহমানকেই তারা চায়। এ জন্য জোটে চাপ সৃষ্টি করবে বলে জানা গেছে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে- এবারে উপনির্বাচনে জোটবদ্ধভাবে ভোট নাও হতে পারে। তবে আগামী একাদশ নির্বাচনে মহাজোট ও এবং ২০ দলীয় জোটের মধ্যেই প্রার্থিতা নির্ধারণ হতে পারে। জোটবদ্ধভাবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামবেন দু’পক্ষ। এটাই ধারণা সবার।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here