কাগজে কলমে আইন আছে ঠিকই সেই সাথে আছে শিশুর ঘাড়ে বইয়ের বোঝা

0
139

‘এইভাবে হাতে পায়ে ধরে যদি অধিদফতর কাউকে অনুরোধ করে তাহলে কোনদিনই তা কেউ মানবেনা। কোন স্কুল কর্তৃপক্ষই শিশুদের ঘাড়ে চাপিয়ে বইয়ের বোঝা কমাবেনা। প্রায় এক মাস হয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত সরকারের অনুরোধ অনুসারে কোন স্কুলেই গবর্নিং বডি বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ শিশুদের ওপর চাপিয়ে দেয়া অতিরিক্ত বই কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে আমরা শুনিনি। আমাদের বিদ্যালয় পরিচালনা করেন সরকারী কর্মকর্তারা, তার পরেও নেই কোন উদ্যোগ’

সরকারী অনুমোদনহীন বই ও শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিপত্র জারির প্রায় একমাস পরেও এই হতাশা ও ক্ষোভ নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজধানীর বিয়াম স্কুল এ্যান্ড কলেজের শিশু শিক্ষার্থী মিথিলার মা রাশিদা খাতুনের। হতাশার কারণ একটাই। আর তা হলো, সরকারী সংস্থার দুর্বল অবস্থানের কারণেই স্কুল কর্তৃপক্ষের অমানবিক ও অবৈধ কর্মকান্ড থেকে রক্ষা পাচ্ছেনা শিশুরা। এ অভিভাবকের অভিযোগ, অধিদফতর যেভাবে নামকাওয়াস্তে অনুরোধ করেছে তা কোন দিনই কেউ আমলে নেবেনা। রবিবার সকালে বিয়াম স্কুলের সামনে বসে এ অভিভাবকের সঙ্গে যখন কথা হচ্ছিল তখন পাশে দাঁড়ানো সকল অভিভাবকই একের পর এক অভিযোগ তুলছিলেন প্রতিষ্ঠানের চাপিয়ে দেয়া নানা অবৈধ ও অমানবিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে। প্রত্যেকেই দাবি তুলেছেন, নামকাওয়াস্তে অনুরোধ না করে সরকার যেন শিশুদের ওপর অনুমোদনহীন বইয়ের বোঝা কমানোর জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেয়। কেবল এ অভিভাবকই নয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেল, কোন প্রতিষ্ঠানেই অধিদফতরের গত ১০ অক্টোবরের পরিপত্র জারির পর আজ পর্যন্ত বইয়ের বিষয়ে কোন পরিবর্তন আসেনি।

অভিযোগ থেকে মুক্ত নয় রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এ্যান্ড কলেজ, মতিঝিল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজ, মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় এ্যান্ড কলেজ থেকে শুরু করে কোন প্রতিষ্ঠানই। অনেক প্রতিষ্ঠানই লাখ লাখ টাকা নিয়ে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে নিচ্ছে ৫ থেকে ৮টি করে সহায়ক বই। ফলে অনেক শিশুর জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের বইয়ের থেকে অনুমোদনহীন বইয়ের সংখ্যা হচ্ছে বেশি। ইংলিশ মিডিয়ামে চলছে রীতিমতো নৈরাজ্য। সরকারী টাকা নেয়া হয়না কিংবা সরকারের কোন নীতিমালা নেই এই ছুঁতো দিয়ে এখানে চলছে অরাজকতা। যেখানেই অভিভাবকরা স্কুল কর্তৃপক্ষের কাছে যাচ্ছেন সেখানেই বলে দেয়া হচ্ছে, সরকার কোন নিয়ম করে দেয়নি যে নতুন কিছু করতে হবে।

এদিকে কঠোর কোন নিষেধাজ্ঞা না দেয়ায় সরকারের নতুন উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সন্দিহান দেশের শিক্ষাবিদরাও। এমনকি অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষকরাও শিশুদের ওপর অবৈধ বইয়ের বোঝা কমাতে কঠোর এ্যাকশন নেয়ার দাবি জানিয়ে বলেছেন, কঠোর আদেশ নিয়ে তা কার্যকরের উদ্যোগ না নিলে কেউ কথা শুনবেনা। কারণ কেউ যেমন অনুরোধ আমলে নিচ্ছেনা, তেমনি অবৈধ বই বাদ দিয়ে অসাধু প্রকাশনা থেকে নেয়া লাখ লাখ টাকাও হাতছাড়া করতে চাননা। যারা শিশুদের ওপর অনুমোদনহীন বই চাপায়, সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা না দিয়ে শিশুরা কোনভাবেই এ সঙ্কট থেকে রক্ষা পাবেনা বলে আশঙ্কা শিক্ষাবিদ, শিক্ষক ও অভিভাবকদের।

প্রাথমিক অধিদফতরের অনুরোধের ২৫ দিনের মাথায় রবিবার রাজধানীর মতিঝিল মডেল স্কুল এ্যান্ড কলেজে গিয়ে দেখা গেল, প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণীর শিশুদের ওপর ঠিকই আছে সেই বিশাল বইয়ের বোঝা। প্রত্যেকের কাছেই অতিরিক্ত ২ থেকে ৪টি বই। সঙ্গে আছে আরও শিক্ষা উপকরণ, প্রত্যেক বিষয়ের জন্য আছে খাতা, পানির বোতল, খাবারের জন্য বক্সতো আছেই। সব মিলিয়ে বিশাল এক ব্যাগ নিয়ে ক্লাসে আসছে শিশুরা।

প্রথম শ্রেণীর এক শিশুর বাবা নাম প্রকাশ না শর্তে বলছিলেন, সরকার একটি আদেশ দিয়েছে আমরা শুনেছি। এক মাস হয়ে গেল কিন্তু কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে কিছু ভাবতেই রাজি নয়। গবর্নিং বডির সভাপতি আওলাদ হোসেন বা অধ্যক্ষকে এ বিষয়ে কিছু বলাই যাচ্ছেনা। তারা মানতেই রাজি নন এসব কথা। অভিভাবকরা অভিযোগ করলেন, এখানে দুটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত ১০ লাখ টাকা নিয়ে প্রত্যেক শ্রেণীকে অনুমোদনহীন বই পাঠ্য করা হয়েছে। এখন এসব বই শিশুরা কিনতে বাধ্য।

নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাজধানীর ভিকারুন নিসা নূনও এনসিটিবির বইয়ের বাইরের বই পড়ানোর অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। সংখ্যা একটু কম হলেও শিশুদের সহায়ক এ বই পড়তে বলা হচ্ছে। কয়েকজন শিক্ষক এখানে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে বই নিয়ে ক্লাসে সে বই কিনতে বলছেন। সামনের বইয়ের দোকানে সে বই রাখাও থাকে বলে বলছেন অভিভাবকরা। এ বিষয়ে অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌসের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি। তবে গবর্নিং বডির সভাপতি গোলাম আশরাফ তালুকদার জনকণ্ঠকে বলেন, আমরা শিক্ষা নীতি মেনে শিক্ষা কার্যক্রম অবশ্যই পরিচালনা করব। কোনভাবেই কোন অনুমোদনহীন বই বা উপকরণ থাকতে পারবেনা। যদি এ ধরনের কোন বই থেকে থাকে, তবে অবশ্যই দ্রুত আমরা সে বিষয়ে পদক্ষেপ নেব।

শিশুদের ঘাড়ে অসংখ্য বইয়ের বোঝা নিয়ে নানামুখী সমালোচনা হচ্ছে বহুদিন ধরে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের মতো বইয়ের বোঝা সামলাতে গিয়ে শিশুর মৃত্যুবরণের মতো ঘটনা না ঘটলেও যুগের পর যুগ শিশু ও তার মা-বাবার উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে বিদ্যালয় থেকে চাপিয়ে দেয়া অসংখ্য বই ও শিক্ষা উপকরণ। যার অধিকাংশই সরকার অনুমোদিত না হলেও শিশুদের পড়তে বাধ্য করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। আর এসব বই পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্তির বিনিময়ে শিক্ষক ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা নোট-গাইড বইয়ের প্রকাশকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

গত ১০ অক্টোবর আদালতের আদেশ, বছরের পর বছর ধরে শিক্ষার্থী অভিভাবক ও শিক্ষাবিদদের প্রতিবাদ উদ্বেগের পর সরকারী অনুমোদনহীন যে কোন বই ও শিক্ষা উপকরণ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপানোর বিষয়ে সতর্ক করে পরিপত্র জারি করেছিল প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতর। যেখানে অনেকটা অনুরোধের সুরেই বলা হয়েছে, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গামী শিশুদের জন্য যে সব বই অনুমোদন করেছে তা পরিবহনে কোন ছেলে-মেয়েদের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। যে সব ছাত্রছাত্রী ব্যাগে বই বহন করে বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়া করে হাইকোর্টের রায় অনুযায়ী এর ওজন যাতে বিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত শিশুর ওজনের ১০ শতাংশের বেশি না হয় সে বিষয়ে সতর্ক হওয়া বাঞ্ছনীয়।’

সকলকে সতর্ক করে আদেশ দিলেও কঠোর কোন নিষেধাজ্ঞা না দেয়ায় সরকারের নতুন উদ্যোগ কতটুকু সফল হবে তা নিয়ে সন্দিহান শিক্ষাবিদ ও অভিভাবকরা। অধ্যক্ষরাও বলছেন একই কথা। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল এ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. শাহান আরা বেগম বলছিলেন, আসলে অনেকেই ব্যাগে অনেক পানি, খাবার নিয়েও ব্যাগ ভারি করে। তবে অনুমোদনহীন বই বন্ধ করা দরকার। এটা করতে হলে অবশ্যই শক্তভাবে সেটা বলতে হবে। অনুরোধ করলে কেউ শুনবেনা। আমরা কিছু না করলেও সরকার সাংবাদিকরা নানা কথা লেখেন। অথচ সরকারের নিয়ম না মেনে যারা এসব করছেন তাদের বিষয়ে শক্ত কিছু লেখা হয়না। নেয়া হয়না কঠোর পদক্ষেপও।

যারা শিশুদের ওপর অনুমোদনহীন বই চাপায় সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা না দিলে শিশুরা কোনভাবেই এ সঙ্কট থেকে রক্ষা পাবেনা বলে আশঙ্কা জাতীয় শিক্ষা নীতি প্রনয়ণ কমিটির সদস্য সচিব শিক্ষাবিদ অধ্যাপক শেখ ইকরামূল কবীরের। তিনি বলছিলেন, যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তা আরও কঠোরভাবে করলে ভাল হতো। না হয় ভাল কোন ফল হবেনা। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিশুদের বাঁচাতে হলে শিক্ষার মান বাড়াতে হবে, বইয়ের বোঝা কমাতে হবে। সেটা কীভাবে হবে তা খুঁজে বের করতে হবে সংশ্লিষ্টদেরই। স্কুল কর্তৃপক্ষকে বোঝাতে হবে। অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়া দরকার। এ ছাড়াও বিষয়টি বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ে মনিটরিং ব্যবস্থা জোরালো করতে হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here