চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে ব্লু হোয়েল

0
46

ব্লু হোয়েল ইন্টারনেট গেমের গেটওয়ে লিংক ও রাতে ইন্টারনেটের বিশেষ প্যাকেজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। ইন্টারনেটে মরণ খেলা ব্লু হোয়েল আসক্ত ঢাকায় এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর আরো অনেকে এতে আসক্ত বলে প্রমাণ বের হচ্ছে। এতে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। এই উদ্বেগের মধ্যে এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে উচ্চ আদালত তিনদফা নির্দেশনা দিয়েছে। রিট আবেদনের প্রাথমিক শুনানি করে গতকাল বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী এবং জে বি এম হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল এ নির্দেশনা দেন। আদেশে বলা হয়, ব্লু হোয়েল বা এ জাতীয় ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা দানকারী’ ইন্টারনেট ভিত্তিক গেমের গেইটওয়ে লিংক ও অ্যাপ্লিকেশন বন্ধ করতে হবে। রাত ১২টার পর থেকে ভোর ৬টা পর্যন্ত দেশের সব মোবাইল অপারেটরের ‘রাত্রিকালীন বিশেষ ইন্টারনেট অফার’ ছয় মাসের জন্য বন্ধ থাকবে। ব্লু হোয়েলসহ এ জাতীয় ইন্টারনেট ভিত্তিক গেমে আসক্তদের চিহ্নিত করতে এবং প্রয়োজনীয় কাউন্সেলিং দিতে অভিজ্ঞদের নিয়ে একটি ‘মনিটরিং সেল’ গঠন করতে হবে। তথ্য মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগযোগ মন্ত্রণালয় এবং বিটিআরসিকে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে বলেছে আদালত। আদালতে রিটকারীর পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুহাম্মদ হুমাযুন কবির পল্লব; রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মোতাহার হোসেন সাজু। এদিকে উচ্চ আদালত থেকে এ নির্দেশনা আসার দিনে চট্টগ্রাম ও গাজীপুরে আরো দুই শিক্ষার্থী এই গেমের ফাঁদে পড়ার খবর এসেছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে মাস্টার্স পড়ুয়া ওই শিক্ষার্থী নিজের অঙ্গ কেটে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন।
ব্লু হোয়েল গেমের ‘ফাঁদে পড়ে আত্মহত্যাকারী’ রাজধানীর হলিক্রস স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী অপূর্বা বর্ধন স্বর্ণার (১৩) বাবা অ্যাডভোকেট সুব্রত বর্ধন, ব্যারিস্টার মোহাম্মদ কাওসার ও ব্যারিস্টার নূর আলম সিদ্দিক গত রোববার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এই রিট আবেদন করেন। আইনজীবী পল্লব বলেন, দেশের সব মোবাইল অপারেটরের রাত্রিকালীন বিশেষ ইন্টারনেট অফার কেন বন্ধের নির্দেশ দেয়া হবে না এবং বিপদজনক এসব ‘মারণখেলা’ ও সাইবার অপরাধ থেকে জনগণকে সচেতন ও সুরক্ষা দিতে কেন নীতিমালা করার নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা রুলে জানতে চেয়েছে আদালত। ডাক ও টেলিযোগাযোগ সচিব, বিটিআরসি চেয়ারম্যান, স্বরাষ্ট্রসচিব, শিক্ষাসচিব, সমাজকল্যাণ সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি সচিব, আইনসচিব, স্বাস্থ্যসচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল এবং মোবাইল অপারেটরদের চার সপ্তাহের মধ্যে এর জবাব দিতে বলা হয়েছে। আইনজীবী পল্লব শুনানিতে বলেন, যে তিনজন আইনজীবী এই রিট আবেদন করেছেন তাদের একজন মনে করেন, এই গেম খেলে যাদের মৃত্যু হয়েছে বা আত্মহত্যা করেছে, তাদের মধ্যে যেসব উপসর্গ ছিল, সেসব উপসর্গের সঙ্গে তার মেয়ের মৃত্যুর মিল রয়েছে। তখন আদালত জানতে চায়, সেই আইনজীবী কে। আদালতে উপস্থিত আইনজীবী সুব্রত বর্ধন এ সময় উঠে দাঁড়ালে বিচারক জানতে চান, তার মেয়ে কবে মারা গেছে, তার বয়স কত ছিল, কোন ক্লাসে পড়ত। সুব্রত বর্ধন তখন বলেন, তার মেয়ে স্বর্ণ মারা গেছে গত ৫ই অক্টোবর। ওর বয়স ছিল ১৪ বছর। হলিক্রস স্কুলে অষ্টম শ্রেণির ‘ফার্স্ট গার্ল’ ছিল। আইনজীবী সুব্রত বর্ধন তার মেয়ের একটি ছবি এ সময় আদালতে উপস্থাপন করেন।
ব্লু হোয়েল’ গেমে আত্মহত্যার খবর প্রকাশের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল গত সপ্তাহে বিটিআরসিকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় বিটিআরসি একটি বিজ্ঞপ্তি দেয়। ইন্টারনেটে ব্লু হোয়েল কিংবা এর মতো জীবনবিনাশী কোনো গেমের তথ্য পেলে ২৮৭২ নম্বরে ফোন করে তা জানাতে বলা হয় এতে।
চট্টগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ব্লু হোয়েল গেমের ফাঁদে পড়ে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার গুমানমর্দ্দন ইউনিয়নের বিল্লার বাড়ী এলাকার এক আমেরিকা প্রবাসীর ছেলে নিজের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে আত্মহত্যার চেষ্টা চালানোর তথ্য পাওয়া গেছে। গুরুতর আহত অবস্থায় রোববার রাতে তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন স্বজনরা। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ জহিরুল ইসলাম বলেন, পারিবারিক সম্মানের কথা ভেবে পরিবারের পক্ষ থেকে ঘটনাটি গোপন রাখার অনুরোধ আছে। এ কারণে আমরা তার নাম-পরিচয় প্রকাশ করছি না। তিনি জানান, আমেরিকা প্রবাসীর ওই ছেলে চট্টগ্রাম সিটি কলেজের মাস্টার্স পড়ুয়া শিক্ষার্থী। সে চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার পূর্বধলই সেকান্দর পাড়ায় নানার বাড়ি থেকে পড়ালেখা করত। হঠাৎ গত রোববার নিজের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে রক্তাক্ত অবস্থায় সে গুরুতর আহত হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় রোববার রাতেই তাকে প্রথমে হাটহাজারী উপজেলা সদরের একটি প্রাইভেট হাসপাতালে নেন স্বজনরা। পরে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে প্রেরণ করেন। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক। চমেক হাসপাতালের কর্তব্যরত চিকিৎসক জামান আহাম্মদ জানান, ছেলেটির অবস্থা গুরুতর। হাসপাতালে না আনলে এতক্ষণে সে নিশ্চিত মৃত্যুবরণ করত। ব্লু হোয়েল গেম খেলে সে এ কাণ্ড করেছে বলে জানিয়েছেন তার স্বজনরা। হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুম বলেন, ব্লু হোয়েল গেমের ১৭ ধাপ খেলে ওই শিক্ষার্থী নিজের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে রক্তাক্ত করেছে। সে এখন মৃত্যুপথযাত্রী। এর আগে বিভিন্ন ধাপে হাত কাটার চিহ্নও তার শরীরে রয়েছে। তিনি বলেন, ব্লু হোয়েলের ফাঁদে পড়ে নিজের লিঙ্গ ও অণ্ডকোষ কেটে ফেলার খবরে হাটহাজারী উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে তরুণ-তরুণী ও অভিভাবকদের এ ব্যাপারে সচেতন ও সতর্ক থাকার ওপর জোর দেন তিনি। এদিকে গত শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্লু হোয়েলে আসক্ত আরো এক শিক্ষার্থীকে পুলিশ হেফাজতে কাউন্সেলিং করার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ আখতারুজ্জামান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত দু’জন শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং এবং চার শিক্ষার্থীকে শনাক্ত করার কথা বললেও কারো নাম প্রকাশ করা হয়নি।
শ্রীপুর (গাজীপুর) প্রতিনিধি জানান, গাজীপুরের শ্রীপুরে ব্লু হোয়েল গেমে আসক্ত স্কুল শিক্ষার্থীর নাম রাকিব (১৪)। সে দারোগারচালা গ্রামের গাজীপুর মেরিডিয়ান স্কুলের ছাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। গতকাল সকালে স্কুলে এলে তার হাতে আঁকা রক্তাক্ত নীল তিমিসদৃশ ছবি দেখে শিক্ষকরা তাকে আটক করে পরিবারকে খবর দেন।
গাজীপুর মেরিডিয়ান স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেন জানান, সকাল থেকে রাকিব স্কুলে এসে ক্লাস করছিল। দুপুরের দিকে হঠাৎ তার সহপাঠীদের একজন রাকিবের হাতে কোনো কিছু আঁকা আছে দেখতে পেয়ে শিক্ষককে জানায়। পরে শিক্ষক তার শার্টের হাতা খুলে ডান হাতে রক্তাক্ত তিমির ছবি দেখতে পায়। এ সময় তার ব্যবহৃত মোবাইলে ধারালো ব্লেড দিয়ে কেটে কেটে তিমির ছবি আঁকার ২ মিনিট ১০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। ওই শিক্ষক আরো জানান, রাকিব কিছুদিন ধরে স্কুলে অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। অসুস্থতাসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে সে স্কুল থেকে বিভিন্ন সময় ছুটিও নেয়।
শিক্ষার্থী রাকিব জানায়, সে কিছুদিন আগে মোবাইলে একটি গেম ইনস্টল করেছিল। কিন্তু পরে তা কেটে দিয়েছে। গত রাতে কৌতূহলবশত সে তার হাতে তিমি মাছের ছবিটি এঁকেছে। পূর্বে ইনস্টল করা গেমে তাকে হাত কেটে তিমির ছবি আঁকতে বলা হয়েছিল বলে প্রথমে স্বীকার করলেও পরে তা অস্বীকার করে।
রাকিবের মা রাহিমা খাতুন বলেন, আমার ছেলে গেমে আসক্ত হয়ে গেছে তা আগে খেয়াল করিনি। আমি তার ঘরে খুব কম যাই। কিছুদিন ধরে সে আগের থেকে বেশি রাগারাগি করছে। সাধারণ বিষয় নিয়ে রাগ করে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করছে। যা এর আগে তার মধ্যে দেখিনি।
শ্রীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসাদুজ্জামান জানান, বিষয়টি জেনেছি। সে কোনো গেমে আসক্ত কি-না তা তদন্ত করে দেখা হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here