চিপ নির্মাতাগুলো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে

0
102

ওত পেতে রয়েছে ক্ষুধার্ত শিকারি। সুযোগ পেলেই গিলে ফেলবে। আবার দুর্বল হয়ে পড়লে নিজেকেই শিকার হয়ে যেতে হবে। বর্তমান চিপসেট বাজারের অবস্থা ঠিক এমনই এক বন্য দুনিয়ার মতো। এখানে যেকোনো সময় ঝোপ বুঝে কোপ মেরে বসতে পারে যেকোনো প্রতিষ্ঠান। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেমিকন্ডাক্টর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ব্রডকম তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী চিপ নির্মাতা কোয়ালকমকে ১০ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিময়ে অধিগ্রহণ করতে চেয়েছিল।

নাটকীয়ভাবেই ব্রডকমের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে কোয়ালকম। প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে কোয়ালকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘দুঃখিত, আমরা আপনাদের ধারণার চেয়েও বেশি মূল্যবান।’

এ চুক্তি সম্পন্ন হলে এটাই হতো প্রযুক্তি ইতিহাসে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে দামি অধিগ্রহণ।

চিপসেটের রাজ্যে কোয়ালকম ও ব্রডকম প্রতিদ্বন্দ্বী। দুই প্রতিষ্ঠানের প্রধান গ্রাহক মার্কিন প্রযুক্তিপণ্য নির্মাতা অ্যাপল। অবশ্য পেটেন্ট নিয়ে অনেক দিন ধরে দ্বন্দ্ব চলছে অ্যাপল ও কোয়ালকমের মধ্যে। অ্যাপলের ভবিষ্যৎ আইফোনগুলোতে কোয়ালকমের চিপসেট না থাকার গুঞ্জন রয়েছে। সে সুযোগ ব্রডকম হাতছাড়া করছে না। অ্যাপলের সঙ্গে তাদের সখ্য গড়ে উঠছে।

কোয়ালকম কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, অধিগ্রহণ প্রস্তাবের মাধ্যমে ব্রডকম তাদের অবমূল্যায়ন করেছে। অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আরও জটিলতা বাড়তে পারে, এমন ধারণায় ব্রডকমের প্রস্তাবে সাড়া দেয়নি। এদিকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ব্রডকম জানায়, অধিগ্রহণ বিষয়ে আলোচনার জন্য কোয়ালকমের ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে কথা বলার প্রস্তাব করেছিল তারা। তবে কোয়ালকম প্রথমে ইতিবাচক সাড়া দিলেও পরে প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।

আদতে আফ্রিকান তৃণভূমির মতোই সেমিকন্ডাক্টর শিল্পটি যেন জটিল এক চক্র মেনে চলছে। বিভিন্ন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান যেন পরস্পরকে শিকারের লক্ষ্য বানাচ্ছে। ব্রডকম যেমন কোয়ালকমকে শিকার করতে চাইছে, তেমনি কোয়ালকমও কিন্তু বসে নেই। তারা চাইছে নেদারল্যান্ডসের চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এনএক্সপিকে অধিগ্রহণ করে নিজেদের দাম বাড়াতে। ৪ হাজার ৭০০ কোটি মার্কিন ডলারে এনএক্সপিকে অধিগ্রহণ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এনএক্সপিও কম যায় না। অটোমোবাইল ও অন্যান্য যন্ত্রের জন্য চিপ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এনএক্সপি ২০১৫ সালে ফ্রিস্কেল নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করে ফেলেছে। সবাই সুযোগের অপেক্ষায়। শিকার পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়তে প্রস্তুত।

ঝানু শিকারি হিসেবে মনে করা হয় ব্রডকমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হক ট্যানকে। ২০১৫ সালে তিন হাজার ৭০০ মার্কিন ডলারে অ্যাভাগো নামের একটি প্রতিষ্ঠান অধিগ্রহণ করেন তিনি। এরপর তার নাম পরিবর্তন করে ব্রডকম করেছেন। অন্যান্য প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের মতো প্রচারের আলোতে আসেননি হক ট্যান। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বাইরে তাদের নাম খুব একটা শোনা যায় না। তবে ঝানু ব্যবসায়ী হিসেবে খ্যাতি রয়েছে তাঁর।

বাজার বিশ্লেষকেরা মনে করেন, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে সফলতা বিনিয়োগের ওপর অনেকটাই নির্ভর করে। তাই কোয়ালকমকে কিনে আধুনিক প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ব্রডকম। এটা করতে পারলে ব্রডকম সফল। বিশেষ করে ৫জি প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করতে চায় তারা। কোয়ালকম কিনে সে সুযোগ নিতে চাইছিল প্রতিষ্ঠানটি। আর কোয়ালকম যদি এনএক্সপিকে অধিগ্রহণ করতে পারে তবে ব্রডকমের জন্য তা ছিল সোনায় সোহাগা। বর্তমানে কানেকটিভিটি চিপ, ওয়াই-ফাই ও রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি চিপ তৈরি করে দুটি প্রতিষ্ঠান। একীভূত হলে ওয়াই-ফাই চিপের ক্ষেত্রে বাজারে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ তারা দখল করতে পারত তারা।

বাজার বিশ্লেষকেরা ব্রডকমের এ চুক্তিকে ভবিষ্যতের দ্রুত বর্ধনশীল এলাকাগুলোতে ব্রডকমের ঢোকার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। যেমন কানেকটেড ডিভাইস বা ইন্টারনেট অব থিংস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রভৃতি। কারণ, এসব ক্ষেত্রে আরেক চিপ নির্মাতা এনভিডিয়ার প্রাধান্য বেশি।

কোয়ালকমকে ধরতে পারলে স্মার্টফোনের বাজারে আধিপত্য বাড়াতে পারত ব্রডকম। প্রকৃতপক্ষে ট্যান চাইছিলেন বিশাল একটি কোম্পানির অধীনে বিশাল আধিপত্য। কিন্তু কোয়ালকম প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে তার আশা ভঙ্গ করেছে। কিন্তু তাঁর পরবর্তী শিকার কোনটি হবে? পরবর্তী শিকারের পরিকল্পনা সম্পর্কে আগেভাগে কিছু প্রকাশ করা ঠিক হবে না, এ কথাটি দক্ষ শিকারি মাত্রই মানেন।

তথ্যসূত্র: ইকোনমিস্ট, সিএনএন, এমএনবিসি।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here