চেয়ারম্যানের পদ খালি দেড় মাস

0
36
Exif_JPEG_420

দেড় মাস আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যানের মেয়াদ শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এই পদে কাউকে নিয়োগ দেয়নি সরকার। শিগগিরই এই পদে কাউকে নিয়োগ দেওয়া হবে কি না, তা জানেন না কমিশনের স্থায়ী সদস্যরাও। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য গত ১৮ বছরে দুই দফায় পাহাড়ি ও বাঙালিদের কাছ থেকে দরখাস্ত সংগ্রহ করা ছাড়া এই কমিশনের তেমন কোনো অর্জন নেই।
গত ৭ সেপ্টেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি আনোয়ার উল হকের তিন বছরের মেয়াদ শেষ হয়। তাঁকে ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান করে পঞ্চমবারের মতো কমিশন পুনর্গঠিত করেছিল সরকার।
পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নববিক্রম কিশোর ত্রিপুরা বলেন, বিচারপতি আনোয়ার উল হককে ভূমি কমিশনের চেয়ারম্যান পদে পুনরায় নিয়োগ দেওয়া হবে, নাকি নতুন কাউকে এই পদে নিযুক্ত করা হবে, কোনো সিদ্ধান্তই এখনো হয়নি।
চলতি মাসের ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য মোট ২৩ হাজার ৮৬০টি আবেদন (দরখাস্ত) জমা পড়েছে কমিশনের কার্যালয়ে। এর মধ্যে রাঙামাটি জেলা থেকে এসেছে ৯ হাজার ৬৮৩টি আবেদন। খাগড়াছড়ি থেকে ৭ হাজার ৮৭০টি এবং বান্দরবান থেকে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ৬ হাজার ৩০৭টি আবেদন জমা পেড়েছে। কমিশন কার্যালয় সূত্র জানায়, ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিরসনের জন্য মোট দরখাস্তের মধ্যে বাঙালিদের করা আবেদন ২ শতাংশের বেশি হবে না।
এক বছর আগে কমিশনে আবেদন করেছিলেন বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বাইশারী এলাকার বাসিন্দা মেইগ্য মারমা। বাইশারী মৌজায় তাঁর বন্দোবস্ত জমি বেদখল করেছে বহিরাগত রাবারবাগানিরা। তাঁর আশা ছিল জমি উদ্ধার হবে। এক বছর পর তিনি এখন বলছেন, ‘ভূমি কমিশন জমি উদ্ধার করে দেবে, সেই আশা ছেড়ে দিয়েছি।’
বান্দরবানের রুমা উপজেলার আবদুল জলিল এবং খাগড়াছড়ি পানছড়ির বাসিন্দা বঙ্গ ত্রিপুরাও ভূমি কমিশন নিয়ে মেইগ্য মারমার মতোই ধারণা পোষণ করেন। বেদখল হওয়া জমি ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ফিরে পাওয়ার আশা তাঁরাও ছেড়ে দিয়েছেন।
বঙ্গ ত্রিপুরার দাবি, ১৮ বছরে যে কমিশন কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি, সেই কমিশনের কাছে বেশি কিছু আশা করা যায় না। অন্যদিকে আবদুল জলিলের মন্তব্য, দেড় যুগ আগে যা করা সহজ ছিল, তা এখন আরও জটিল হয়েছে।
খাগড়াছড়ি শহরের মাস্টারপাড়ায় কমিশনের প্রধান কার্যালয়। সেখানে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি ভবনে চলে কমিশনের দাপ্তরিক কার্যক্রম। কার্যালয়ে সচিব, রেজিস্ট্রারসহ মোট সাতজন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করেন। কর্মচারীরা বলেন, তাঁরা প্রতিদিন কার্যালয়ে এলেও তেমন কোনো কাজ নেই।
খাগড়াছড়ির বাইরে রাঙামাটি ও বান্দরবানে কমিশনের দুটি শাখা কার্যালয় খোলার কথা থাকলেও এটি কবে হবে তা কমিশনের স্থায়ী সদস্যরা বলতে পারেননি। তবে কমিশনের সর্বশেষ সভা হয় গত ১৬ জানুয়ারি বান্দরবান সার্কিট হাউসে।
ভূমি কমিশনের সদস্য ও খাগড়াছড়ির মং সার্কেল প্রধান সাচিংপ্রু চৌধুরী বলেন, ভূমি মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন পেলে দুটি শাখা কার্যালয় স্থাপন করা হবে। কমিশনকে সচল করতে সবার আগে ভূমি কমিশন আইনের বিধি প্রণয়ন জরুরি।
এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর বাহাদুর প্রথম আলোকে বলেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনের আলোকে বিধি প্রণয়নের কাজটি করছে ভূমি মন্ত্রণালয়। দ্রুত বিধি প্রণয়নের প্রক্রিয়া শেষ করে তা আইন মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে তাঁর মন্ত্রণালয়।
১৯৯৯ সালে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনের পর থেকে এই আইন সংশোধনের দাবিতে টানা প্রায় ১৬ বছর আন্দোলন করেছে পাহাড়িরা। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আইনটি সংশোধন হয়। কিন্তু আইন প্রয়োগের জন্য অপরিহার্য বিধিমালা তৈরির কাজটি এখনো সরকার করেনি। কমিশনে জনবল নিয়োগের বিষয়টিও চূড়ান্ত করা যায়নি।
পাহাড়ের বাঙালি সংগঠনগুলো ভূমি কমিশন গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি করে আসছে। এই অবস্থান এখনো পাল্টায়নি। এ বিষয়ে পার্বত্য নাগরিক পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলকাছ আল মামুন ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ভূমি কমিশনে বাঙালিদের কোনো প্রতিনিধিত্ব রাখা হয়নি। কমিশনের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে বৈষম্য করা হয়েছে। বাঙালি হিসেবে কমিশনে যাঁরা রয়েছেন তাঁরা সরকারি কর্মকর্তা, কেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করেন না। বাঙালিদের অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, এটি করা না হলে তাঁরা কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দেবেন না।
অবশ্য কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে পাহাড়ি এবং বাঙালি কারও হতাশ হওয়ার কিছু নেই বলে জানান ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের সচিব জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, বিরোধ নিষ্পত্তির অভিযোগ শুনানির জন্য প্রস্তুতিমূলক কাজ ধীরগতিতে হলেও চলছে। কমিশনের জনবল নিয়োগ, অবকাঠামো নির্মাণ, আইনের বিধি প্রণয়ন, বান্দরবান ও রাঙামাটিতে শাখা অফিস স্থাপনের কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান তিনি।
সচিব বলেন, ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নেওয়া অভিযোগের দরখাস্তগুলোর মধ্যে পাহাড়ি-বাঙালির সংখ্যা কত, উপজেলাভিত্তিক আলাদা করে বিরোধের ধরন যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তবে কার্যালয় ও জনবল সংকটে কাজ এগোনো যাচ্ছে না।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী, ওই অঞ্চলের ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সরকার ১৯৯৯ সালে প্রথম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে সরকার। চেয়ারম্যান ছাড়া এই কমিশনের সদস্যরা হচ্ছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, সংশ্লিষ্ট সার্কেল প্রধান বা রাজা (যখন যে এলাকার ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ চলবে, তখন সেই সার্কেলের প্রধান বা রাজা সদস্য হিসেবে কাজে অংশ নেবেন), চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার এবং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (যখন যে জেলার বিরোধ নিষ্পত্তির কাজ চলবে, তখন সেই জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সদস্য হিসেবে অংশ নেবেন)।
ভূমি কমিশনের সদস্য ও চাকমা সার্কেল প্রধান দেবাশীষ রায় বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার চাইলেই ভূমি কমিশন পুনর্গঠন করতে পারে। তবে ভূমি কমিশন আইনের বিধি যত দিন পর্যন্ত করা হবে না, তত দিন এই কমিশন সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে না। ভূমিহারা মানুষের কাছ থেকে পাওয়া আবেদনের শুনানিও এই বিধি না থাকার কারণে করা যাচ্ছে না।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here