জাতিসংঘে প্রস্তাব গ্রহণের পর রোহিঙ্গাদের ওপর ফের হামলা

0
170

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফের শুরু হয়েছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর  অভিযান, হত্যা ও জ্বালাওপোড়াও। সহিংসতা বন্ধে গত বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের থার্ড কমিটিতে প্রস্তাব গ্রহণের পর আরো ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেছে সামরিক বাহিনী ও সশস্ত্র রাখাইন জনগোষ্ঠী। প্রতিক্রিয়া হিসেবে তারা রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে হানা দিয়ে গুলিবর্ষণ ও বসতবাড়িতে অগ্নিসংযোগ করছে। যে কারণে সেখানে বসবাসরত অবশিষ্ট রোহিঙ্গারাও আশ্রয়ের সন্ধানে বাংলাদেশে পালিয়ে আসছে। গতকাল শনিবার ভোরে বালুখালী ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া সীমান্তবর্তী গ্রাম মাঙ্গালা পাড়া থেকে আসা কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা হয়। তারা বলেন, জাতিসংঘে প্রস্তাব পাসের পর মিয়ানমার সেনারা নতুন করে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘরে হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করেছে।

সীমান্তসংলগ্ন মংডু টাউনশিপের মাঙ্গালা পাড়া গ্রামের ব্যবসায়ী সুলতান আহমদ (৪৫) জানান, তিনি সীমান্তে ব্যবসা বাণিজ্য করে আসছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ব্যবসার সুবাদে সেখানকার প্রভাবশালী রাখাইনদের সঙ্গে ছিল তার সখ্যতা। প্রশাসনের লোকজনের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক ছিল। এ কারণে তিনি এতদিন পর্যন্ত মাঙ্গালা পাড়া গ্রামে নিশ্চিন্তে পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজ বাড়িতে অবস্থান করতে পেরেছিলেন। তার মতো আরো প্রায় দুই শতাধিক পরিবার ওই গ্রামে ছিলো। কিন্তু সম্প্রতি জাতিসংঘে মিয়ানমারের বিপক্ষে ১৩৫টি দেশ অবস্থান নেওয়ায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী, প্রশাসন ও উগ্রপন্থি রাখাইন জনগোষ্ঠী ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে।

ওই ব্যবসায়ী জানান, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে রাখাইন জনগোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মাঙ্গালা পাড়া গ্রামটি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। সর্বস্বান্ত রোহিঙ্গারা যে যেদিকে পারে প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে গেছে।

একই গ্রামের দিল মোহাম্মদ (৩৯) জানান, তিনি মংডু টাউনে হোটেল ব্যবসা করতেন। তার সঙ্গে মাঙ্গালা পাড়া গ্রামের রাখাইন হুক্কাট্টার (চেয়ারম্যান) লেনদেন ছিলো। ওই চেয়ারম্যান গ্রামে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের নিরাপদে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়ার জন্য প্রতি ঘর থেকে টাকা তুলে প্রশাসনের লোকজনকে দিত। এভাবে তারা এতদিন নিরাপদে বসবাস করছিল। গত বৃহস্পতিবার রাতে মগ সেনা ও রাখাইন জনগোষ্ঠী মাঙ্গালা পাড়া গ্রামের অধিকাংশ বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়।

ঘুমধুম সীমান্তের জিরো পয়েন্টে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের টেকিবুনিয়া গ্রামের হুক্কাট্টা (চেয়ারম্যান) সেলিম উদ্দিন জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মাঙ্গালা পাড়া গ্রামের দিকে গোলাগুলির শব্দ ও আগুনের কুণ্ডলি দেখা গেছে। তিনি জানান, ব্যবসায়ী জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত মাঙ্গালা পাড়া গ্রামে রোহিঙ্গারা মগ সেনাদের ঘুষ দিয়ে কোনোরকম বসবাস করে আসছিল। কিন্তু জাতিসংঘের বৈঠকের পর এ গ্রামটি রক্ষা পায়নি।

ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান একে জাহাঙ্গীর আজিজ জানান, গত বৃহস্পতিবার থেকে ওপারে গোলাগুলির শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কিছু কিছু রোহিঙ্গাকে নো ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থিত ক্যাম্পে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। তারা বলেন, মিয়ানমারের সেনারা সেখানে নতুন করে বাড়িঘরে হানা দিয়ে জুলুম ও গুলিবর্ষণ করছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধি জানান, উখিয়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে রোহিঙ্গাদের কাছে পাওয়া সব তথ্য মার্কিন কংগ্রেসে উপস্থাপন করা হবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রতিনিধি দল। গতকাল উখিয়ার বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধিরা জানান, রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করে নির্যাতনের নানা তথ্য পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ সফর শেষে তারা মিয়ানমারে যাবেন। ওখান থেকেও তথ্য সংগ্রহ করে দেশে ফিরে তা কংগ্রেসে জানাবেন।

গতকাল বেলা ১১টার কিছু পরে আমেরিকার ১০ সদস্যের প্রতিনিধি দল কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পৌঁছে। সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের সঙ্গে আলাপ করেন তারা। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রতিনিধি দলে থাকা দুই জন সিনেটর জেফ মার্কলে ও জন মার্ফি। সঙ্গে ছিলেন তিন জন কংগ্রেসম্যান ও বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত।

এদিকে, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের ১৩ শ’ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here