জাতিসঙ্ঘ বিবৃতিকে ‘ক্ষতিকর’ উল্লেখ মিয়ানমারের

0
51

রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সমালোচনামূলক বিবৃতির জবাবে মিয়ানমার বুধবার বলেছে, এটি বাংলাদেশ থেকে সংখ্যালুঘু রোহিঙ্গা মুসলমানকে দেশে ফেরত আনার প্রচেষ্টার জন্যে মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। খবর এএফপি’র।

সোমবার সর্বসম্মত এক বিবৃতিতে জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদ সামরিক বাহিনীর অভিযান নিয়ন্ত্রণ করতে মিয়ানমারের প্রতি আহবান জানায়। গত আগস্ট থেকে দেশটির সামরিক বাহিনীর ব্যাপক অভিযানে ছয় লাখেরও বেশী রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে যায়। মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী মানবাধিকার লঙ্ঘন করে যে হত্যাযজ্ঞ, যৌন নির্যাতন চালায় এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিতে সে ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

এরআগে জাতিসঙ্ঘের বিভিন্ন সংস্থা এটিকে সামরিক দমনপীড়ন এবং জাতিগত নিধন হিসেবে বর্ণনা করে। তবে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গা বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে তারা এ অভিযান চালিয়েছে।

নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতির জবাবে মিয়ানমারের বেসামরিক নেতা অং সান সুচির দপ্তর জানায়, বিবৃতিতে আসল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে বর্তমানে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ যে সমস্যা মোকাবেলা করছে তা প্রতিবেশী এ দু’দেশের মধ্যে কেবলমাত্র দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হতে পারে। বিবৃতিতে এটি পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বি-পক্ষীয় আলোচনার ক্ষেত্রে এ বিবৃতি মারাত্মক ক্ষতিকর।
এ চরম সংকট নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টির কয়েক সপ্তাহ পর শরণার্থীদের কিভাবে দেশে ফেরত নেয়া যায় সে ব্যাপারে মিয়ানমার ও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু করেছে। তবে এ ব্যাপারে তারা কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

 

আনান কমিশনের সুপারিশ রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের উপায় : ইউএনএইচসিআর

গোলাম আজম খান কক্সবাজার (দক্ষিণ)

শতাব্দীর পর শতাব্দী মিয়ানমারের আরকানে রোহিঙ্গাদের পূর্বপুরুষদের বসবাসের ইতিহাস থাকলেও তা অস্বীকার করে তাদের ওপর বর্বরতা চালাচ্ছে মিয়ানমার। এ কারণে এখন তারা রাষ্ট্রহীন, অনাকাক্সিক্ষত মানুষ। কিন্তু জীবন বাঁচাতে সীমান্ত পেরিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা নিজেদের ভূমিতে ফিরে যেতে চান। তবে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয়কেন্দ্রে নয়, বাপ-দাদার ভিটেমাটিতে ফিরে যেতে চান রোহিঙ্গা শরণার্থীরা। মিয়ানমার সরকার তাদের ফিরে নিয়ে শরণার্থী ক্যাম্পে (আশ্রয়কেন্দ্রে) রাখার প্রস্তাবনাকে প্রত্যাখ্যান করে তারা বলেছে আনান কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন ছাড়া তারা ফিরে যেতে রাজি নয়। রোববার সকালে উখিয়া কুতুপালং ও বালুখালী শরণার্থী ক্যাম্পে সরেজমিন রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গেলে, এমনটি জানান রোহিঙ্গারা।

বালুখালী ক্যাম্পের আশ্রয় নেয়া মো: রশিদ জানান, ‘আমরা অল্পে তুষ্ট, দুই বেলা, দু’মুঠো খেয়ে পরিবার পরিজন নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই। বাপ-দাদার ভিটেমাটি ফিরে পেলে আমরা ফিরে যেতে রাজি আছি।’

একই ক্যাম্পের আশ্রয় নেয়া রমিজা খাতুন জানান, ‘আমরা সেখানে কিছুতেই ফিরে যাবো না যদি আমাদের ক্যাম্পে পাঠানো হয়। আমাদের দেশে কেন আমরা ক্যাম্পে থাকব? ওখানে মিয়ানমারের আরকানে আমাদের বাপ-দাদার বসতভিটা রয়েছে আমরা ওখানেই থাকব। আমরা ওখানে মিয়ানমারের যেতে রাজি নয় যদি না আমাদের সব রকমের নাগরিক অধিকার এবং নিজ গৃহে ফিরে যেতে দেয়া না হয়।’
কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নারী লায়লা বেগম বলেন, ‘মিয়ানমারের ক্যাম্পে কেন আমরা থাকব? আমার দেশে আমাকে শরণার্থী কেন হতে হবে? আমরা নাগরিক অধিকার দিলে ফিরে যাবো। নয়তো যাবো না।’
এ রকম একজন শরণার্থী খোদিজা বেগম জানান, ‘শুধু মাত্র জীবন নিয়েই বাংলাদেশে এসেছি। তারপরও পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার সাথে দেশে ফিরতে চাই।’
কুতুপালং ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা মৌলভী জলিলুর রহমান জানান ‘একজন নাগরিকের যেসব অধিকার পাওয়ার কথা, সেসব অধিকার আমাদের দিলে আমরা ফিরে যাবো।’
মংডু কাইন্দাপাড়ার আবু তাহের জানান, ‘আমাদের নাগরিক অধিকার এবং নিরাপত্তা, পুড়িয়ে দেয়া ঘরবাড়ির ক্ষতিপূরণ ও জমি-জামা কাগজে-কলমে লিখে ফিরিয়ে দিলে ফিরে যাবো।’
মংডুর ইয়াসমিন, তার বাবাকে খুন করেছে সেনাবাহিনী। ইয়াসমিন জানান, ‘লেখাপড়া করার অধিকার। পড়ালেখা শেষ করে চাকরি করার অধিকার এবং জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলে আমরা মিয়ানমারের ফিরে যেতে রাজি”।

শিব্বির নামের আর এক রোহিঙ্গা জানান, ‘রাখাইনরা সব সুযোগ-সুবিধা পায় সেখানে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমান হয়ে জন্মানোটাই যেন অপরাধ। লেখাপড়ার সুযোগ নেই। স্কুল-কলেজ যা আছে শহরে। রাখাইনে যে ক’টি মাদরাসা ছিল তাও ২০১২ সাল থেকে বন্ধ। অশিক্ষিত হয়েই বেড়ে উঠছে রোহিঙ্গা শিশুরা। নাগরিকত্ব না দিলে, লেখাপড়ার সুযোগ না দিলে আরকানে গিয়ে কি লাভ হবে?’
শীলখালীর আয়েশা জানান, তার কোনো শর্ত কিংবা দাবি নেই। শুধু স্বামী সংসার সন্তান নিয়ে দু’বেলা দু’মুটো খাবার খেয়ে বাঁচতে পারলে হয়।

এক রোহিঙ্গা জানান, ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালে নির্যাতন আর করবে না মর্মে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়েছিল সরকার। কিন্তু নেয়ার পর নির্যাতনের মাত্রা দ্বিগুণ করেছে। এবারো ফিরিয়ে নিয়ে সাইলেন্ট কিলিং করে রোহিঙ্গা নির্মূল করবে বলে আশঙ্কা তাদের।
আর এক রোহিঙ্গা জানান,‘নাগরিকত্ব না থাকায় আমরা শিক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য, বস্ত্র বাসস্থানসহ প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। আমাদের ‘অশিক্ষিত’ ও ‘অন্ধ’ করে রাখা হয়েছে যুগের পর যুগ। আমাদের স্কুল-কলেজে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিছু মাদরাসা ছিল। কিন্তু ২০১২ সালের পর থেকে তা বন্ধ রয়েছে। আমাদের যেতে দেয়া হয় না শহরে কিংবা নির্দিষ্ট গণ্ডির বাইরে। চাষবাস আর পশু পালনই আমাদের একমাত্র জীবিকা।

গত মাসে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মিয়ানমার সফরকালে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের প্রতি দশ দফা প্রস্তাব উত্তাপন করেন। যার মধ্যে ছিল রোহিঙ্গাদের নাগরিক অধিকার দিয়ে ফিরিয়ে নেয়া, কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং প্রত্যাবাসন চুক্তিতে জাতিসঙ্ঘকে সাথে রাখা।
যার উত্তরে মিয়ানমার প্রায় সব প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করে এবং নতুন করে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বাংলাদেশকে। মিয়ানমার সরকার চায়, ১৯৯২ সালে করা চুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিয়ে একটি ক্যাম্পে রাখা হবে ও চুক্তির মধ্যে জাতিসঙ্ঘকে রাখতে চাইছে না মিয়ানমার।

১৯৪৮ সালে মিয়ানমার স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বর্মি বৌদ্ধ সরকার বিভিন্ন সময় বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে আসছে রোহিঙ্গাদের। ২৫ বার বড় বড় অভিযান চালিয়ে বর্মি সরকার ও সরকারি বাহিনী উৎখাত করার চেষ্টা করছে এ মুসলিম জাতিগোষ্ঠীকে। গণহত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, চাঁদাবাজি, আটক বাণিজ্য, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগ, বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম আদায়সহ উচ্ছেদের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ওপর অমানুষিক নিপীড়ন চালিয়েছে বর্মি বাহিনী।
রোহিঙ্গারা অনেকবার বর্মি বাহিনীর গণহত্যা থেকে বাঁচতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। প্রত্যাবসান হয়েছে অনেকে। বিশেষ করে ’৯২ সালের পর হাজার হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে প্রত্যাবসান হয়।
রোহিঙ্গারা ’৭৮ সাল থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিলেও ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে এমন রোহিঙ্গার ঢল কখনো চোখে পড়েনি। গত দুই মাসেরও অধিক সময়ে ছয় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। এখনো প্রতিদিন আসছে।

মিয়ানমারের বাহিনীর নৃশংসতা থেকে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় সন্ধানী রোহিঙ্গারা পাহাড়ে, বনে-জঙ্গলে, রাস্তার ধারে, নদীর পাড়ে ও ত্রিপলের ছাউনির নিচে গাদাগাদি করে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দিনাতিপাত করছে। নিজ দেশে যাদের গোয়ালভরা গরু, গোলাভরা ধান, দীঘি ভর্তি মাছ ও বড় বড় কাঠের কুঠির ছিল আজ তারা বাংলাদেশে রিক্ত হস্ত। ত্রাণই তাদের একমাত্র ভরসা। এ মানবেতর অবস্থায় তারা কেউ থাকতে চায় না। ফিরে যেতে চায় স্বদেশে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here