জামিন নিয়ে পলাতক আছে দুই শতাধিক আসামি

0
106
জামিন নিয়ে পলাতক আছে দুই শতাধিক আসামি

বছরের পর বছর ঝুলে আছে প্রায় ৮০০ জঙ্গি মামলা। এর মধ্যে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ৫৫০টি। আর কচ্ছপগতিতে চলছে ২৫০ মামলার তদন্ত কাজ। এসব মামলায় প্রায় চার হাজার জঙ্গিকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে জামিন নিয়ে পলাতক আছে দুই শতাধিক আসামি। আরও তিনশ’ আসামি জামিন নিলেও তারা আদালতে হাজির হচ্ছে না। তবে আইনজীবীর মাধ্যমে তারা ‘গড়হাজিরা’ দিয়ে যাচ্ছে। এদের বেশিরভাগই পলাতক বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের। তদন্তে গাফিলতি ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এসব মামলার আসামিদের যথাসময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা না হলে জঙ্গি হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে।

এদিকে জঙ্গিরা জামিন নিয়ে পলাতক হলেও আসামির জামিনদারদের কোনো ধরনের জবাবদিহিতা নেই। তাদের কারও বিরুদ্ধেই অদ্যাবধি নেয়া হয়নি কোনো ধরনের আইনানুগ ব্যবস্থা। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে জঙ্গিরা নির্বিঘ্নে জামিন নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। পলাতকদের মধ্যে অন্তত দুই ডজন ভয়ঙ্কর জঙ্গি রয়েছে, যারা সমরাস্ত্র পরিচালনাসহ শক্তিশালী বিস্ফোরক তৈরিতে পারদর্শী। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ভিন্ন ভিন্ন নামে জঙ্গি সংগঠনগুলোর উত্থানের নেপথ্যে এসব দুর্ধর্ষ জঙ্গি কলকাঠি নাড়ছে। আবার কেউ কেউ কারাগারে আটক থেকেও জঙ্গি তৎপরতা চালানোর চেষ্টা করছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে চিরুনি অভিযান চালিয়েও জামিনে পলাতক জঙ্গিদের অবস্থান চিহ্নিত করতে পারছে না আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। জামিনে মুক্ত এসব সন্ত্রাসী কোথায় আছে সে ব্যাপারে কোনো তথ্য নেই পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কাছে। এসব পলাতক জঙ্গিদের দ্রুত গ্রেফতার করা না গেলে দেশ নিরাপত্তা হুমকিতে থাকবে বলে আশঙ্কা অপরাধ বিশেষজ্ঞদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ১৯ বছরের বিভিন্ন সময়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে টার্গেট কিলিং ও সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় দায়ের হয়েছে উল্লিখিত সব জঙ্গি মামলা। বিপুলসংখ্যক মামলা ঝুলে গেলেও এ পর্যন্ত প্রায় ২০০ মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। শাস্তি হয়েছে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক জঙ্গির। এদের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১০ জঙ্গির ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। সর্বশেষ গত বছরের ১২ এপ্রিল বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার গুরু ও প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পরিচিত হরকাতুল জিহাদের (হুজি) নেতা মুফতি হান্নান, হুজি সদস্য শরিফ শাহেদুল আলম বিপুল ও দেলোয়ার হোসেন রিপনের ফাঁসি কার্যকর হয়। ১৪ বছর আগে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর গ্রেনেড হামলা মামলায় তাদের এ ফাঁসি কার্যকর করা হয়। এর আগে ২০০৭ সালের ২৯ মার্চ জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) নেতা শায়খ আবদুর রহমান, সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই, আবদুর রহমানের ভাই আতাউর রহমান সানি, জামাতা আবদুল আউয়াল, ইফতেখার হোসেন মামুন ও খালেদ সাইফুল্লাহ ওরফে ফারুকের ফাঁসি কার্যকর হয়। একই মামলায় পলাতক জেএমবি সদস্য আরিফ পরে গ্রেফতার হলে ২০১৬ সালের ১৬ অক্টোবর তার ফাঁসি কর্যকর হয়। ২০০৫ সালে ঝালকাঠিতে বোমা হামলা চালিয়ে দুই বিচারক হত্যা মামলায় তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়।

জঙ্গি ও সন্ত্রাস নির্মূলে সরকারের অগ্রাধিকার ও আন্তরিকতা থাকলেও মামলার তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চাঞ্চল্যকর এসব মামলা তদন্ত করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জঙ্গি সংগঠনগুলোর নেপথ্যে মদদদাতাদের খুঁজে পাচ্ছে না। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, ছোট-ছোট স্লিপার সেলে জঙ্গি সদস্যরা কাজ করায় গ্রেফতারকৃতদের দেয়া তথ্য অনুযায়ী অন্য জঙ্গিদের ধরা যাচ্ছে না। বিভিন্ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করায় তাদের অবস্থানও চিহ্নিত করা দুরূহ হয়ে পড়েছে। অপরদিকে তদন্ত শেষে যেসব মামলায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করা হচ্ছে, সেসব মামলার বিচারেও তেমন অগ্রগতি হচ্ছে না। নিয়মিত সাক্ষী হাজির না হওয়ায় মূলত এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম গতি হারাচ্ছে। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সাধারণ সাক্ষীরা ভয়ে আদালতে সাক্ষী দিতে হাজির হচ্ছে না। এমনকি সাক্ষী হিসেবে যেসব পুলিশ সদস্য রয়েছেন, তারাও আদালতে অনুপস্থিত থাকছেন। তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা আমলে নেয়া হচ্ছে না। এভাবে জঙ্গি মামলার তদন্ত ও বিচারে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে। বিচার প্রার্থীরা অপেক্ষায় দিন গুনতে গুনতে হতাশ হয়ে পড়েছেন।

জানতে চাইলে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গি মামলার বিচারে সরকারের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই। যথেষ্ট দ্রুততার সঙ্গে মামলাগুলোর বিচার কাজ শেষ হচ্ছে। এছাড়া জঙ্গি মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। মামলাগুলোর বিচার করতে হলে আগে ওই সব মামলায় চার্জশিট দেয়াসহ অন্যান্য কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় রয়েছে। সার্বিকভাবে জঙ্গিসংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করি বাকি মামলাগুলোও পর্যায়ক্রমে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই নিষ্পত্তি হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান যুগান্তরকে বলেন, আদালত, পুলিশ, কারাগার এবং প্রসিকিউশন- এ চারটি স্থানের যে অবস্থা তাতে কোনো ধরনের সামাজিক প্রতিকার সম্ভব নয়। পুলিশের সেবাদান কার্যক্রম এখনও উন্নত হয়নি। কোনো নির্মোহ, দক্ষ লোকবল নিয়োগ করে প্রসিকিউশনও গঠন হয় না। পুলিশের মধ্যে যেভাবে দুর্নীতি চালু হয়েছে তাতে নির্মোহ হয়ে কাজ করার জায়গাও সংকুচিত। এরপর আদালতে যে পরিমাণ মামলা জট। তাতে এ জঙ্গি মামলাগুলোও সেই জটের মধ্যে পড়েছে। নানাভাবে সেখানে একটা অসুস্থ পরিবেশ বিরাজ করছে। কারাগারে সংশোধন পরিবেশ বা ‘হেলদি সোসাইটি’- কোনোটাই প্রস্তুত হচ্ছে না। জঙ্গি দমনে সরকারের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। তবে সরষের মধ্যে যদি ভূত থাকে তাহলে শত চেষ্টা করেও তা সম্ভব নয়। আগে ওই প্রতিষ্ঠানগুলোকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার করা না গেলে জঙ্গি দমন ব্যবস্থা কার্যকর হবে না।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, জঙ্গি মামলা তদন্তে পুলিশের ত্রুটি আছে। আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে যথাযথ তথ্যপ্রমাণ হাজির করতে না পারলে তারা জামিন পেয়ে যাবে, এটাই স্বাভাবিক। তিনি বলেন, তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহের জন্যে বিচার দেরিতে শুরু হতে পারে। কিন্তু জঙ্গিদের জামিন পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি খুবই উদ্বেগের। কারণ, জামিন পেয়ে তারা লাপাত্তা হয়ে যাচ্ছে। আত্মগোপনে থেকেই তারা মানুষকে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ করছে। তাই একদিকে যেমন দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, অন্যদিকে তেমন জঙ্গিরা যেন জামিন না পায় সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে।

এক প্রশ্নের উত্তরে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিচার করে গ্রেফতারকৃতদের ফাঁসি দিয়ে দিলেই যে জঙ্গিবাদ বন্ধ হয়ে যাবে তা ঠিক নয়। কারণ, জঙ্গিরা হামলা করার আগেই জানে যে, তাদের পরিণতি কি হতে পারে। তাই এর প্রতিকারের জন্যে সবার সচেতন হওয়া জরুরি। তদন্তে অনেক ফাঁকফোকরের কারণেই জঙ্গিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, প্রশ্ন উঠতে পারে জঙ্গিরা জামিন পেলেও রাজনীতিবিদরা জামিন পাচ্ছেন না।

পুলিশের অতিরিক্ত আইজি (অ্যান্টি-টেরোরিজম) সফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গিসংক্রান্ত যেসব মামলা হয়েছে, তার প্রতিটি ঘটনাই আলাদা। তাই ঢালাওভাবে কোনো মন্তব্য করা ঠিক হবে না। তবে সার্বিকভাবে বলা যায়, বিচার শুরু হতে বিলম্ব হচ্ছে। এ কারণে আসামিরা জামিন পেয়ে যাচ্ছে। কোনো আসামি ধরার পর এক বছরেও বিচার শুরু করা যায় না। এক্ষেত্রে আসামিকে কতদিন বিনা বিচারে আটক রাখা যায়?

সফিকুল ইসলাম আরও বলেন, প্রচলিত আইনে জঙ্গিবাদের ঝুঁকির বিষয়টি সেভাবে কভার করে না। জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মামলা হয় অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে। তাই এ বিষয়ে আইন সংশোধন করা জরুরি। তিনি জানান, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিশেষ আদালতের মাধ্যমে এসব মামলা নিষ্পত্তি করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকেও সরকারের কাছে আবেদন জানানো হবে, যাতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে এসব মামলার বিচার সম্পন্ন করা হয়।

কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের যুগ্ম কমিশার আমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গি দমন ও এ সংক্রান্ত মামলা তদন্তে পুলিশের আন্তরিকতার অভাব নেই। প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করতে সময় লাগায় চার্জশিট দিতে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেরি হয়। তবে খুব বেশি দেরি করার সুযোগ নেই। কারণ, প্রত্যেক মামলার তদন্তে সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয়া হয়। ওই সময়সীমার মধ্যে অনেক সময় পর্যাপ্ত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা যায় না। আবার যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ছাড়া চার্জশিট দাখিল করলে আসামিদের ছাড়া পেয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ত্রুটিহীন চার্জশিট দিতেই সময় বেশি লাগছে উল্লেখ করে আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, জঙ্গিদের জামিন দেয়ার ক্ষেত্রে আদালতের নিশ্চয়ই কোনো গ্রাউন্ড আছে। আমরা সে গ্রাউন্ডগুলো যাচাই করে দেখব। আমাদের কোনো বিচ্যুতি থাকলে সেগুলো দূর করার চেষ্টা করব। পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান কৌঁসুলি মো. আবদুল্লাহ আবু যুগান্তরকে বলেন, জঙ্গিসংক্রান্ত অনেকগুলো মামলা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। এছাড়া তদন্ত শেষে অনেকগুলো মামলার চার্জশিটও দেয়া হয়েছে। সেসব মামলার বিচার কাজ চলছে। জঙ্গি মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে রাষ্ট্রপক্ষের কোনো গাফিলতি নেই। এসব মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে অনেক সময় সাক্ষীদের আদালতে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। সাক্ষী হাজিরের জন্য আদালত থেকে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাও পাঠানো হচ্ছে। তবুও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আদালতে সাক্ষী উপস্থিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। জঙ্গি মামলাগুলোর ক্ষেত্রে আদালতে সাক্ষী হাজিরের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আগের চেয়ে আরও তৎপর হতে হবে। এ মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য পৃথক ট্রাইব্যুনাল গঠন অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া ট্রাইব্যুনাল গঠন করা না গেলেও দ্রুত বিচারের নিয়ম অনুযায়ী মামলাগুলোর বিচার দ্রুত শেষ করা যেতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, যেসব জঙ্গি জামিন নিয়ে পলাতক, সেসব মামলায় তাদের জামিনদারদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। জামিনদার সিভিল হোক বা আইনজীবী হোক- জামিন নিয়ে আসামি পলাতক হলে তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। জামিনদারের জবাবদিহিতার নজির সৃষ্টি না হলে বিচারপ্রার্থীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবেন।

জামিন নিয়ে পলাতক দুই শতাধিক জঙ্গি : জঙ্গি মামলাগুলোয় বিভিন্ন সময় জামিন নিয়ে অন্তত দুই শতাধিক আসামি পলাতক রয়েছে। সিরিয়ায় উগ্রপন্থী ইসলামিক স্টেটের (আইএস) নেতা ব্রিটিশ নাগরিক সামিউন রহমান ইবনে হামদান ২০১৪ সালে ঢাকায় ‘মুজাহিদ’ সংগ্রহে এসে গ্রেফতার হয়। তার বিরুদ্ধে মামলার পর ২০১৭ সালে হাইকোর্ট থেকে জামিন পায়। এরপর থেকেই লাপাত্তা সে। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে জামিন নিয়ে পলাতক দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- কাওছার হোসেন, কামাল উদ্দিন, মো. আজমীর, গোলাম সারওয়ার, মুফতি আবদুল হাই, মুফতি শফিকুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম, নূর ইসলাম, আমিনুল মুরসালিন, মহিবুল মোত্তাকিন, রফিকুল ইসলাম মিরাজ ও মশিউর রহমান, তানভীর, তৌহিদুল, সাইদুর, সাইফুল, রেজাউল, নাঈম, জুম্মন, আমিনুল, জঙ্গি আবদুল আকরাম, জুনায়েদ রহমান, মানিক, মাজিদ, সাজেদুর, ফারুক, শফিক, মিলন, কফিল উদ্দিন ওরফে রব মুন্সি, আজিবুল ইসলাম ওরফে আজিজুল, শাহান শাহ, হামিদুর রহমান, বজলুর রহমান, বাবর, শরিফ, খাইরুল ইসলাম, ওয়ালিউল্লাহ ওরফে হামিদ, জাকারিয়া, সবুজ, নাদিম, ময়েজ উদ্দিন, মহব্বত ওরফে তিতুমীর ওরফে নাহিদ প্রমুখ।

ঝুলে আছে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রক্রিয়া : সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ নির্মূল সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হলেও মামলার বিচারের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ২০০৯ সাল থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের ঘটনায় থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা হচ্ছে। ওই আইন অনুযায়ী জঙ্গিদের মামলার বিচার দ্রুত সম্পন্ন করতে ২০১২ সালে সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ ২০১৬ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি ট্রাইব্যুনাল গঠনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। কিন্তু এটি অদ্যাবধি বাস্তবায়ন হয়নি।

কয়েকটি জঙ্গি মামলার বিচার : সারা দেশে জঙ্গি মামলাগুলো বিচারে চলছে ধীরগতি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সাক্ষী না আসায় মামলার বিচারগুলো ঝুলে যাচ্ছে। সাড়ে ৫ বছর আগে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করা হলেও অদ্যাবধি শেষ হয়নি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলার বিচার কাজ। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী দুই চিকিৎসক আদালতে হাজির না হওয়ায় মূলত এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। ওই দুই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানাও জারি করা রয়েছে। কিন্তু পুলিশ তাদের খুঁজে না পাওয়ায় বর্তমানে চাঞ্চল্যকর এ মামলাটির বিচার কাজ অনেকটা ঝুলে গেছে। ২২ মার্চ এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য রয়েছে।

২০১৫ সালের ২৩ অক্টোবর তাজিয়া মিছিলের প্রস্তুতিকালে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) জঙ্গিরা হোসনি দালানে গ্রেনেড হামলা চালায়। এতে দু’জন নিহত ও শতাধিক আহত হন। এ ঘটনায় রাজধানীর চকবাজার থানায় মামলা করে পুলিশ। গত বছরের ৩১ মে এ মামলায় ১০ জঙ্গির বিরুদ্ধে চার্জ (অভিযোগ) গঠন করেন আদালত। এরপর থেকে এ মামলায় শুধু তদন্ত কর্মকর্তা সাক্ষ্য দিয়েছেন। বাকিরা অদ্যাবধি সাক্ষ্য দেননি। ১৩ মার্চ এ মামলায় পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ধার্য রয়েছে।

ইতালির নাগরিক সিজারি তাভেল্লা হত্যা মামলাটির তদন্ত শেষ হলেও শেষ হয়নি বিচার কার্যক্রম। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ পর্যায়ে রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলশান-২ এর ৯০ নম্বর সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন সিজারি তাভেল্লা।

কয়েকটি জঙ্গি মামলার তদন্ত : জঙ্গি মামলাগুলো তদন্তে বছরের পর বছর সময় পার করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তবুও তারা এসব মামলার কিনারা করতে পারছে না। বহুল আলোচিত গুলশান হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার আড়াই বছরের অধিক সময় পার হলেও অদ্যাবধি এ মামলার চার্জশিট দেয়া হয়নি। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে দুই পুলিশসহ দেশি-বিদেশি ২২ জনকে হত্যা করে জঙ্গিরা। এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ডে’ পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। অভিযানে এক জাপানি ও দু’জন শ্রীলঙ্কানসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। ওই ঘটনায় ৪ জুলাই গুলশান থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করে পুলিশ। ১০ এপ্রিল এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে।

মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ড. অভিজিৎ রায় হত্যা মামলার তদন্ত কাজ ৩ বছরেও শেষ হয়নি। দীর্ঘ তদন্তে হত্যাকাণ্ডের মোটিভ উদ্ঘাটনের দাবি করা হলেও এর মূল পরিকল্পনাকারী এখনও অধরাই রয়ে গেছে। এ মামলায় আদালতের ২২৯ কার্য দিবসের মধ্যে প্রায় শতাধিকবার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দিন ধার্য ছিল। এ মামলায় ১৫ মার্চ প্রতিবেদন দাখিলের পরবর্তী দিন ধার্য রয়েছে। ২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অভিজিৎ বই মেলায় যান। মেলা থেকে ফেরার সময় রাত সাড়ে ৮টায় টিএসসি চত্বরের সামনে স্ত্রী বন্যা আহমেদসহ হামলার শিকার হন অভিজিৎ। পরে হাসপাতালে নিলে তিনি মারা যান।

একই ভাবে প্রায় ৩ বছর পার হলেও রাজধানীর খিলগাঁওয়ে আলোচিত ব্লগার নিলাদ্রী চ্যাটার্জি ওরফে নিলয় হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৮ মার্চ দিন ধার্য রয়েছে। ২০১৫ সালের ৭ আগস্ট রাজধানীর খিলগাঁওয়ে ভাড়া বাসায় খুন হন নিলাদ্রী চ্যাটার্জি ওরফে নিলয়। ওই দিনই রাজধানীর খিলগাঁও থানায় নিলয়ের স্ত্রী আশা মনি বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

এদিকে প্রায় আড়াই বছর পার হলেও প্রকাশক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার প্রতিবেদন দাখিল করা হয়নি। এ মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ২৫ মার্চ দিন ধার্য রয়েছে। রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের ৩য় তলায় ‘জাগৃতি’ প্রকাশনী অফিসে ঢুকে কতিপয় অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে ফয়সাল আরেফিন দীপনের ঘাড়ের পেছনে আঘাত করে হত্যা করে। ঘটনাটি ঘটে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর। হত্যাকাণ্ড শেষে পালিয়ে যায় জঙ্গিরা। এ ঘটনায় ২ নভেম্বর দীপনের স্ত্রী ডা. রাজিয়া রহমান বাদী হয়ে শাহবাগ থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

আশকোনার জঙ্গি আস্তানায় অভিযানের ঘটনায় করা মামলার প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৩ মার্চ দিন ধার্য রয়েছে। ২০১৬ সালের ২৩ ডিসেম্বর রাত ১২টা থেকে ২৪ ডিসেম্বর বিকাল ৫টা পর্যন্ত রাজধানীর পূর্ব আশকোনার ওই তিনতলা ভবন ঘিরে অভিযান চালায় পুলিশ। একপর্যায়ে দুই শিশুকে নিয়ে বেরিয়ে এসে আত্মসমর্পণ করে দুই নারী জঙ্গি। এছাড়া দু’জন আত্মহত্যা করে ও চারজন পালিয়ে যায়। মামলা দায়েরের এক বছরের অধিক সময় পার হলেও মামলাটির তদন্ত কাজ এখনও শেষ হয়নি।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here