ঝড়ের বেগে সন্তানসহ মীনা হাসপাতালে পৌঁছান ততক্ষণে সব শেষ।

0
55
ঝড়ের বেগে সন্তানসহ মীনা হাসপাতালে পৌঁছান ততক্ষণে সব শেষ।
  • অভিযানের সময় নিহত পুলিশের পরিদর্শক।
  • জালালউদ্দিন ১৯৮৯ সালে কনস্টেবল পদে যোগ দিয়েছিলেন।
  • বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন জালালউদ্দিন।
  • শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য জালালউদ্দিন প্রাণ দিয়েছেন।

রাত ১১টার দিকে স্বামীকে ফোন করেছিলেন মীনা পারভিন। গোয়েন্দা পুলিশ পরিদর্শক জালালউদ্দিন ফোন ধরেননি। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে একসময় ঘুমিয়ে পড়েন মীনা। মধ্যরাতে অপরিচিত একটা ফোনে ঘুম ভেঙে যায়। ঝড়ের বেগে সন্তানসহ মীনা হাসপাতালে পৌঁছান। ততক্ষণে সব শেষ। চিকিৎসকেরা জালালউদ্দিনকে মৃত ঘোষণা করেছেন।

সোমবার দিবাগত রাতে মিরপুরে মধ্য পীরেরবাগে সন্ত্রাসীদের গুলিতে মারাত্মক আহত হন জালাল উদ্দীন। একটি গুলি তাঁর বাঁ কানের ঠিক ওপর দিয়ে লেগে মস্তিষ্কে (ব্রেইন) চলে যায়। মস্তিষ্ক ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। আরেকটি গুলি মাথার পাশ দিয়ে লেগে বাইরে চলে যায়। রাত দুইটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। জালালউদ্দিনের স্বজনেরা বলেন, হাসপাতালে যখন আনা হয়, তখনো জালালউদ্দিনের জ্ঞান ছিল। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হাসপাতাল থেকে তা-ই জানানো হয়েছিল। তবে তাঁরা পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা জানান, জালালউদ্দিন নিহত হয়েছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জালালউদ্দিন ১৯৮৯ সালে কনস্টেবল পদে পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন। সেখান থেকে সহকারী উপপরিদর্শক, উপপরিদর্শক, তারপর পরিদর্শক। পেশাকে ভালোবাসতেন। প্রায় রাতেই বাড়ি ফিরতে দেরি হতো। সোমবারও বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে স্ত্রীকে বলেছিলেন, গেটের চাবিটা নিজের কাছে রাখতে। তিনি গভীর রাতে বাড়ি ফিরবেন। দারোয়ানের ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে, মীনাই যেন দরজাটা খোলেন। জালাল উদ্দীন আর বাড়ি ফেরেননি। মিরপুরের অভিযানে নিহত হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গ ঘুরে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে আসে তাঁর মৃতদেহ। সেখান থেকেই স্বজনেরা মৃতদেহ নিয়ে যান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে। সেখানেই তাঁকে দাফন করার কথা রয়েছে।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে অপেক্ষায় আছেন জালাল উদ্দীনের মা আয়েশা বেগম। গতকাল তাঁর মা ঘুরেফিরে বারবার বলেছেন ছেলের কৃতিত্বের কথা। তাঁর ভালো ছেলে, যিনি কিনা ভালো কাজ করেন, প্রধানমন্ত্রীর হাত থেকে পুরস্কার নিয়েছেন, তাঁকে কারা মেরে ফেলল বুঝে উঠতে পারেন না বৃদ্ধ মা। কিন্তু তিনি ছেলের খুনিদের ফাঁসি চান। রাজারবাগে জালাল উদ্দীনের জানাজার পর পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. জাবেদ পাটোয়ারী সংক্ষিপ্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পরিবারকে খুব একটা সময় দিতে পারতেন না পুলিশের এই পরিদর্শক। তিনি বিভিন্ন দুঃসাহসিক অভিযানে অংশ নিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছেন।মো. জালালউদ্দিনমো. জালালউদ্দিন
তবে স্বজনেরা বলেন, এত ব্যস্ততার মধ্যেও দুই মেয়ের জন্য সময় বের করার চেষ্টা করতেন মো. জালাল উদ্দীন। জান্নাতুল ফেরদৌস তৃপ্তি ও ফারহানা আফরোজ তূর্যা নামের দশম ও অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া দুটি মেয়ে রয়েছে তাঁর। ফিরতে যত রাতই হোক, ভিকারুননিসা নূন স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে মোটরসাইকেলে করে স্কুলে পৌঁছে দিতেন। মেয়েদের খালা রিম্পা খাতুন গতকাল বলেন, রাতের পালায় কাজ করলেও ভোরে বাড়ি ফিরে মেয়েদের সঙ্গে গল্পগুজব করতেন জালাল উদ্দীন। তারপর স্কুলে বা কোচিংয়ে দিয়ে আসতেন। রোববার সকালে মেয়েরা ঘুম থেকে উঠতে দেরি করায় ঠাট্টা করে বলেছিলেন, তাঁর কাজ অনেক বেড়ে গেছে। মেয়েরা কান্নাকাটি করলেও তাঁর পক্ষে হয়তো আর স্কুলে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে না।
গতকাল মো. জালাল উদ্দীনের বাসাবোর বাসা থেকে স্ত্রী মীনা পারভিনকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে নেওয়া হয় স্বামীর লাশ দেখানোর জন্য। দুই মেয়েও ছিল পেছনে। মাথায় কালো কাপড়ের ঘোমটা টেনে বড় মেয়েটি হতবিহ্বল চেহারা নিয়ে বসে ছিল। পুলিশ পরিদর্শক বাবার ইচ্ছা ছিল বড় মেয়েকে চিকিৎসক বানাবেন। মেয়েও চেষ্টা চালাচ্ছিল। হঠাৎ বাবার অনুপস্থিতি সব এলোমেলো করে দিয়েছে। ভবিষ্যতে কী হবে, এই ভেবে মীনা পারভিন কাঁদছিলেন অঝোরে।
জানাজার আগে মো. জালাল উদ্দীনের বড় ভাই মো. জামাল উদ্দীন হোসেন পুলিশ বাহিনীকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাচ্চা দুটোকে দেখবেন ভাই আপনারা। ওদের আর কেউ নেই। বাবাই ছিল সব। ওদের দিকে একটু খেয়াল রাখবেন দয়া করে।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here