নতুন কোনো পদ রান্না করে সন্তানদের খাওয়ানোর তাড়া নেই, কেনাকাটা-হইহুল্লোড় নেই।

0
60

ঈদ মানেই অস্বস্তি এখন। নতুন কোনো পদ রান্না করে সন্তানদের খাওয়ানোর তাড়া নেই, কেনাকাটা-হইহুল্লোড় নেই। মীর সামেহ মোবাশ্বেরের বাবা-মায়ের চিন্তা এখন ঈদের সময় কোথায় গিয়ে বাঁচবেন। তাঁদের অস্বস্তি হচ্ছে, গল্পচ্ছলে কেউ যদি ছেলের প্রসঙ্গটা তোলে!

গুলশানের হোলি আর্টিজানে যে পাঁচ জঙ্গি ২২ জনকে হত্যা করেছিল, তাদের একজন মীর সামেহ মোবাশ্বের। সম্প্রতি পরিবারটির ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনিই বলছিলেন, হোলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলা তাঁদের দমবন্ধ একটা জীবনে আটকে ফেলেছে। ছেলে হারিয়েছেন, কিন্তু শোক করতে পারেন না। এমন কাজে প্রাণ গেছে সামেহর, যা শুধু তাঁদের লজ্জাই দিয়েছে।

অথচ ১৮ বছরের সামেহর জঙ্গিবাদে জড়ানোর কথা ছিল না। ওর মা ঢাকার সরকারি একটি কলেজের অর্থনীতির অধ্যাপক, বাবা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। বড় ভাই কানাডায় একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র। নিজের একটা গানের দল আছে। সামেহ পড়ালেখা, বুদ্ধি-বিবেচনায় পিছিয়ে ছিল। সহপাঠীরা এসব নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করত। সামেহর মন বিদ্রোহী হয়ে উঠত। বন্ধুবান্ধব, আড্ডা কোনো কিছুতেই সে যুক্ত হতে পারত না। বাবা-মা সান্ত্বনা দিতেন।

এই সামেহ চার মাস নিখোঁজ ছিল। পুলিশ, র‍্যাব, গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা সংস্থা কেউ খোঁজ দিতে পারেনি তার। হঠাৎ ২০১৬ সালের ২ জুলাই সকালে পত্রিকা খুলে সামেহর বাবা-মা জানলেন, ছেলে হোলি আর্টিজানে যৌথ বাহিনীর অভিযানে নিহত হয়েছে। সে জঙ্গি হয়ে গিয়েছিল। সামেহর বাবা-মা-ভাইয়ের জীবন বদলে গেল ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে। তাঁরা আর কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেন না। সামেহর বড় ভাই দেশে আসতে পারেন না। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে সামেহর বাবা-মা মৃত্যুর দিন গোনেন।

পালিয়ে বেড়ানো জীবনে আটকে আছে বাকি পরিবারগুলোও। হোলি আর্টিজানে হামলাকারী রোহান ইমতিয়াজের মা স্কলাসটিকা স্কুলের গণিত শিক্ষক ছিলেন। বাবা ইমতিয়াজ খান ক্রীড়া সংগঠক, রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, ব্যবসা-বাণিজ্য করেন। রোহান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিল। রাজনীতিতে জড়িয়ে যদি লেখাপড়া ছেড়ে দেয়, যদি সেশনজটে আটকা পড়ে, এমন হাজারো শঙ্কা থেকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছিলেন বাবা-মা। সেই ছেলে শেষ পর্যন্ত জঙ্গি পরিচয়ে মারা পড়ল।

ইমতিয়াজ খান বা তাঁর স্ত্রী সংবাদমাধ্যমে এই প্রসঙ্গটি নিয়ে আর কথা বলতে চান না। তাঁদের পারিবারিক এক বন্ধু বলেন, ইমতিয়াজ বরাবর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিল। জঙ্গি হিসেবে ছেলের মৃত্যুকে তিনি তাঁর স্খলন হিসেবে ধরে নিয়েছেন। বাংলাদেশ সাইক্লিস্ট ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক, অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের উপমহাসচিব ও মহানগর আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া কমিটির পদে ছিলেন। পদগুলো হারিয়েছেন। রোহান ইমতিয়াজের মা চাকরি ছেড়েছেন। লালমাটিয়ার বাসা বদলে চলে গেছেন অন্য কোথাও। আশপাশের লোকজন যারা পরিবারটিকে চিনত, তারাও জানে না তাঁরা কোথায় গেছেন।

নিবরাস ইসলামের বাবা-মাও এখন সামাজিক অনুষ্ঠানগুলো এড়িয়ে চলেন। নিবরাসের বাবা বলছিলেন, স্বতঃস্ফূর্ততা কী জিনিস তা তাঁরা ভুলে গেছেন।

বগুড়ার খায়রুল ইসলাম ওরফে পায়েল এখন মা আর বোনদের অশান্তির কারণ। কোথাও গেলে লোকে খায়রুলের মাকে বলে জঙ্গির মা। বড় মেয়ের সংসার টিকে আছে কোনো রকমে। অশান্তির শেষ নেই। ঘটনার পরপর পুলিশের লোকজনের ঘন ঘন যাতায়াত বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছিল শফিকুল ইসলাম ওরফে উজ্জ্বলের পরিবারকে। শফিকুলের বাবা বলছিলেন, মেনে নিতে হয়েছে কারণ ছেলে, নিরীহ মানুষকে হত্যা করে ‘জঘন্য’ কাজ করেছে।

একঘরে হয়ে থাকা পরিবারগুলোকে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম জঙ্গিবাদবিরোধী প্রচার কার্যক্রমে যুক্ত করতে চাইছে। উদ্দেশ্য যারা জঙ্গিবাদে জড়িয়েছে, তাদের বোঝানো জঙ্গিবাদ পরিবারকে তছনছ করে দেয়। যাঁরা জঙ্গি হামলা চালিয়ে মরতে চান, তাঁরা যেন স্বার্থপরতা ভুলে একবার বাবা-মা আর ভাই-বোনদের কথা ভাবেন।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here