নির্মাণের দায়িত্ব ঠিক করতে করতেই দুই বছর পার

0
189

পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় করবে, না কি ক্রীড়া মন্ত্রণালয় করবে, এ নিয়ে টানাটানিতে বছরখানেক সময় কেটে গেছে। পরে ঠিক হয়, এটি নির্মাণ করবে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি)। সেই অনুযায়ী রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এনএসসিকে জমিও বরাদ্দ দিয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিজেরাই এই স্টেডিয়াম নির্মাণ করতে চায়। এ নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে টানাটানি।
২০০৪ সাল পর্যন্ত মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম শুধু ফুটবল ও অ্যাথলেটিকসের জন্য ব্যবহৃত হতো। সরকারের কাছ থেকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ পেয়ে ২০০৬ সালে এটিকে দেশের ক্রিকেটের সদর দপ্তর হিসেবে গড়ে তোলে বিসিবি। নামকরণ হয় মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ১৯৮০-এর দশকে এ স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছিল ফুটবল ও অ্যাথলেটিকসের জন্য। এ কারণেই এটি ক্রিকেটের জন্য উপযোগী ডিম্বাকৃতির (ওভাল) নয়, বৃত্তাকার।
ক্রিকেটের ড্রেসিংরুম সাধারণত স্টেডিয়ামের প্রান্তে থাকে। কিন্তু নির্মাণশৈলীর কারণেই বর্তমান শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে তা পেটের পশ্চিম দিকে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ হসপিটালিটি বক্স (অতিথিকক্ষ) গড়ারও কোনো সুযোগ নেই এখানে। সবচেয়ে বড় সমস্যা, দর্শক ধারণক্ষমতা মাত্র ২৫ হাজার ১০০। বড় কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ হলে টিকিটের চাহিদা অনুযায়ী দর্শককে জায়গা দেওয়া যায় না। তাই বাংলাদেশে আরেকটি আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনেক আগে থেকেই ছিল।
রাজউকের মহাপরিকল্পনায় জাতীয় ক্রীড়া কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে ওই স্টেডিয়াম নির্মাণের জন্য জায়গাও বরাদ্দ ছিল পূর্বাচলে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে রাজউক সেটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। পরে বিসিবির চাহিদা অনুযায়ী ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, পূর্বাচলে একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম গড়ে তোলা হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর পরপরই রাজউক স্থান নির্বাচন করে স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে নেমে পড়ে। তবে দেশের সব স্টেডিয়াম বা ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের দায়িত্বে থাকা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ স্টেডিয়ামটি নির্মাণে আগ্রহ প্রকাশ করে। এতে শুরু হয় রাজউক ও ক্রীড়া পরিষদের দ্বন্দ্ব।
অবশ্য কয়েক মাস পর রাজউক স্টেডিয়ামটি নির্মাণের পরিকল্পনা থেকে সরে দাঁড়ায়। গত বছরের ২৭ জুলাই ক্রীড়া পরিষদকে প্রায় ৩৭ দশমিক ৫০ একর জমি বরাদ্দ দেয় রাজউক। এটি পূর্বাচলের ১ নম্বর সেক্টরে বালু নদীর তীরে, ৩০০ ফুট চওড়া রাস্তার দক্ষিণ পাশে। বাণিজ্যিক শ্রেণিতে প্রতি কাঠা ১০ লাখ টাকা হিসাবে জমির মোট দাম ২২৬ কোটি ৭৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।
৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা ব্যয় ধরে ক্রীড়া পরিষদ প্রস্তাবিত স্টেডিয়ামটির সম্ভাব্যতা যাচাই করতে দিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়কে। এরই মধ্যে বিসিবি নিজেরাই এই স্টেডিয়াম নির্মাণে আগ্রহ দেখায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এ ব্যাপারে ক্রীড়া পরিষদের মতামত চেয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে সম্প্রতি চিঠি দিয়েছে। এর পরপরই থেমে গেছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
বিসিবির পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি হবে ৫০-৬০ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার অত্যাধুনিক স্টেডিয়াম। এখানে থাকবে অনুশীলন সুবিধার জন্য মাঠসহ একটি একাডেমি, ইনডোর, স্বয়ংসম্পূর্ণ জিম এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক—একটি পাঁচ তারকা হোটেল। সফরকারী ও স্বাগতিক দল থাকবে এই হোটেলেই। দলগুলো হোটেলে থেকে অনুশীলন করতে পারবে। হোটেলের করিডর পেরিয়ে সরাসরি চলে আসবে ড্রেসিংরুমে। এতে দলগুলোর নিরাপত্তা ঝুঁকি কমবে অনেকাংশেই।
এই স্টেডিয়ামই হবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন সদর দপ্তর, ‘হোম অব ক্রিকেট’। এটি নির্মিত হলে মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট কি ছেড়ে দেবে বিসিবি? বিসিবির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, শেরেবাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামও থাকবে বিসিবির হাতে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট এবং আন্তর্জাতিক দলগুলোর অনুশীলন সুবিধার জন্য ব্যবহৃত হবে সেটি।
জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সূত্র জানিয়েছে, স্টেডিয়াম নির্মাণে বিসিবির আগ্রহের বিষয়ে ক্রীড়া পরিষদ নিজেদের মতামত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি চিঠি পাঠানোর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে ফেলেছে। ক্রীড়া পরিষদ মনে করে, বিসিবি এই স্টেডিয়াম নির্মাণ করলে জমির মালিকানা ক্রীড়া পরিষদ থেকে বিসিবির হাতে যাওয়া উচিত। আর বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্টেডিয়াম ও নানা ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণের যে জ্ঞান ও দক্ষতা ক্রীড়া পরিষদের আছে, বিসিবির তা নেই। সে ক্ষেত্রে কোনো নির্মাণপ্রতিষ্ঠানকে দিয়ে কাজ করাতে হবে বিসিবিকে এবং এতে বাড়তি ব্যয় হবে।
এ ব্যাপারে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন চৌধুরীর দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি বলেন, এটি বিসিবিও নির্মাণ করতে পারে, সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগও করতে পারে। তিনি বলেন, ‘নিজেরাই স্টেডিয়াম নির্মাণের আগ্রহের কথাটাই আমরা শুধু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে জানিয়েছি। স্টেডিয়াম কারা নির্মাণ করবে, সে ব্যাপারে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত।’
বিসিবি-ক্রীড়া পরিষদের মধ্যে টানাটানি শুরু না হলে এই স্টেডিয়ামের কাজ অনেক দূর এগিয়ে যেত। এখন কবে নাগাদ এটি নির্মিত হতে পারে? ৩১ অক্টোবর নির্বাচনের মাধ্যমে বিসিবির দায়িত্বে আসছে নতুন কমিটি। এই কমিটির চার বছর মেয়াদকালেই স্টেডিয়াম নির্মিত হবে বলে আশাবাদী নিজামউদ্দিন চৌধুরী, ‘নতুন কমিটির অন্যতম প্রতিশ্রুতিই হলো এই স্টেডিয়াম নির্মাণ। আশা করা যায়, আগামী চার বছরের মধ্যেই নতুন হোম অব ক্রিকেট পাবে বাংলাদেশের ক্রিকেট।’
মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়াম তৈরির কাজে যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক শামীম জেড বসু মিয়া। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সদস্যও ছিলেন দীর্ঘ দিন। নতুন স্টেডিয়ামটি নির্মাণের দায়িত্ব ঠিক করতে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘স্টেডিয়ামটি নির্মাণের দায়িত্ব ক্রীড়া পরিষদের হাতে থাকলেই ভালো। কারণ, তাদের নিজস্ব প্রকৌশল বিভাগ আছে। বিসিবি করলেও সমস্যা দেখি না। তবে সে ক্ষেত্রে তাদের ভালো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করতে হবে।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here