নির্মান কাজ অসমাপ্ত রেখেই এক কোটি দশ লাখ টাকার বিল

0
68
নির্মান কাজ অসমাপ্ত রেখেই এক কোটি দশ লাখ টাকার বিল

বরিশালের গৌরনদী ও মাদারীপুর জেলার কালকিনির সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি খালের মধ্যে স্লুইস গেটের নির্মান কাজ অসমাপ্ত রেখেই এক কোটি দশ লাখ টাকার বিল তুলে নেয়ার অভিযোগ উঠেছে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

এদিকে দীর্ঘদিন ধরে স্লুইসগেটের কাজ ফেলে রাখার কারণে গৌরনদী ও কালকিনি উপজেলার লক্ষাধিক কৃষককে বোরো চাষে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কোটি টাকার বেশী বিল তুলে নেওয়ার পরে সাত বছর অতিবিাহিত হলেও ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড।

জানা গেছে, বোরো মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করতে গৌরনদীর খাঞ্জাপুর, দক্ষিন মাগুরা চতলা খালের (বেবাইজ্জার খাল) বাকাই গ্রামে স্লুইসগেট নির্মানের জন্য বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ২০১০-২০১১ অর্থ বছরে একটি প্রকল্প গ্রহন করে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ১ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। খুলনার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এ্যান্ড কোম্পানী লিমিটেডেটকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কার্যাদেশ দেওয়া হয়।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স আমিন এ্যান্ড কোম্পানী লিমিটেডের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বভার গ্রহন করে বরিশালের ঠিকাদার আব্দুস সালাম, জামাল হোসেন ও বদরুল আলম কাজ শুরু করে। নাম প্রকাশে অনিচ্চুক বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানান, ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ৩০/৩৫ ভাগ কাজ শেষ করে ২০১৩ সালে প্রথম চলতি বিল হিসেবে এক কোটি ১০ লাখ টাকা বিল উত্তোলন করে। পরবর্তিতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় চলতি বিল হিসেবে ২৬ লক্ষ টাকার বিল পাওয়ার আবেদন করে। বিগত ৭ বছর কাজ না করে অসমাপ্ত অবস্থায় ফেলে রাখে।

ওই কর্মকর্তা আরো জানান, এখনো প্রকল্পটির ব্লক বসানো, মাটির কাজ, চ্যানেল কর্তন, এপ্রোচ সড়ক, ও রডের কিছু কাজসহ ৭০/৮০ লাখ টাকার কাজ বাকি রয়েছে। অথচ ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান এক কোটি দশ লাখ টাকা বিল তুলে নিয়েছে এবং ২৬ লাখ টাকার বিল পরিশোধের প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। প্রভাবশালীদের দিয়ে কর্মকর্তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান দ্বিতীয় চলতি বিলের ২৬ লক্ষ টাকা নেওয়ার পায়তারা করছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, স্লুইস গেটের কাঠামো নির্মাণ করে জলকপাট বসানো হয়েছে। লোহার জলকপাট বসানোর পরে দীর্ঘদিন তা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় মরিচা ধরে বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্লুইস গেটের দুই দিকের চারপাশে ব্লক বসানো কাজের কিছুই করা হয়নি। শুধুমাত্র উইং ওয়াল নির্মান করে ফেলে রাখা হয়েছে।

এলাকাবাসী জানায়, ঠিকাদার ৩০/৩৫ ভাগ কাজ করে কোটি টাকারও বেশী বিল নিয়ে ৭/৮ বছর ধরে লাপাত্তা। এ কাজ সম্পন্ন না হওয়ার সম্ভবনাই বেশী। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে, কৃষকদের দূর্ভোগের কথা জানিয়ে ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহনে কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার লিখিতভাবে আবেদন করার পরেও তারা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহন করেনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, গৌরনদী ও কালকিনির সীমান্তবর্তী বাকাই স্লুইসগেট নির্মানাধীন প্রকল্পটি এখন কৃষকের মরণফাঁদ। কাজ শেষ না করায় গত ৭/৮ বছর ধরে তা সাধারণ কৃষকদের গলার কাঁটায় পরিনত হয়েছে। খালের মধ্যে বাঁধ দিয়ে স্লুইস গেট নির্মান কাজ করায় পানি চলাচল বন্ধ রয়েছে। যে কারনে বোরো মৌসুমে সেচ সংকটের কারনে বোরো আবাদি জমিতে পানি সরবারহে ভোগান্তি পোহাতে হয়। এছাড়া সাধারণ পথচারীসহ ১০ গ্রামের মানুষকে চলাচলে ভোগান্তি পোহাতে হয়।

গৌরনদী উপজেলার খাঞ্জাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. নুর আলম সেরনিয়াবাদ অভিযোগ করে বলেন, দীর্ঘ ৭ বছর কাজটি ফেলে রাখার পরেও কি কারনে পানি উন্নয়ন বোর্ড ঠিকাদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তা আমার বোধগম্য নয়। সরকারের কোটি টাকার বেশী টাকা অপচয় হল অথচ জনসাধারনকে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। সাধারণ কৃষকের স্বার্থে অতি দ্রুত এ সমস্যার সমাধানে স্থানীয় প্রশাসন উর্ধতন কতৃপক্ষের সহায়তার দাবি জানান তিনি।

ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বদরুল আলম মুঠোফোনে বলেন, এলাকাবাসীর অসহযোগীতার কারনে সঠিকভাবে কাজটি শেষ করা সম্ভব হয়নি। এক কোটি দশ লাখ টাকার বিল নেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, আমরা যতটুকু কাজ করেছি ততটুকু বিল নিয়েছি।

গৌরনদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নজরুল ইসলাম সাধারণ কৃষকদের দূর্ভোগের কথা স্বীকার করে বলেন, স্লুইস গেটটির নির্মান কাজ বন্ধ থাকায় কৃষকদের অপুরনীয় ক্ষতি হচ্ছে।

বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাহবুবুর রহমান বিল প্রদানের কথা স্বীকার করে বলেন, ঠিকাদারকে বারবার তাগিদ দেয়া সত্বেও কাজটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। কৃষকদের দূর্ভোগের কথা স্বীকার করে তিনি আরও বলেন, অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে কাজটি শেষ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেন ৫০ ভাগ কাজ শেষ করা হয়েছে।

গৌরনদী উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খালেদা নাসরিন এ প্রসঙ্গে বলেন, সদ্য যোগদান করায় বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত নই, খোঁজ নিয়ে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাজ না করে যদি ঠিকাদার বিল উত্তোলন করে নেয়, তাহলে পানি উন্নয়ন বোর্ড ও ঠিকাদারের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here