পলিথিনের ছাউনিতে বিত্তশালীরাও

0
132

‘১০০ একরের চিংড়িঘের আমার। আরও আছে ২০ একরের আবাদি জমি। বাড়িতে সৌরবিদ্যুতে ফ্রিজ-টিভি সবই চলে। ছেলেমেয়েরা ঘোরে দামি গাড়িতে। আর আমি এখানে ১০ ফুট বাই ১০ ফুটের পলিথিন ছাউনির বাসিন্দা, বেঁচে আছি রিলিফ খেয়ে। এটাও একটা জীবন।’

তুমব্রু সীমান্তে দাঁড়িয়ে এভাবেই শরণার্থী জীবনের কথা বলছিলেন আরিফুল ইসলাম। বললেন, ‘প্রথম প্রথম কাঁদতাম, এখন আর কান্না আসে না। চোখের পানি শুকিয়ে গেছে।’

অন্য সব রোহিঙ্গা থেকে আরিফুল একেবারেই আলাদা। তিনি শিক্ষিত, কথা বলেন শুদ্ধ বাংলায়। আঞ্চলিক ভাষার পাশাপাশি ভালো বাংলা ও ইংরেজি জানেন। এ জন্য রোহিঙ্গারা তাঁকে বাড়তি শ্রদ্ধা করে। তাদের ভাষায়, আরিফুল ‘এলেম’ (জ্ঞানী) ব্যক্তি।

আরিফুল ইসলামের ত্রাণশিবিরটি একটি খালের পাড়ে। পাথরকাটা নামের এই খালটি দুভাগ করেছে দুই দেশকে। এক দিকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তুমব্রু সীমান্তের কোনারপাড়া আর অন্য দিকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের তুমব্রু রাইট গ্রাম। পাহাড়-ঘেঁষা কাঁটাতারের বেড়া প্রতিদিন আরও শক্ত করছে মিয়ানমার। বেড়ার ঠিক নিচেই একচিলতে সমভূমি—এর নাম শূন্যরেখা (নো ম্যানস ল্যান্ড)। এটি আন্তর্জাতিক সীমানা, যা কোনো দেশেরই নয়। এই শূন্যরেখার ওপরই বাস করছে আরিফুলেরসহ ১ হাজার ৩৫০ পরিবারের ৬ হাজারের বেশি মানুষ।

শূন্যরেখায় শিবির হওয়ার কারণে বসতি স্থাপনকারীদের ত্রাণ ও চিকিৎসা নিতে এপারে আসতে হয় খালের হাঁটুজল পেরিয়ে। সেখানেই কথা হয় আরিফুলের সঙ্গে। বললেন, ১০ বছর ধরে তিনি বাংলাদেশ-মিয়ানমারের মধ্যে অনুষ্ঠিত পতাকা বৈঠকে মধ্যস্থতা করেছেন। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বহু কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর দহরম-মহরম ছিল। কিন্তু বিপদের সময় কেউ এগিয়ে আসেনি। নিজের বাড়িতে জ্বলন্ত আগুনের কুণ্ডলী দেখতে দেখতে তিনি সীমান্ত পার হয়েছেন।

আরিফুলের সঙ্গে গত শনিবার দুপুরে কথা বলার সময় ওই সীমান্ত পরিদর্শনে আসেন কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল মনজুরুল হাসান খান। তিনি জানালেন, কোনারপাড়া ক্যাম্পের বেশির ভাগ বাসিন্দা সীমান্তের কাছাকাছি গ্রামে বাস করত। এদের অনেকেই বেশ সচ্ছল।

আরিফুলের মতো মমতাজ চৌধুরীর জমি আছে ৫০০ একর। ১১টি চিংড়িঘের। বছরে লাখ লাখ টাকা আয়। ধানের জমিও আছে অনেক। আরেকজন দীন মোহাম্মদ ও আখতার চেয়ারম্যান। এঁরা রাখাইন রাজ্যের পাঁচটি জেলার মানুষের কাছে পরিচিত। তাঁরা বললেন, তাঁদের গ্রামে হামলা হয়েছে গত ২৫ আগস্ট রাত একটার দিকে। সেনাবাহিনী মর্টার শেল নিক্ষেপ করে গ্রাম জ্বালিয়ে দিতে শুরু করে। রাতে সবাই জঙ্গলে আশ্রয় নেন। সকাল নয়টা পর্যন্ত সেখানে লুকিয়ে থেকে সীমান্ত পাড়ি দেন। তাঁরা জানান, তুমব্রু রাইট গ্রামে ৪০০ বাড়ি ছিল, এখন একটিও অবশিষ্ট নেই। সবই পোড়া ছাই।

মংডু শহর থেকে ১৪ মাইল দূরের থানা সদর বলীবাজার। সেই বাজারের চারটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিক মো. ইউসুফ। উখিয়ার বালুখালী-১ ক্যাম্পের বাসিন্দা এখন তিনি। বললেন, কোরবানির ঈদের আগের দিন সেনাবাহিনী গ্রামে ও বাজারে হামলা চালায়। সব লোককে ধরে তুলাতলী গ্রামের পাশের নদীতে গুলি করে মারে। পরিবার নিয়ে কোনোমতে পালিয়ে আসেন তিনি। তিনি বলেন, বছরে তাঁর লাখ লাখ টাকা আয়। সেই টাকায় আরও অনেক পরিবার চলে। নিজের এলাকার বড় ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। কাঁধের গামছা দিয়ে চোখ মুছে রোহিঙ্গা ভাষায় বললেন, ‘এখন ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকি, খুব খারাপ লাগে।’ তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় নবম শ্রেণিপড়ুয়া ছেলেটি দাঁড়িয়ে ছিল।

মো. ইউসুফ পাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কিন্তু তাঁরা নিজেদের প্রসঙ্গে কিছু বলতে চান না। সবাই জানতে চান, তাঁরা কবে দেশে ফিরতে পারবেন।

বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে মংডু পর্যন্ত যে বাস চলাচল করে সেই পরিবহন কোম্পানির মালিক আরিফুল। লোকে তাঁকে আরিফুল সওদাগর হিসেবে চেনে। বালুখালী-১ ক্যাম্পের পাহাড়ের ওপর বেশ ভালো একটি জায়গায় ছাউনি হয়েছে আরিফুল। সেখানে একটি চেয়ারে বসে ছিলেন তিনি শনিবার বিকেলে। কথা বলতে চাইলে বললেন, বাসের পাশাপাশি স্বর্ণ এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে তাঁর। বছরে ৫-৬ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। নিজেও গাড়িতে চড়তেন। বললেন, সেনাবাহিনী ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁদের বাড়িতে হামলা চালিয়েছিল। সবই জ্বালিয়ে দিয়েছে। তাঁর গাড়িটিও বাদ নেই। এখন সব হারিয়ে পথের ভিখারি। আঞ্চলিক ভাষায় যা বললেন তা হলো, ‘আগে ভাই মানুষকে সাহায্য করতাম আর এখন সাহায্যের জন্যে বসে আছি।’

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের হিসাবে গতকাল পর্যন্ত রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছে ৫ লাখ ৫০ হাজার। এদের মধ্যে সচ্ছল-বিত্তশালী কত তার কোনো হিসাব নেই। জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বললেন, এটা বাছাই করা সম্ভব নয়। এখন সবার একটাই পরিচয় রোহিঙ্গা শরণার্থী।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর সমন্বিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব শরণার্থীর মধ্যে ৯২ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করছে। এদের বেশির ভাগই কক্সবাজার শহর, রামু, টেকনাফ এবং উখিয়া উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে অবস্থান করছে। কেউ কেউ চট্টগ্রাম বা অন্য কোথাও চলে গেছে। গত নয় দিনে বিভিন্ন ক্যাম্পে কথা বলে জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের সবাই হতদরিদ্র তা নয়। অবস্থাসম্পন্ন লোকও আছেন। এঁদের কারও আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকেন। কারও আছে দেশ-বিদেশে ব্যবসাও। তাঁরা চেষ্টা করে পূর্বপরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে কক্সবাজার বা আশপাশে বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে উঠেছেন। আবার অনেকে চলে যাচ্ছেন চট্টগ্রামে। বস্তিতে থাকা তাঁদের পক্ষে দুরূহ। তবে এসব বিত্তশালী নিজের পরিচয় দিতে চান না। পরিচিতজনের কাছেও মুখ লুকান। কথা বলতে চাইলে তাঁদের একটাই জিজ্ঞাসা, ‘ভাই আমরা কবে দেশে যাব?’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here