পা কাটার পর থেকে তাঁর স্বপ্নগুলোও যেন কেটেকুটে গেছে।

0
82
পা কাটার পর থেকে তাঁর স্বপ্নগুলোও যেন কেটেকুটে গেছে।

একদৃষ্টিতে কাটা পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন রাসেল। এই পা কাটার পর থেকে তাঁর স্বপ্নগুলোও যেন কেটেকুটে গেছে। বেশিক্ষণ কিছু ভাবতে পারেন না। দিশেহারা হয়ে পড়েন। কী হবে তাঁর? কীভাবে চলবে সংসার? ছোট্ট সন্তানের ভবিষ্যৎ সাজাবেন কী করে? ভাবনাগুলোর চাপে একপর্যায়ে ভেঙে পড়েন। এ সবকিছুই তাঁর স্ত্রীর কাছ থেকে শোনা। অস্ত্রোপচারের কারণে হাসপাতালে গিয়ে রাসেলের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়নি। স্ত্রীর কাছ থেকে জানা গেছে কষ্টের সঙ্গে তাঁদের বসবাসের কথা।

ঠিক এক মাস আগে যাত্রাবাড়ীতে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাসের চাপায় পা হারিয়েছিলেন তরুণ রাসেল সরকার (২৩)। আহত হওয়ার দিন থেকেই তিনি রাজধানী ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি আছেন। সেখানে তাঁর চিকিৎসা চলছে। এ পর্যন্ত বিচার বা ক্ষতিপূরণ কোনোটিরই নিশ্চয়তা পাননি।

সকালে অ্যাপোলো হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, উদ্বিগ্ন মুখ নিয়ে বসে আছেন রাসেলের স্ত্রী মিম আক্তার। তাঁর স্বামীকে গতকালও অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখন পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করতেই কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলতে থাকেন, ‘রাসেলের অবস্থা ভালো না। সব সময় কান্নাকাটি করে। কিছুদিন থেকে বারবার বলছেন, “আমি বুঝি আর বাঁচব না। আমার ছেলেকে নিয়ে এসো, ওকে দেখব।”’ পরে ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন মিম। দীর্ঘদিন স্বামীর সঙ্গে থাকতে থাকতে মিমের শরীরেও ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।

মিম জানালেন, এ বছর এসএসসি পাস করছেন তিনি। কারিগরি বোর্ড থেকে পরীক্ষা দিয়ে ভালো ফল করেছেন। মিম বলেন, শ্বশুরবাড়ি থেকে এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। ফলাফল ৪.২৬। ইচ্ছা ছিল আরও পড়াশোনা করবেন। স্বামীর এ অবস্থায় দিশেহারা তিনি নিজের পড়াশোনা নিয়েও শঙ্কিত।

ভেঙে পড়া কণ্ঠে মিম বলেন, ‘সংসারের উপার্জন করা মানুষটির এই অবস্থায় কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারছি না। কীভাবে আমার সংসার চলবে? কীভাবে রাসেল চলবে? আমার দুই বছরের ছেলে মিশুকে কে দেখবে? এগুলো ভেবেই দিশেহারা লাগে। সারাক্ষণ এগুলো নিয়ে দুশ্চিন্তা হয়। রাসেলের কান্না আমি সহ্য করতে পারি না’।

রাসেল সরকারের বড় ভাই আরিফ সরকার বলেন, এ পর্যন্ত পাঁচবার অস্ত্রোপচার হয়েছে রাসেলের। প্রায় সাড়ে ছয় ব্যাগ রক্ত দিতে হয়েছে তাঁকে। এখন পর্যন্ত গ্রিন লাইন বাসের কর্তৃপক্ষ একবার মাত্র এসে রাসেলের খোঁজ নিয়েছে। তাও সেটি আহত হওয়ার ১৫ দিন পর। এরপর আর কোনো খবরই তারা নেয়নি। এমনকি ক্ষতিপূরণের জন্য এক টাকাও ব্যয় করেননি।

আরিফ সরকার আরও বলেন, ‘তারা ক্ষতিপূরণ দেবে কি না, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। মানুষ মানুষের সঙ্গে এমন আচরণ করতে পারে—এটা আমি ভাবতেও পারি না। এখন রাসেলের বিচার নিয়েও আমি চিন্তিত। থানায় খোঁজ নিলে তারাও নির্দিষ্ট করে কিছু বলছেন না।’

আরিফ বলেন, ‘রাসেলের মুখের দিকে তাকানো যায় না। যতক্ষণ জেগে থাকে খালি কান্নাকাটি করে। বউ-ছেলে নিয়ে সে কীভাবে চলবে—এসব চিন্তা করে।’

রাসেল যে প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন, সেই প্রতিষ্ঠান পিআর এনার্জির ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ নবী বলেন, এখন পর্যন্ত চিকিৎসা খরচ চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠান। কিন্তু রাসেলের চিকিৎসায় দীর্ঘমেয়াদি খরচ ও তাঁর পুনর্বাসনের জন্য গ্রিন লাইন পরিবহনকে বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। অথচ বাস কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো সাড়া দিচ্ছেন না। শুধু মামলা করে এ বিষয় নিষ্পত্তি করা যাবে না। পরিবহন কর্তৃপক্ষকে মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিতে হবে।

বাসের চাপায় রাসেল সরকারের পা হারানোর ঘটনায় রাজধানী ঢাকায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি মামলা হয়। মামলায় গ্রিন লাইন বাসের চালক কবির মিয়াকে আসামি করা হয়েছে। রাসেল সরকারের বড় ভাই মো. আরিফ সরকার মামলাটি করেন।

যাত্রাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিজুর রহমান বলেন, ‘মামলায় বাসের চালক গ্রেপ্তার আছেন। মামলাটি আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে এর বিভিন্ন দিক জানা যাবে।’

মামলা তদন্তের এই পর্যায়ে এটি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি ওসি।

আহত রাসেল সরকারের বাড়ি গাইবান্ধার পলাশবাড়ী এলাকায়। তাঁর বাবার নাম শফিকুল ইসলাম। রাসেল রাজধানীর আদাবরে সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় থাকেন। রাসেলের বন্ধু ও আত্মীয়রা রাসেলের পা হারানোর জন্য দায়ী চালকের বিচার চেয়ে পলাশবাড়ীতে মানববন্ধন করেছিলেন।

রাসেল সরকার একটি রেন্ট-এ-কার প্রতিষ্ঠানে গাড়ি চালাতেন। একটি কোম্পানি রাসেল সরকারের গাড়ি ভাড়া করেছিল। গত ২৮ এপ্রিল বিকেলে ওই কাজ শেষ করে কেরানীগঞ্জ থেকে তিনি ঢাকায় ফিরছিলেন। পথে যাত্রাবাড়ীতে গ্রিন লাইন পরিবহনের একটি বাস তাঁর গাড়িকে ধাক্কা দেয়। পরে গাড়ি থামিয়ে বাসের সামনে গিয়ে বাসচালককে নামতে বলেন রাসেল। তাঁদের দুজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। এ সময় গ্রিন লাইন পরিবহনের চালক বাস চালানো শুরু করেন। তখন রাসেল সরতে গেলে ফ্লাইওভারের রেলিংয়ে আটকে পড়েন। তাঁর পায়ের ওপর দিয়েই বাস চলে যায়। এতে তাঁর বাঁ পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পথচারীরা রাসেলকে উদ্ধার করে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে সেখান থেকে স্কয়ার হাসপাতাল ও পরে অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। এক মাস ধরে সেখানেই আছেন তিনি।

 

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here