পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ : অতিরিক্ত পুলিশ সুপার

0
70
নাগরিক জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও সার্বিক নিরাপত্তা বিধানে বাংলাদেশ পুলিশের সদস্যগণ সর্বদা নিবেদিত প্রাণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন, গণতন্ত্র রক্ষা ও জন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনী যে দেশপ্রেম ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে তা সাধারণ মানুষের কাছে প্রশংসা পেয়েছে। নাগরিক সেবার মান উন্নয়ন এবং অপরাধ দমনে জনগণকে সম্পৃক্ত করা এবং জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ও সহযোগিতার মাধ্যমে নিরাপদ রাষ্ট্র নিশ্চিত করাই বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান চ্যালেঞ্জ— যেখানে কমিউনিটি পুলিশিং এর কোনো বিকল্প নেই। মডার্ন পুলিশিং-এর মূল কথাই হলো ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ ।
‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই শ্লোগানের প্রতিষ্ঠাতা যিনি এবং যার প্রচেষ্টায় এই শ্লোগানটি সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে, তিনি হলেন আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার জনক লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রতিষ্ঠাতা স্যার রবার্ট পিল। তিনি সনাতনী পুলিশ ব্যবস্থাকে আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থায় রূপ দিতে গণমুখী (community oriented), প্রতিরোধমূলক (proactive) এবং সমস্যার সমাধানমূলক (problem solving) পুলিশি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন যেখানে জনগণকে সম্পৃক্ত করে, জনগণের অংশীদারিত্বের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের ভিত্তিতে পুলিশি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। রবার্ট পিলের গণমুখী পুলিশিং-এর মূলনীতি থেকে মূলত কমিউনিটি পুলিশিং এর ধারণার জন্ম।
কমিউনিটি পুলিশিং কী?
কমিউনিটি পুলিশিং-এর মূল কথা হলো কমিউনিটির সদস্য অর্থাত্ সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশিং কার্যক্রম পরিচালনা করা। যেখানে প্রয়োজনে সাধারণ মানুষ পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কমিউনিটি পুলিশিং-এ  কমিউনিটির অংশীদারিত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
‘কমিউনিটি পুলিশিং’ একটি সংগঠনভিত্তিক দর্শন ও ব্যবস্থাপনা যা জনগণকে সম্পৃক্ত করে, জনগণ, সরকার ও পুলিশের অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে অপরাধ দমন ও সমস্যার সমাধানকল্পে অপরাধের কারণ দূর করে, মানুষের মধ্যে অপরাধভীতি হ্রাস করে সার্বিক নিরাপত্তা বিধান করে ও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার সমাধান দেয়। বর্তমানে আধুনিক পুলিশিং কার্যক্রমে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে জনগণের অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই পুলিশিং কার্যক্রম সফলতা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে যার কৃতিত্বের অংশীদার জনগণ এবং এটিই ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ এর মূল কথা।
কমিউনিটি পুলিশিং এর মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য:
১. জনগণকে অপরাধ দমন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সমাজের বহুবিধ সমস্যা সমাধানে সম্পৃক্ত করে পুলিশ ও জনগণের পারস্পরিক সহযোগিতা এবং অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি গণমুখী পুলিশি ব্যবস্থা গড়ে তোলা যার সুফল ভোগ করবে জনগণ।
২. অপরাধ দমনে পুলিশকে সহায়তা করার মানসিকতা গড়ে তোলা এবং পুলিশের কাজে জনগণের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা এবং জনগণের প্রত্যাশা ও মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে সমস্যা ও সমস্যার কারণ চিহ্নিত করে তা সমাধানের পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা।
৩. জনগণকে নাগরিক অধিকার এবং তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করা। অপরাধ, দুর্নীতি ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
৪. পুলিশ ও জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ সৃষ্টি করা। পারস্পরিক আস্থা ও সমঝোতা তৈরি করে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব হ্রাস করা এবং একটি সম্প্রীতি ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে তোলা।
৫. পুলিশের সনাতনী মানসিকতার পরিবর্তন এনে তাদের আচার-আচরণে ও কর্মকাণ্ডে গণমুখী ও আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থার প্রতিফলন ঘটানো এবং পুলিশ ও জনগণের মধ্যকার দূরত্ব কমিয়ে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা।
বাংলাদেশে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম:
বাংলাদেশে প্রথম ১৯৯৩ সালে ময়মনসিংহ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে কমিউনিটি পুলিশিং চালু করা হয়। ময়মনসিংহের তত্কালীন পুলিশ সুপার এটি আহামেদুল হক চৌধুরী এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম শহীদুল হক গঠন করেন টাউন ডিফেন্স পার্টি (TDF)— যা পরে কমিউনিটি পুলিশিং এ রূপ লাভ করে। ১৯৯৪ সালে ঢাকা মহানগরীর কাফরুল ও ক্যান্টনমেন্ট থানা এলাকা কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমের আওতায় আসে এবং ২০০০ সালে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়ে সারা বাংলাদেশে। পরবর্তী কালে ২০০৫ সালে পুলিশ রিফর্ম প্রজেক্ট (PRP) এর মাধ্যমে কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমকে জোরদার করা হয়।
বর্তমান পুলিশ বাহিনী প্রধান এ কে এম শহীদুল হকের প্রত্যক্ষ দিক-নির্দেশনা এবং ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এই কার্যক্রম প্রতিটি থানায়, এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত যেমন ছড়িয়ে গেছে একইভাবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। কমিউনিটি পুলিশিং-এর মাধ্যমে বর্তমানে জঙ্গি-সন্ত্রাস দমন সহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা যেমন— মাদক, বাল্যবিবাহ, নারী ও শিশু  নির্যাতন দমন ইত্যাদি কার্যক্রমে পুলিশ ব্যাপক সফলতা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিককালে ‘কমিউনিটি পুলিশিং’ কার্যক্রমের সুফল জনগণ উপলব্ধি করতে পারছেন। যার ফলে পুলিশ ও জনগণের মধ্যে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটেছে এবং পুলিশ জনগণের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

 

লেখক: অতিরিক্ত পুলিশ সুপার
image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here