ফেসবুক ও টুইটার কি গণতন্ত্রের জন্য হুমকি ‍স্বরূপ !

0
402

খুব বেশি দূরের কথা নয়। সুস্থ, সমৃদ্ধ ও গতিশীল গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়েছিল যোগাযোগের সামাজিক মাধ্যম। গণতন্ত্রের হাতিয়ার হিসেবে সবাই সামাজিক মাধ্যমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন দেশের রাজনীতিতে সামাজিক মাধ্যমের ভূমিকা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই মাধ্যম গণতন্ত্রের জন্য হুমকি কি না, সেই প্রশ্নও ঘুরে-ফিরে উঠছে।

২০০৯ সালে ইরানের বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটিতে যে প্রতিবাদী আন্দোলন (সবুজ বিপ্লব) ছড়িয়ে পড়েছিল, তার কৃতিত্ব ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যমকেই দেওয়া হয়।

সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণেই ‘আরব বসন্ত’ দাবানলের মতো বিস্তার লাভ করেছিল। গণতন্ত্রের স্পৃহায় উদ্বুদ্ধ সর্বস্তরের আরব জনগণের তীব্র আন্দোলনের মুখে তিউনিসিয়া, মিসরসহ একাধিক দেশে স্বৈরশাসকের পতন ঘটে। আরব বসন্তে সামাজিক মাধ্যমের রাজনৈতিক প্রভাব সবাইকে অবাক করে।

সামাজিক মাধ্যম যোগাযোগকে সহজ করে দিয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে করেছে প্রশস্ত। এই মাধ্যমের আগমনে বিদ্যমান গণতন্ত্র আরও টেকসই হবে বলে মনে করা হচ্ছিল। ধারণা করা হচ্ছিল, এবার কর্তৃত্ববাদী শাসকদের পতনঘণ্টা বাজার পালা এসে গেছে। তবে রূঢ় বাস্তবতা হলো, সামাজিক মাধ্যম নিয়ে আমাদের প্রত্যাশা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে।

ভুয়া তথ্যের তীর্থক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম। ইন্টারনেটে স্বাধীনতা নিয়ে চলতি মাসের মাঝামাঝি ফ্রিডম হাউস বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ‘ফ্রিডম অন দ্য নেট ২০১৭’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইন্টারনেটে মিথ্যা তথ্যে গত এক বছরে বিশ্বের ১৮টি দেশের নির্বাচন প্রভাবিত হয়েছে।

২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রাশিয়া ‘হস্তক্ষেপ’ করেছে বলে জোর অভিযোগ রয়েছে। এই অভিযোগ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে, গত বছরের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে-পরে ২০১৫ সালের জুন থেকে ২০১৭ সালের আগস্ট পর্যন্ত রাশিয়া থেকে প্রায় ৮০ হাজার পোস্ট ছাড়া হয়। ফেসবুকে রাশিয়ার অপ-তথ্যমূলক পোস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ১২ কোটি ৬০ লাখ ব্যবহারকারী দেখে থাকতে পারেন। সবশেষ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রভাবিত করতে রুশ-সংশ্লিষ্ট টুইটার অ্যাকাউন্ট ও ইউটিউব চ্যানেল ব্যবহারের আলামত মিলছে। বিদায়ী ভাষণে বারাক ওবামা বলে গেছেন, ‘গণতন্ত্র হুমকির মুখে।’

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনীতি কদর্য আকার ধারণ করছে। কট্টরপন্থীদের উত্থান ঘটছে। প্রচারণা (প্রোপাগান্ডা), বিভেদ সৃষ্টিকারী ও মিথ্যা তথ্য প্রবল স্রোতের মতো প্রবাহিত হচ্ছে। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া—সর্বত্র একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আশঙ্কাজনক এই প্রবণতার পেছনে সামাজিক মাধ্যমেরও দায় আছে।

মতপ্রকাশের মুক্ত মাধ্যম হিসেবে সামাজিক মাধ্যম ইতিমধ্যে প্রশংসা কুড়ালেও এখন তার নেতিবাচক দিকগুলো গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। জনমত ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার করছে দুষ্টচক্র। কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করছে ভিন্নমত দমনে। তারা এই কাজে ‘সাইবার যোদ্ধা ‘পর্যন্ত নিয়োগ করছে। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞানী জেনিপ তুফেকসি উল্লেখ করেন, আরব বসন্তকে সহায়তা করেছিল সামাজিক মাধ্যম। আর এখন তা ভিন্নমতাবলম্বীদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

অ্যালায়েন্স ফর সিকিউরিং ডেমোক্রেসির ফেলো অ্যান্ড্রু উইশবার্ড বলেন, সব ধরনের দুষ্ট লোকজন তাদের উদ্দেশ্য হাসিলে ফেসবুক-টুইটারের অপব্যবহার করছে।

গবেষক টিম চেম্বারস তাঁর এক নিবন্ধে সামাজিক মাধ্যম কীভাবে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠছে, তার বিবরণ দিয়েছেন।

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক চলতি বছরের জুনে এক প্রতিবেদনে বলছেন, ফেসবুক-টুইটারের মতো সামাজিক মাধ্যম অনেক দেশে সামাজিক নিয়ন্ত্রণেরও হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এই গবেষকেরা ২৮টি দেশের সামাজিক মাধ্যম নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা তাঁদের গবেষণায় এই বলে উপসংহার টেনেছেন যে নিজের দেশের জনগণকে লক্ষ্যবস্তু করে প্রত্যেক কর্তৃত্ববাদী শাসকের সামাজিক মাধ্যমভিত্তিক প্রচারণা আছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সামাজিক মাধ্যমের মালিকানা কোম্পানিগুলোর জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতার ওপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। অপ-তথ্য ঠেকাতে তারা তাদের অ্যালগারিদমকে আরও উন্নত করতে পারে। এ বিষয়ে কোম্পানিগুলো প্রতিনিয়ত কাজ করছে বলে শোনা যায়। সামাজিক মাধ্যমের শক্তিকে কল্যাণের পথে চালিত করতে সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতা দরকার।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here