বন্ধ হচ্ছে না বোমা মেশিন

0
50

প্রকৃতিকন্যা জাফলংয়ের পরিবেশ-প্রতিবেশ সংকটাপন্ন। যন্ত্রদানব (বোমা মেশিন) দিয়ে পাথর উত্তোলন থামাতে পারছে না প্রশাসন। যদিও ২০১২ সালে উচ্চ আদালত সব ধরনের যন্ত্র দিয়ে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ করেছেন। কিন্তু দীর্ঘ ৭ বছরেও বোমা মেশিন দিয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়নি। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি এক গেজেটে জাফলংকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করে পরিবেশ অধিদফতর। গেজেট অনুযায়ী, জাফলংয়ের ১৪ দশমিক ৯৩ বর্গ কিলোমিটার এলাকায় সব ধরনের পাথর তোলা নিষিদ্ধ। তাতেও লাভ হয়নি। পরিবেশবিধ্বংসী বোমা মেশিন ব্যবহার থামানো যাচ্ছে না। এরই মধ্যে পরিবর্তন হয়েছে নদীর গতিপথ। গ্রাম বাঁচাতে স্বেচ্ছাশ্রমে যে বাঁধ দেয়া হয়েছিল তাও এখন পাথরখেকোদের পেটে। হুমকির মুখে পড়েছে কান্দু বস্তি আর নয়াবস্তিসহ ৯টি গ্রাম। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বোমা মেশিন থেকে পাথরখেকোরা প্রতিদিন কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তোলেন। এ চাঁদার ভাগ পান স্থানীয় সরকারদলীয় নেতা, পুলিশ ও জনপ্রতিনিধি। তাই মাঝেমধ্যে টাস্কফোর্সের অভিযান হলেও আগেই খবর চলে যায় পাথরখেকোদের কাছে। টাস্কফোর্স পৌঁছানোর আগেই সরিয়ে ফেলা হয় যন্ত্রদানব। অভিযান শেষে আবারও শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ।

ডাউকি নদী থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে অবস্থান ছিল কান্দু বস্তি ও নয়াবস্তি নামের দুটি গ্রামের। ২০০৭ সালের দিকে গ্রাম দুটিসহ ৯টি গ্রাম ডাউকি নদীর ভাঙন থেকে বাঁচাতে ব্যবসায়ী নেতা মিজান আজিজ চৌধুরীর নেতৃত্বে ৩০ হাজার গ্রামবাসী মিলে প্রতিরক্ষা বাঁধ তৈরি করেন। মঙ্গলবার জাফলং ঘুরে দেখা যায় সেই বাঁধ আর নেই। বোমা মেশিনে পাথর তোলার কারণে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে বাঁধটি। নদী তীর মিশে গেছে গ্রাম দুটির সঙ্গে। তবুও থেমে নেই পাথরখেকোরা। সারি সারি পড়ে আছে শতাধিক বোমা মেশিনের পাইপ। অভিযানের খবর পেয়ে সরিয়ে নিয়েছে বোমা মেশিন। স্থানীয় এক বৃদ্ধের সঙ্গে কথা হয়। তিনি চারপাশে তাকিয়ে দেখলেন কেউ আছেন কিনা। এরপর বললেন, অভিযান শেষ অইলেই আবারও নামায়। সারা রাত মেশিনের শব্দে ঘুমানো যায় না। পাথরখেকোদের ভয়ে গ্রামের কেউই মুখ খোলেন না। এ বৃদ্ধ জানান, একশ’ থেকে দেড়শ’ বোমা মেশিন চলে। প্রত্যেক বোমা মেশিন থেকে প্রতিদিন ২০-৩০ হাজার টাকা চাঁদা তোলা হয়। তিনি জানান, জাফলং ধ্বংস করেছেন জৈন্তাপুর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক লিয়াকত আলী। তার ইশারায় সব হয়। তার বাহিনীই মূলত নদী ধ্বংস করে সব শেষে এ বাঁধ ভেঙে পাথর তুলতে শুরু করেন। যদিও এখন বোমা মেশিন চালাতে পারেন না তিনি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান লেবু মিয়ার ভাতিজির স্বামী ইমরান হোসেন সুমন আর ছাতকের আলাউদ্দিনই এখন বোমা মেশিনের মূল হোতা। তারাই চাঁদা তুলে সব ম্যানেজ করে বলে জানান তিনি। স্থানীয় এ বৃদ্ধ আরও বলেন, ‘এহন হুনসি আওয়ামী লীগের কোনো বড় নেতা তাগরে শেল্টার দেয়।’ পুলিশ বাধা দেয় না?- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, পুলিশকে তো তারা প্রতিদিন টাকা দেয়। গোয়াইনঘাট থানার ওসি যদি চান এক ঘণ্টায় সব বন্ধ করা সম্ভব।

কথা হয় হোতাদের একজন ইমরান হোসেন সুমনের সঙ্গে। তিনি বোমা মেশিন চালানোর কথা স্বীকার করেন। বলেন, ‘আমি আর আলাউদ্দিন মিলে চাঁদা তুলি ঠিকই কিন্তু পুরো টাকা দেই অন্য একজনকে। আমরা শুধু দৈনিক একটা অংশ পাই।’ এরপর তিনি একপর্যায়ে স্বীকার করেন, পুরো টাকা লিয়াকত আলীকে দেন।

অন্যদিকে আলাউদ্দিন দাবি করেন, তিনি একজন পাথর ব্যবসায়ী। বোমা মেশিন তিনি চালান না। এখানে বোমা মেশিন চালায় লিয়াকত আলীর বাহিনী। সেই বাহিনীতে কে কে আছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, স্থানীয় আতাই মেম্বার, মাতাই মিয়া, নান্নুসহ আরও অনেকেই। এদের মধ্যে আতাই মেম্বারের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়। আতাই মেম্বার দাবি করেন, এখন তিনি বোমা মেশিনের সঙ্গে জড়িত নন। কিছুদিন আগে নদীতে বোমা মেশিন দিয়ে পাথর তোলায় জড়িত ছিলেন। এদিকে জাফলংয়ের ধ্বংসলীলা থামাতে কাজ শুরু করেছে সরকারি একটি গোয়েন্দা বাহিনী। ইতিমধ্যে লিয়াকত সম্পর্কে খোঁজখবর নিতে শুরু করেছে তারা। তবে যার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ সেই লিয়াকতকেই বুধবার দেখা গেছে জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে পর্যটন উন্নয়ন ও পুরাকীর্তি সংরক্ষণ নামের সংগঠনের ব্যানারে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান অনুষ্ঠানে। যাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ তাদের নিয়ে কেন স্মারকলিপি প্রদান- এমন প্রশ্নে সংগঠনটির সভাপতি ফয়েজ আহমেদ বাবর যুগান্তরকে জানান, লিয়াকত আলী জাফলং ধ্বংস করে জৈন্তা গোয়াইনঘাট এলাকায় চিহ্নিত, এটা ঠিক। এখন সে যদি সংশোধন হতে চায় তাকে সুযোগ দেয়া উচিত। এ মনোভাব থেকে তাকে মানা করেননি তারা।

এদিকে লিয়াকত আলী দাবি করেন, তিনি কখনও পরিবেশ ধ্বংস হয় এমন কিছু করেননি। বলেন, আমার কোনো বাহিনীও নেই। কেউ যদি বলে আমাকে টাকা দেয়, সেটা আমাকে ফাঁসাতেই বলছে। এদিকে প্রশাসন শুধু টাস্কফোর্সের অভিযান করেই দায়িত্ব শেষ করছে। জাফলং এলাকার প্রায় সব বাড়িতেই পাওয়া যায় বোমা মেশিন। এ যন্ত্রদানব বানাতে প্রভাবশালী পাথরখেকোরা এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছে বড় বড় ওয়ার্কশপ। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার নাজমানারা খানুম যুগান্তরকে বলেন, জাফলংয়ের পরিবেশ রক্ষায় সব ধরনের প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু শুধু জেলা প্রশাসনের পক্ষে সেটা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবার সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ বিষয়ে শিগগিরই বড় ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে বিভাগীয় প্রশাসন। বোমা মেশিন অবৈধ সুতরাং সেই যন্ত্র যার নিয়ন্ত্রণে অথবা যার বাড়িতেই পাওয়া যাবে, তার বিরুদ্ধেই পরিবেশ আইনে মামলা হবে। পাশাপাশি মূল হোতেদেরও তালিকা তৈরি করছে প্রশাসন। সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি কামরুল আহসান যুগান্তরকে জানান, পরিবেশ বিধ্বংসী কার্যকলাপে কোনো ছাড় দেয়া হবে না। পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে এর সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here