বরিশালের যোগেন মণ্ডলকে কি কারও মনে পড়ে?

0
69

অক্টোবরের শুরুতে ছিল যোগেন মণ্ডলের মৃত্যুবার্ষিকী। কিন্তু তাঁকে নিয়ে যখন লিখতে বসেছি, মাসের একেবারে শেষে। মাসজুড়ে অপেক্ষা করেছি, কেউ না কেউ, চিন্তা ও তৎপরতার কোনো না কোনো ক্যাম্প থেকে তাঁকে স্মরণ করা হবে। কিন্তু শেষমেশ মনে হলো, বাংলাদেশ বোধ হয় যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলকে ইতিহাসের আর্কাইভে ধামাচাপা দিয়েই স্বস্তি খুঁজতে চায়; যদিও আপাতদৃষ্টিতে সব সময়ই মনে হয়, ইতিহাসশাস্ত্রই মুখ্যত দেশটির রাজনীতি ও সমাজজীবনকে আছর করে আছে।

প্রায় ৪৯ বছর আগে মারা যাওয়া যোগেন মণ্ডল কি বাংলাদেশের আজ ও আগামীর জন্য জরুরি কোনো চরিত্র? আর জরুরিই যদি হন, তাহলে তাঁকে আমরা কীভাবে স্মরণ করব? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আমাদের খানিকটা পেছনে যেতে হবে বৈকি। পেছন মানে একাত্তর নয়, আরেকটু পেছনে—সাতচল্লিশে।

খ্যাতিমান ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় যোগেনকে নিয়ে লেখা তাঁর উপন্যাসের নাম দিয়েছেন ‘বরিশালের যোগেন মণ্ডল’। এই নামের ভেতর শ্লেষ আছে, নাকি প্রশংসার অর্ঘ্য আছে, সে নিয়ে সাহিত্য ক্রিটিকদের মাঝে অনেক বিতর্ক। কিন্তু এটা সত্যি, প্রান্তিক জনপদ বাকেরগঞ্জ তথা পূর্ববঙ্গ থেকেই নমশূদ্র যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল একদা পুরো অবিভক্ত ভারতবর্ষে নতুন এক ‘সর্বজনবাদী/বহুজনবাদী’ (Inclusive) রাজনীতির সূচনা ঘটিয়েছিলেন এবং কথিত মূলধারার শহুরে এলিট রাজনীতির তৎকালীন ছকটি পাল্টে দিয়েছিলেন।

বাকেরগঞ্জ থেকে সূচিত যোগেন মণ্ডলের রাজনীতি তাঁকে একাধিকবার প্রদেশের মন্ত্রিত্ব দিয়েছে; কেন্দ্রেও একাধিকবার মন্ত্রী ছিলেন তিনি। কিন্তু তাঁর রাজনীতির গুরুত্বটুকু অন্যত্র। একটু আগ বাড়িয়ে বললে, যোগেন মণ্ডলের কারণেই মুসলমানরা, বিশেষত পূর্ববঙ্গের কৃষিপ্রজা দরিদ্র মুসলমান সমাজ সাতচল্লিশের ভাগাভাগির-রাজনীতির-দর-কষাকষিতে প্রভাবশালী চরিত্র হয়ে উঠতে পেরেছিল; তাঁর কারণেই বাংলাদেশের আজকের মানচিত্রটি ‘অন্য রকম’ কিছু না হয়ে ঠিক ‘এ রকম’ এবং পরোক্ষ তাঁর কারণেই আজ ভারতে দলিত সমাজ একটা বড় রাজনৈতিক চরিত্র হয়ে উঠেছে এবং উঠছে।

এত সব ভূমিকা সত্ত্বেও যোগেন শেষতক জিততে পারেননি। তাঁর ‘নিপীড়িত শ্রেণির হিস্যা’ খোঁজার রাজনীতিও সাতচল্লিশ-পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যেই পরাজিত হয়েছিল। এটাকে আমরা বলতে পারি দক্ষিণ এশিয়ায় দলিত-মুসলমান বহুজনবাদী রাজনীতির প্রথম মোটাদাগের পরাজয়। যে রাজনীতির গোড়ার কথা ছিল ‘বহুজনের অংশগ্রহণমূলক’ সমাজ। অথচ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশসহ পুরো দক্ষিণ এশিয়া যোগেনের সেই বহুজনবাদী রাজনীতিই খুঁজছে আজও। এমনকি হালের রোহিঙ্গা সংকটও দক্ষিণ এশিয়ায় বহুজনবাদী রাজনীতির অনুপস্থিতিজনিত সংকটের কথাই জানান দিচ্ছে। একই শূন্যতার কথা বলছে ভারতের কাশ্মীর, পাকিস্তানের বেলুচ, শ্রীলঙ্কার তামিল, নেপালের মধেস, বাংলাদেশের চাকমা-সান্তালরা।

১৯১১ সালের লোকশুমারিতে দেখছি, বাকেরগঞ্জে হিন্দুসমাজের মধ্যে শতকরা ৪৫ ভাগই ছিল নমশূদ্র, তথা দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। আজকে প্রশাসনের ভাষায় যারা ‘তফসিলি জাতি’। এদেরই কণ্ঠস্বর ছিলেন যোগেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে কংগ্রেসের চৌহদ্দিতেই ছিলেন। সুভাষ বসুকে ঘিরে নতুন রাজনীতির স্বপ্ন দেখতেন তিনি। একই সঙ্গে নিজের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক-দার্শনিক অবস্থাও তাঁর তৈরি হচ্ছিল তখন। যোগেনের পৃথক সেই অবস্থানের মূল দিক হলো নিপীড়িত বর্গগুলোর ঐক্যের তাগিদ। সুভাষের বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে কংগ্রেসের প্রতি চূড়ান্ত মোহভঙ্গ ঘটেছিল তাঁর। পূর্ববঙ্গের অভিজ্ঞতার পাটাতনে দাঁড়িয়ে এ সময় তিনি ভাবতে শুরু করেন, ভারতবর্ষে দলিত ও মুসলমানরা হলো প্রধান দুই নিপীড়িত বর্গ। এদের ঐক্য প্রয়োজন। উপনিবেশমুক্ত নতুন দক্ষিণ এশিয়ায় বর্ণব্যবস্থার বাইরে থাকা অচ্যুত ‘তফসিলি হিন্দু’ এবং ‘অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণি’র সঙ্গে ‘ম্লেচ্ছ’ মুসলমানদের ঐক্যের মধ্য দিয়ে ‘বহুজন’বাদী রাজনীতি গড়ে তোলা না গেলে ব্রিটিশ-পরবর্তী সম্ভাব্য যেকোনো ‘সমাধান’-এ ঔপনিবেশিক আলোকপ্রাপ্তরাই নেতৃত্বে ও নীতিনির্ধারণে থেকে যাবে। এই রাজনৈতিক প্রশ্নের মীমাংসা করতে ব্যর্থ হয়েই বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলন সাড়া ফেলতে পারেনি দক্ষিণ বঙ্গে। আর এইরূপ রাজনৈতিক-দার্শনিক অবস্থান থেকেই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসকে চমকে দিয়ে যোগেন মণ্ডল ১৯৩৭-এর বঙ্গীয় আইনসভার নির্বাচনে বাকেরগঞ্জ-ভোলা থেকে অশ্বিনী কুমারের ভাতিজা সরল কুমার দত্তকে হারিয়ে দেন এবং পরে আরও এক ধাপ এগিয়ে মুসলিম লীগকে সহযোগিতা করার নীতি নেন। ১৯৪৬-এ আবারও তিনি বঙ্গীয় আইনসভার সদস্য হন। ইতিমধ্যে তিনি বাংলা প্রদেশে নাজিমউদ্দিন মন্ত্রিসভায় সমবায়মন্ত্রী হন এবং পরে সোহরাওয়ার্দীর মন্ত্রিসভায়ও বিচারমন্ত্রী ছিলেন। এ সময়গুলোয় যোগেন মণ্ডল জিন্নাহর প্রধান এক রাজনৈতিক সহযোগীতে পরিণত হয়েছিলেন। যোগেনকে পাশে পেয়ে জিন্নাহ প্রথমবারের মতো মুসলিম লীগের বৈচিত্র্যপূর্ণ রাজনৈতিক চরিত্রের দাবি উত্থাপনের নৈতিক ভিত্তি পান। আবার যোগেনও জাতীয় পরিসরে এটা তুলে ধরতে সক্ষম হন যে বাংলায় নমশূদ্ররা, দলিতরা পৃথক এক রাজনৈতিক সত্তা এবং এদের প্রতি সামাজিক ন্যায়বিচার ছাড়া যেকোনো ‘স্বাধীনতা’ অর্থহীন। সেদিন বর্ণহিন্দু কংগ্রেস নেতৃত্বের পক্ষে ‘তফসিলি হিন্দু’ এবং ‘অন্যান্য পশ্চাৎপদ শ্রেণি’র এই দাবির মোকাবিলা করা অতি দুরূহ ছিল। রাজনৈতিক প্রচারযুদ্ধে যোগেনের সরাসরি ভূমিকার কারণেই মুসলিম-দলিত ভোটে সিলেটের মতো অঞ্চল আসামে যুক্ত না হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্ত হয়েছিল সেদিন।

বলা বাহুল্য, যোগেন মণ্ডলের মুসলিম লীগকে সমর্থন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতেই কেবল ভূমিকম্পতুল্য বিষয় ছিল না। এটা হিন্দু ভারতের কেন্দ্রভূমিতেও দলিতদের রাজনৈতিক শূন্যাবস্থা থেকে রক্ষা করেছিল। আম্বেদকর যখন স্বাধীনতার উষালগ্নে তাঁর পুরোনো নির্বাচনী এলাকা থেকে নির্বাচিত হতে ব্যর্থ হলেন, তখন যোগেন মণ্ডলের ব্যাপকভিত্তিক রাজনৈতিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে ১৯৪৬-এ তাঁকে বেঙ্গল থেকে নির্বাচিত করার ব্যবস্থা হয় এবং ওই ভূমিকার কারণেই ভারতীয় গণপরিষদে আম্বেদকরের উপস্থিতি সুনিশ্চিত হয় এবং ভারতীয় সংবিধান প্রণয়নে আম্বেদকরের বহুল প্রচারিত ভূমিকাসমূহ রাখা সক্ষম হয়। যোগেন মণ্ডল যদি আম্বেদকরকে ভারতীয় সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় পুনঃস্থাপিত না করতেন, তাহলে আজকের ভারতে দলিতদের জন্য যেসব সাংবিধানিক ও আইনগত সুরক্ষা তৈরি হয়েছে, তার অনেক কিছুই অর্জন সুদূরপরাহত হয়ে যেত।

পাকিস্তান সৃষ্টিতে অবদানের স্বীকৃতি মেলে সংবিধান যোগেন্দ্রনাথকে নবসৃষ্ট দেশের সংবিধান সভার সাময়িক প্রধান করার মাধ্যমে। পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রীও হন যোগেন মণ্ডল।

সাতচল্লিশপূর্ব সময়ে যোগেন মণ্ডল বাংলায় একদিকে যখন আম্বেদকরের শিডিউল ফেডারেশনের শাখা করছেন, তেমনি একই সময়ে দলিত-নমশূদ্রদের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনৈতিক সমাধান খোঁজার জন্য প্ররোচিত করছিলেন মুসলমানদের সঙ্গে মিলতে। আরও সরাসরি বললে, তাঁর বক্তব্য ছিল ‘ছোটলোকদের এক হওয়া প্রয়োজন।’ এই অবস্থানের কারণেই তিনি দাঙ্গার দিনগুলোয় বাংলা ঘুরে ঘুরে নিম্নবর্ণের মানুষদের দাঙ্গা থেকে দূরে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন এই বলে যে দাঙ্গা হলো পুরোদস্তুর সম্ভাব্য শাসক এলিটদের শক্তি পরীক্ষার দুষ্ট ফল; এতে অংশ নিয়ে নিম্নবর্গের কোনো লাভ নেই। যোগেন মণ্ডলের এই অবস্থানের মধ্য দিয়েই সাতচল্লিশে বাংলায় দলিত ও মুসলমানদের জোট রাজনীতির প্রধান বর্গ হয়ে ওঠে এবং তারই ফল ‘পূর্ব বাংলা’র পাকিস্তানের অংশ হওয়া। একই সঙ্গে যোগেনের এই ভূমিকা সেদিন নোয়াখালী ব্যতীত প্রায় পুরো পূর্ববঙ্গে দলিত-নমশূদ্রদের দাঙ্গার উত্তাপ থেকে অনেকাংশে রক্ষা করেছিল।

সাতচল্লিশের ওই সময়ে পাকিস্তান সৃষ্টিতে যোগেনের অবদান সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে যিনি উপলব্ধি করতেন, তিনি জিন্নাহ। তাই তিনি যোগেন্দ্রনাথকে নবসৃষ্ট দেশের সংবিধান সভার সাময়িক প্রধান করেছিলেন। পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রীও হন যোগেন মণ্ডল। সাতচল্লিশ-পরবর্তী সময়ে বাকেরগঞ্জের নমশূদ্র যোগেন মণ্ডল যে করাচিতে এত বড় বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অবস্থান গ্রহণ করছেন, তা শুধুই এ রকম একটি বিবেচনা থেকে যে পাকিস্তান বর্ণহিন্দুদের ভারতের মতো হবে না, এখানে সংখ্যালঘু তফসিলি জাতি ও দলিতদের অচ্যুত ‘অপর’ বিবেচনা করা হবে না।

জিন্নাহর অঙ্গীকারে যোগেনের প্রবল আস্থা ছিল। আর যোগেনের আস্থার কারণেই পূর্ববঙ্গের লাখ লাখ নমশূদ্র ও দলিত ভারতে পাড়ি জমায়নি। পূর্ব পাকিস্তানে থেকে গিয়েছিল তারা। কিন্তু লিয়াকত আলী খান মন্ত্রিসভা ক্রমে জিন্নাহর অঙ্গীকার থেকে দূরে সরে যেতে থাকলে এবং পূর্ব পাকিস্তানে দলিত তফসিলিদের ওপর নিপীড়ন নেমে এলে হতাশ ও বিক্ষুব্ধ যোগেন কেবল যে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করেন তা-ই নয়, পাকিস্তান ভূমিও ত্যাগ করেন। সময়টা তখন ১৯৫০-এর অক্টোবর।

এবার তিনি ফিরে আসেন পশ্চিমবঙ্গে। পূর্ববঙ্গের নমশূদ্র দলিতদের বিশাল অংশ তখন পশ্চিমবঙ্গমুখী উদ্বাস্তু। যোগেন মণ্ডল এদের মাঝে গিয়ে আবার নতুন করে তাঁর বহুজনবাদী রাজনীতির চর্চা করতে মনস্থ করেছিলেন। উদ্বাস্তুদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারের দাবিতে সে সময় রিফিউজি কাউন্সিল গঠন করে সত্যাগ্রহে নামলে যোগেন মণ্ডলের রাজনৈতিক উত্থানে শঙ্কিত কংগ্রেস ও প্রথাগত বামপন্থীরা সেদিন প্রায় মিলিতভাবেই তাঁকে কোণঠাসা করেছিল। এ রকম অবস্থাতেই ৬৪ বছর বয়সে ১৯৬৮-এ বনগাঁয়ে মারা যান তিনি। আর এভাবেই দক্ষিণ এশিয়ায় ধর্মীয় পরিচয়-নির্বিশেষে নিপীড়িত বর্গের মানুষের ঐক্যের গুরুত্বপূর্ণ এক স্বপ্নদ্রষ্টার বিদায় ঘটে। ১৯০৪-এ আগৈলঝাড়া থেকে যে সংগ্রামী জীবনের শুরু, সারা জীবন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সর্বজনবাদী (Inclusive) রাজনীতির ডাক দিয়ে হঠাৎই তিনি বিদায় নিয়েছিলেন সাংগঠনিকভাবে প্রায় নিঃসঙ্গ অবস্থায়।

যোগেন মণ্ডলের মৃত্যু ভারতে যেমন বর্ণ হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবিদদের একাংশকে স্বস্তি দিয়েছিল, তেমনি করাচি থেকে তাঁর পশ্চিমবঙ্গে চলে আসাও পাকিস্তানে নিম্নবর্গের মানুষের সঙ্গে মুসলিম লীগের দক্ষিণপন্থী এলিট নেতৃত্বের বিচ্ছিন্নতা নিশ্চিত করেছিল। তারই দ্রুতলয়ের ফসল বাংলাদেশ।

হয়তো প্রায় একই কারণে আজও বাংলাদেশে, পশ্চিমবঙ্গে, পাকিস্তানে যোগেন মণ্ডল বিস্মৃত। পশ্চিমবঙ্গের বর্ণহিন্দুদের বিবেচনায়, যোগেনের কারণেই পূর্ব বাংলা পূর্ব পাকিস্তান হয়েছিল। যে জন্য তারা যোগেনকে বলতেন ‘যোগেন আলী মোল্লা’। পাকিস্তানের জিন্নাহ-পরবর্তী মুসলিম লীগ মনে করে, ১৯৫০-এ যোগেনের ভারতে আশ্রয় গ্রহণ বিশ্বাসঘাতকতা। আবার পশ্চিমবঙ্গে তাঁর ‘শেষযুদ্ধ’-এর ব্যর্থতার ফল হয়েছিল এ রকম, প্রায় চল্লিশ বছর সেখানে ‘বামপন্থী’ সরকার থাকার পরও দলিত ও মুসলমানদের লক্ষণীয় কোনো পরিবর্তনই ঘটেনি। যে কথা কেবল এখন পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা স্বীকার করছেন।

কিন্তু বাংলাদেশ যোগেন মণ্ডলকে কেন ভুলে গেছে? বাংলাদেশ ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবল সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নিপীড়িত জাতিসত্তার প্রথম সফল রাষ্ট্র। সাতচল্লিশে এখানে ‘ম্লেচ্ছ’ আর ‘তফসিলি’রা পূর্ব পাকিস্তানকে নিশ্চিত করেছিল আর একাত্তরে একই জোট পাঞ্জাবি কর্তৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে এ ভূখণ্ডে পাকিস্তানের সমাধি রচনা করেছিল। বস্তুত, জাতিঘৃণা প্রত্যাখ্যানে যোগেন মণ্ডলের সেই শিক্ষা যে বাংলাদেশের ধমনিতে এখনো বহমান, তার একটা বড় নজির রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় সমাজের সচেতন ঐকমত্য। সাতচল্লিশে এবং একাত্তরে দু-দুটি সফল সংগ্রাম শেষে যোগেনের স্বপ্নের ইনক্লুসিভ রাজনীতির প্রতি এ দেশের সাধারণ মানুষের সমর্থন প্রশ্নাতীত। কিন্তু শাসক এলিটদের কারণেই সাতচল্লিশ-পরবর্তী ভারত-পাকিস্তান এবং একাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের ‘প্রবল’ জাতিসত্তাগুলো আজও ‘অপর’কে ধারণ করে নতুন সমাজ নির্মাণ করতে সমর্থ হয়নি। সে জন্যই আজও যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডলের ‘বহুজনবাদী’ রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা শেষ হয়নি। এই রাজনৈতিক-দার্শনিক বোঝাপড়া ছাড়া বাংলাদেশ ও দ‌ক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এগোতে পারবে বলে মনে হয় না।

আলতাফ পারভেজ: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গবেষক

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here