বাংলাদেশের ব্লগাররা হামলা ও হত্যার শিকার হচ্ছেন

0
84

বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও এখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ বাড়ছে। আইনী সুরক্ষা না থাকায় বাংলাদেশ থেকে হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে। এছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার ফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশে নয়দিন সফর শেষে জাতিসংঘের ধর্ম অথবা বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক বিশেষ দূত হাইনার বিলেনফেল্ড বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন।

জাতিসংঘের বিশেষ দূত হাইনার বিলেনফেল্ড নয় দিন বাংলাদেশ সফর করেন। বাংলাদেশের ধর্ম অথবা বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ে পর্যবেক্ষণের জন্য ঢাকায় আসেন তিনি। সফর শেষে ঢাকার জাতিসংঘ অফিস থেকে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি রবার্ট ওয়াটকিনস। সংবাদ সম্মেলনে হাইনার বলেন, বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও এখানে ধর্মীয় উগ্রবাদ বাড়ছে। এছাড়া বাংলাদেশের সংবিধান ধর্মনিরপেক্ষ হলেও সকল আইন ধর্মনিরপেক্ষ নয়। তবে সংবিধানের ৩৯ ও ৪১ ধারা অনুযায়ী সকলেরই এখানে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা রয়েছে।

বাংলাদেশের মানুষ শান্তিকামী হিসেবে উল্লেখ করে জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের নিয়োগকৃত এই বিশেষ দূত বলেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা আমি পরিদর্শন করেছি। এখানের সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। সাধারণ মানুষ বিভিন্ন ধর্ম পালন করলেও তারা শান্তিকামী। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান সম্প্রদায় ছাড়াও এখানে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ধর্মীয় জনগোষ্ঠী রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ তিনি বাহাই ধর্মের কথা উল্লেখ করেন। এখানে তিন লাখ বাহাই ধর্মের অনুসারী রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এছাড়া ইসলাম ধর্মের মধ্যেও ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী রয়েছে। ইসলাম ধর্মের মধ্যেই আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের লোক রয়েছেন। এসব ক্ষুদ্র ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সকল ধর্ম পালনের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধীরে ধীরে কমে আসছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কয়েক দশক আগে থেকেই বাংলাদেশে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের পর থেকেই এদেশ থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠী কমছে। সে সময় হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার ছিল ২৩ শতাংশ। এখন বর্তমানে এখানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর হার ৭ শতাংশ। বিভিন্ন সময়ে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে আইনী সুরক্ষা দিতে না পারার কারণে এখানে তাদের সংখ্যা কমছে। এছাড়াও তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও জমির অধিকার সুরক্ষা করতে না পারায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বাংলাদেশে ব্লগার হত্যার বিষয়টি তুলে ধরে জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত বলেন, কয়েক মাসের মধ্যে এখানে ৫ জন অনলাইন এ্যাক্টিভিটিস নিহত হয়েছেন। এরা সামাজিক গণমাধ্যমে বিভিন্ন সমালোচনামূলক লেখা লিখতেন বলেই তাদের খুন করা হয়েছে জানা গেছে। আরও বলা হচ্ছে, এসব অনলাইন এ্যাক্টিভিটিসরা নাস্তিক ও ইসলামকে ধর্ম নিয়ে তারা উপহাস করেছেন। তাদের স্রেফ নাস্তিকতার কারণে হত্যা করা হয়েছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, নাস্তিকতাও ধর্মীয় অথবা বিশ্বাসের স্বাধীনতা মধ্যেই পড়ে। এটাও মানবাধিকার। মুক্তমনাদের বিষয়ে সরকার থেকে বলা হয়েছে, সীমা লঙ্ঘন না করতে। তবে অনলাইন এ্যাক্টিভিটিসরা বিভিন্নভাবে আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। সেকারণে কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করার চেষ্টা করছেন। তারা নিরাপত্তাহীনতা বোধ করছেন। তাদের নিরাপত্তা দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার সমালোচনা করে জাতিসংঘের এই বিশেষ দূত বলেন, ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ আমলে ক্রিমিনাল কোডের ২৯৫ এ ধারা অনুযায়ী ধর্ম নিন্দার বিষয়ে শাস্তির বিধান করা হয়েছিল। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের (আইসিটি) ৫৭ ধারার সঙ্গে ওই আইনের সামঞ্জস্য রয়েছে। ৫৭ ধারার মাধ্যমে সুশীল সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে তিনি জানান।

বাংলাদেশে শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে জটিলতা রয়েছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারী বিদ্যালয়, বেসরকারী বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় বিভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ মাদ্রাসায় পড়ে। আবার এই মাদ্রাসার মধ্যে আলিয়া ও কওমী মাদ্রাসার দুটি ধারা রয়েছে। তবে কওমী মাদ্রাসায় নিজস্ব পাঠ্যসূচী অনুযায়ী পড়াশোনা করানো হয়। এখানে সরকারের কোন বাধ্যবাধকতা নেই। অনেকেরই পর্যবেক্ষণ রয়েছে যে, কওমী মাদ্রাসা থেকেই ধর্মীয় উগ্রবাদ তৈরি হচ্ছে। আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় বৌদ্ধ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের পৃথক বিদ্যালয় রয়েছে।

কয়েক বছর আগে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর বিভিন্ন হামলার ঘটনা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০১২ সালে রামুতে ২০টি বৌদ্ধ মন্দির ভাঙচুর হয়েছে। সেময় বৌদ্ধদের কয়েকটি বাড়িও পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ সরকার থেকে বৌদ্ধ মন্দির ও বসতবাড়ি পুনরায় নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ বিষয়ে পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করেছে বলেই মনে হয়।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here