বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চীনের আগ্রহ

0
81

রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সংলাপে সহযোগিতা করতে চীনের আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সে দেশের সফররত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। শনিবার সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি এই সহায়তার প্রস্তাব দেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম রাতে যুগান্তরকে এ তথ্য জানান। এদিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠকে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের দ্বিপক্ষীয় সমাধান চায় চীন। এক্ষেত্রে চীন সহায়তা দেবে। এছাড়া চীনা দূতাবাসে ওয়াং সাংবাদিকদের বলেন, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিত হবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়তা করা।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে দেশটির ওপর চাপ বৃদ্ধির জন্য চীনসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি পুনরায় আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এই সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য মিয়ানমারকে তার দেশের নাগরিকদের নিরাপদে, নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নিতে হবে। তিনি বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের অধিবাসী এবং তাদের ফিরিয়ে নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিশেষ করে নারী ও শিশুদের দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ তাদের মানবিক বিবেচনায় আশ্রয় দিয়েছে। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জিরো টলারেন্স নীতি পুনর্ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোতে বিচ্ছিন্নতাবাদী তৎপরতা চালানোর জন্য কাউকে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে দেয়া হবে না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠককালে চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। অথচ এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা। এটি বাংলাদেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর (বিসিআইএম-ইসি) সম্পর্কে ওয়াং বলেন, রোহিঙ্গা সমস্যার কারণে চার জাতির উদ্যোগের গতি মন্থর হোক তা চীন চায় না। ২০১০ ও ২০১৪ সালে শেখ হাসিনার চীন সফর এবং চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের কথা স্মরণ করেন ওয়াং। তিনি বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরের সময় দু’দেশের সম্মত হওয়া স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার কো-অপারেশনের (কৌশলগত অংশীদার সহযোগিতা) অগ্রগতি দেখতে তিনি বাংলাদেশ সফর করছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে তার দেশের প্রেসিডেন্টের শুভেচ্ছা পৌঁছে দেন। বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে বাংলাদেশকে দেয়া চীনের রেয়াতি ঋণ ৫০০ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে উল্লেখ করে ওয়াং বলেন, ‘চীন দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশকে আরও বেশি সহযোগিতা করতে চায়।

এ সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, প্রধানমন্ত্রীর আন্তর্জাতিকবিষয়ক উপদেষ্টা গওহর রিজভী, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ফজলুল করিম ও বাংলাদেশে চীনের রাষ্ট্রদূত মা মিংকিয়াং উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের নানা তথ্য জানান।

এর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং। রোহিঙ্গা সংকটকালে বাংলাদেশ মানবিক দিক বিবেচনায় যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তারও প্রশংসা করেন ওয়াং। মিয়ানমার সফরের আগে শনিবার বাংলাদেশে আসেন তিনি। বৈঠকের পর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে চীন বাংলাদেশের পাশে আছে- এমন বার্তা দেয়ার জন্যই ওয়াংয়ের এ সফর। বৈঠকে চীনের বিভিন্ন বিনিয়োগ প্রকল্পসহ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সফরকালে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশ যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করছে, সেটাকেই তিনি সঠিক পথ বলে মনে করেন। মিয়ানমার সফরকালে দেশের স্টেট কাউন্সেলর ও সেনাপ্রধানকে সংকট সমাধানের অনুরোধ জানাবেন ওয়াং। বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করার অনুরোধ জানাবেন তিনি। এ সময় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম ও পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক উপস্থিত ছিলেন।

সন্ধ্যায় চীনা দূতাবাসে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং সাংবাদিকদের বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত নয় এ পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলা। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের উচিত হবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানে সহায়তা করা। এই সংকটের শান্তিপূর্ণ, দ্বিপক্ষীয় সমাধানকে চীন সমর্থন করে। চীন চায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমার আলাপ করে যেন সংকটের সমাধান করে। তিনি আরও বলেন, এই জটিল পরিস্থিতির ব্যাপক ও বিস্তৃত সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, রাখাইন অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়নও দরকার। সেখানকার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করতে চীন প্রস্তুত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক চাপ মিয়ানমারকে এ সংকট নিরসনে মনোযোগী করেছে বলে মনে করে চীন। তবে দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক চাপের চেয়ে দ্বিপক্ষীয় প্রচেষ্টাকে অধিক কার্যকর বলে ওয়াংয়ের অভিমত। তিনি মনে করেন, আন্তর্জাতিক চাপের ভালো ও মন্দ দুই দিকই আছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক চাপ দিতে থাকলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
মার্কিন সিনেটের একটি প্রতিনিধি দল শনিবার কক্সবাজারের বালুখালী রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করেছে। আজ জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিগমার গাব্রিয়েল, নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্গট ওয়ালস্ট্রর্ম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিন্ন নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি ফেডেরিকা মগিরিনি এবং জাপানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারো কোনা কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে যাচ্ছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী তাদের সঙ্গে যাবেন। কক্সবাজার থেকে ফিরে পৃথকভাবে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। এরপর জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ ফ্লাইটে তারা মিয়ানমার যাবেন। মিয়ানমারে তারা এশিয়া ও ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে (আসেম) যোগ দেবেন। সেখানে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করা হবে। আসেম বৈঠকের পর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলী ২২ ও ২৩ নভেম্বর দ্বিপক্ষীয় সফরের অংশ হিসেবে মিয়ানমার থেকে যাবেন। সেখানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রক্রিয়া নিয়ে চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এ চুক্তি চূড়ান্ত করতে দু’পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here