দিন দিন সুন্দরবনে বাঘ কমছে

0
117

সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমছে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তি পর্যায়ের জরিপ বলছে, গত ৪২ বছরে বিশ্বের সর্ববৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনে বাঘের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

সর্বশেষ চলতি মাসে সুন্দরবনের বাঘের মল ও লোমের নমুনার জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয় একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হচ্ছে, সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২১। এর আগে স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে বেসরকারি পর্যায়ে জার্মানির বাঘ বিশেষজ্ঞ হেন রিডসের করা প্রথম জরিপে বাঘের সংখ্যা বলা হয়েছিল ৩৫০।

আর ২০১৫ সালে সরকারের বন বিভাগ প্রকাশিত জরিপে দেখা গেছে, বাঘের সংখ্যা ১০৬। একই সংস্থা ২০০৪ সালে বলেছিল, বাঘের সংখ্যা ৪৪০।

সুন্দরবন নিয়ে গবেষণাকারী দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলো সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ার জন্য এর চারপাশে শিল্পকারখানা স্থাপন, বনের ভেতর দিয়ে নৌযান চলাচল ও চোরা শিকারিদের কারণে বাঘের আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াকে দায়ী করেছে। পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাঘ পাচারকারী আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের একটি সংঘবদ্ধ দল বাঘ হত্যা করে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিদেশে পাচার করছে। ওই সংঘবদ্ধ দলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতার নামও এসেছে। দেশের ভেতরেও বাঘের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বাজার তৈরি হয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে সুন্দরবন থেকে বাঘ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে।

বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত সাত বছরে ভারত, নেপাল ও রাশিয়ায় বাঘের সংখ্যা বাড়লেও বাংলাদেশে তা কমার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশেই সুন্দরবনের সীমানা রয়েছে। ২০১৫ সালে যখন বাঘের সংখ্যা ১০৬ বলা হয়েছিল, তখন আমি ঠাট্টা করে বলেছিলাম, বাঘ সব ভারতের সুন্দরবনে বেড়াতে গেছে। এখন আমি বলতে চাই, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগের কারণে ভারতীয় সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়া বাঘগুলো আবার বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করেছে।’ এখন থেকে নিয়মিতভাবে বাঘের সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ভারতীয় সুন্দরবনে বেড়াতে যাওয়া বাঘগুলো আবার বাংলাদেশে ফিরতে শুরু করেছে: বনমন্ত্রী

অবশ্য কমতে থাকা বাঘের সংখ্যা যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষণার ভিত্তিতে বেড়েছে বলা যাবে না বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান। ২০০৬ সালে তিনি সুন্দরবনে প্রথমবারের মতো ক্যামেরায় ছবি তোলার পদ্ধতি ব্যবহার করে বাঘের সংখ্যা বলেছিলেন ২০০।

সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় বাঘের সংখ্যা ১২১

অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান প্রথম আলোকে বলেন, বন বিভাগ ও কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপের তুলনামূলক বিচারে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে বলা যাবে না; বরং এটা থেকে বলা যেতে পারে যে সুন্দরবনে ১০০ থেকে ১২০টি বাঘ আছে। সুন্দরবনের আয়তন অনুযায়ী পর্যাপ্ত পরিমাণে হরিণ ও শূকরের মতো বাঘের শিকার প্রাণী নিশ্চিত করা হলে এই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ করা সম্ভব। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবন থেকে বছরে কমপক্ষে তিনটি বাঘ হত্যা করে পাচার করা হয়। ফলে অল্প সংখ্যক এই কয়েকটি বেঁচে থাকা বাঘকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করতে হলে বাঘ রক্ষায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাঘের সংখ্যা ও গণনাপদ্ধতি

সুন্দরবনের বাঘের জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতে যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সমীক্ষায় নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক আবদুল আজিজ। গবেষণার ফলাফল চলতি মাসে বন্য প্রাণীবিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন-এ প্রকাশিত হয়েছে। কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিম জে গ্রুমব্রিজ, ওয়াইল্ড টিম ইউকের গবেষক অ্যাডাম বার্লো ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম ওই গবেষণার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তাঁরা গবেষণা প্রতিবেদনটির সহলেখক।

২০১৫ সালে আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ৫৬ জন গবেষক সুন্দরবনের ১ হাজার ৯৯৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জরিপের কাজ শুরু করেন। তাঁরা বাঘের মল ও লোমের ৪৪০টি নমুনা সংগ্রহ করেন। ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নমুনাগুলো বেঙ্গল টাইগারের কি না, তা নিশ্চিত করার জন্য নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামের ইউরোফিনস জিনোমিকস সেন্টারে পাঠানো হয়। এর মধ্যে ২৩৩টি নমুনা বেঙ্গল টাইগারের বলে নিশ্চিত করা হয়। এরপর এসব নমুনা কয়টি বাঘের, তা নিশ্চিত করতে সব ডিএনএ তথ্য পাঠানো হয় যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের (এনসিবিআই) কাছে। তারা ডিএনএ নমুনা বিশ্লেষণ করে জানায়, এগুলো সুন্দরবনের বাঘের।

এরপর ইংল্যান্ডের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিবিএস জিনোমিকস বিভাগের পরীক্ষাগারে বাঘের মল ও লোমের ওই নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়। সেখান থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষক দল নিশ্চিত হয় সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ১২১।

জরিপের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে আবদুল আজিজ প্রথম আলোকে বলেন, এর আগে পায়ের ছাপ ও ক্যামেরায় ছবি তুলে বাঘের সংখ্যা নির্ধারণ করার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। আরও উন্নত গণনাপদ্ধতি হিসেবে তাঁরা মল ও লোমের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে বাঘের সংখ্যা গণনা করেছেন। এই পদ্ধতিতে মালয়েশিয়া ও নেপালে বাঘ গণনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আবদুল আজিজের নেতৃত্বে জরিপটি সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন্য প্রাণী অভয়াশ্রম এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জ ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় করা হয়। তাঁরা সুন্দরবনের ভূমি অংশে প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ২ দশমিক ৮৫টি বাঘ পেয়েছেন। আর ২০১৫ সালে প্রকাশিত বন বিভাগের জরিপটি করা হয়েছিল সুন্দরবনের পূর্ব বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য এলাকা, সাতক্ষীরা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায়। সেখানে তাঁরা প্রতি ১০০ বর্গকিলোমিটারে ২ দশমিক ১৭টি বাঘ পান। বিভাগের ওই জরিপে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল ভারতের বন্য প্রাণী গবেষণা ইনস্টিটিউট।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে জানতে চাইলে ভারতের বন্য প্রাণী ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাঘশুমারির প্রধান রাজভেন্দ্রদেব ভি ঝালা প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঘ জরিপে ডিএনএ পদ্ধতি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক পদ্ধতি। আবদুল আজিজের সুন্দরবনের ওপর করা ওই জরিপ সম্পর্কে আমি অবগত আছি। তাঁর গবেষণার ফলাফল থেকে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা সম্পর্কে আমরা একটি পরিষ্কার ধারণা পেতে পারি।’

 

বিশ্বে বাড়ছে, বাংলাদেশে কমছে

২০১০ সালে রাশিয়ায় বিশ্ব বাঘ সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল, ২০২২ সালের মধ্যে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করা হবে। এই লক্ষ্যে গঠিত হয় গ্লোবাল টাইগার ইনিশিয়েটিভ (জিটিআই)। সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল সুন্দরবনে ৪৪০টি বাঘ রয়েছে। বাংলাদেশও এই সংখ্যা দ্বিগুণ করবে। এর অংশ হিসেবে বিশ্বের ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশ প্রতিবছর বাঘের সংখ্যা কতটা বাড়াতে পারল তা জানাবে। কিন্তু গত সাত বছরে বাংলাদেশ শুধু ২০১৫ সালে একটি জরিপ প্রকাশ করেছে।

রাশিয়া বাঘ সম্মেলনের পর থেকে বন বিভাগ সুন্দরবন ও বন্য প্রাণী রক্ষায় অন্তত চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। বিশ্বব্যাংক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিদেশবিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা ইউএসএআইডি ও জার্মান সরকারের বিদেশবিষয়ক উন্নয়ন সংস্থা জিআইজেডের অর্থায়নে পরিচালিত ওই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে শুধু সুন্দরবন ও বাঘ রক্ষায় গত ছয় বছরে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা।

কিন্তু এসব উদ্যোগের পর সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে না কমেছে, সেই হিসাব এখন পর্যন্ত বন বিভাগ থেকে দেওয়া হয়নি। বিশ্ব বন্য প্রাণী তহবিলের (ডব্লিউডব্লিউএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা প্রথমবারের মতো বেড়েছে। ২০১১ সালে বিশ্বে বাঘের সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০০ আর ২০১৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৮৯০। বাঘের সংখ্যা বেড়েছে এমন দেশের মধ্যে রয়েছে ভারত, নেপাল ও রাশিয়া।

২০০৭ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বন্য প্রাণীবিষয়ক সংস্থা ওয়াইল্ড টিম সুন্দরবনের বাঘের বিচরণের ধরন নিয়ে একটি ধারাবাহিক জরিপ করেছে। সংস্থাটির বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী আনোয়ারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ওই সময়ের মধ্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় বাঘের বিচরণ কমতে দেখা গেছে। তিনি বলেন, ১৯৭৫ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনের বাঘের ওপর যত জরিপ হয়েছে, তাতে বাঘের সংখ্যা ৪৫০ থেকে ২০০ পাওয়া গেছে। আর ২০১৫ সালে বন বিভাগের জরিপ ও সর্বশেষ যুক্তরাজ্যের কেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের জরিপে দেখা যাচ্ছে, বাঘের সংখ্যা ১০৫ থেকে ১২০।

বাঘ ও সুন্দরবন রক্ষায় সরকারের কার্যক্রম ও এত প্রকল্প নেওয়ার পরও বাঘের সংখ্যা কেন কমছে, তা নিয়ে দেশের বাঘ ও সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন।

২০০৪ সালে বন বিভাগ সুন্দরবনে যে বাঘ জরিপ করেছিল, তাতে কারিগরি সহায়তা দিয়েছিল প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সংস্থাগুলোর আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএন। ওই সময় জোটের এ-দেশীয় পরিচালক ছিলেন আইনুন নিশাত। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাঘকে আমরা জাতীয় প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে থাকি। সুন্দরবন কেমন আছে তা বোঝা যায় বাঘের সংখ্যা দেখে।’ তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় বন বিভাগ অনেক ব্যয়বহুল বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। কিন্তু সেগুলোতে বাঘ রক্ষার চেয়ে অন্য কাজে অনেক বিলাসী ব্যয় হতে দেখছি। কিন্তু সুন্দরবনের বাঘ ও বাঘের খাবার কী পরিমাণে আছে, সে বিষয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ হতে দেখিনি। বাঘ রক্ষার উদ্যোগগুলোরও তেমন কোনো সাফল্য দেখা যাচ্ছে না।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here