বিশ্বের রহস্যময়ী নারী

0
150

নাচের আবেদনময় মুদ্রায় সবাইকে মাতিয়ে রেখেছিলেন তিনি। পানের আসরে আসরে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর নাম। কিন্তু ১৫ অক্টোবর রাতটা যেন ওলন্দাজ এই নৃত্যশিল্পীর কাছে অন্য রকম মনে হয়েছিল। সেই রাতে তাঁর নাচ দেখতে চাননি কেউ। তিনিও প্রস্তুত ছিলেন না নাচের জন্য। স্রেফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, নগ্ন নাচ নয়, আজ তিনি মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।

রাত শেষ হতে আর একটু বাকি। ফ্রান্সের সেন্ট লাজার কারাগার থেকে সেনাবাহিনীর একটি ধূসর গাড়িতে করে মাতা হারিকে নিয়ে যাওয়া হয় শহরের উপকণ্ঠে। শহরের সুনসান পথে তাঁর সঙ্গী মাত্র তিনজন—দুজন নান ও তাঁর আইনজীবী। সেখানে একটি খুঁটি পোঁতা হয়েছে। তার পাশে হাত বেঁধে দাঁড় করানো হলো মাতা হারিকে। ৪১ বছর বয়সী এই নৃত্যশিল্পীর পরনে লম্বা কোট, মাথায় হ্যাট। নিজের মৃত্যুকে চোখে দেখতে চান, তাই চোখ বাঁধতে দিলেন না তিনি। ইশারায় জানিয়ে দিলেন, এখন প্রস্তুত। এর আগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে খাড়া ফায়ারিং স্কোয়াডের সেনাদের উদ্দেশে একটি উড়ন্ত চুম্বন দিলেন। এরপর তাঁর বুকের দিকে বন্দুক তাক করে গুলি ছোড়া হলো। হাঁটু মুড়ে ঢলে পড়লেন নিচে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে একজন সেনা এগিয়ে মাতা হারির মাথায় আরেকটি গুলি করেন।
এভাবেই ১০০ বছর আগে ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বিশ্বের রহস্যময়ী এই নারীর। অভিযোগ, তিনি নাচের নেশায় বিভোর করে চরবৃত্তি করতেন।

মোহময় নগ্ন নাচের তালে তালে মাতা হারি প্যারিসের পানশালাগুলোয় এমন নেশা ছড়িয়ে ছিলেন যে তাঁকে নিয়ে ওই নগরের কেউকেটাদের মধ্যে তুমুল কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে গিয়েছিল। বিশ শতকের গোড়ার দিকে অভিজাত ফরাসি ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, আমলাদের অনেকেরই উপপত্নী হয়ে ইউরোপের এ মাথা থেকে ও মাথা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন মাতা হারি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর নিজের এ রহস্যময় আকর্ষণ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে জার্মানির হয়ে চরের কাজ শুরু করেন এই নৃত্যশিল্পী। চরবৃত্তিতে ধরা পড়ার পর ফরাসিরা মাতা হারির বিচার করে এবং তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মাতা হারিকে এখনো ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত বা কুখ্যাত নারী গুপ্তচর। তাঁর আসল নাম মার্গারিটা গের্ট্রুডা জেল। জন্ম নেদারল্যান্ডসে, ১৮৭৬ সালে। ২০ শতকে নাচ দেখিয়ে সবাইকে পানশালায় বুঁদ করে রাখতেন তিনি। অভিজাত ফরাসি ব্যক্তিরা মাতা হারির সঙ্গে শারীরিক সংসর্গও করতেন। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টাতে থাকে। সরকারি গোয়েন্দারা তাঁর কাছে থেকে নাচ আর যৌনতার চেয়েও বেশি কিছু চাইতে শুরু করলেন। তাঁকে চরবৃত্তিতে কাজে লাগানো শুরু করলেন।

মাতা হারির বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ছিলেন জার্মান চর। এ ছাড়া মিত্রবাহিনীর সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যৌনতার সুযোগ নিয়ে তিনি গোপন তথ্য প্রতিপক্ষের কাছে পাচার করেছেন। পত্রপত্রিকায় সে সময় লেখা হয়েছিল, মাতা হারি মিত্রবাহিনীর হাজারো সেনার মৃত্যুর জন্য দায়ী। পরে বিচারের সময় সাক্ষ্যপ্রমাণে দেখা যায়, তিনি ছিলেন একজন ডাবল এজেন্ট বা দ্বৈত চর। অর্থাৎ, তিনি জার্মান ও মিত্রবাহিনী উভয়ের জন্যই চরবৃত্তি করেছেন।

ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, মাতা হারি নেদারল্যান্ডসের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে। বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত মাতা হারি কিশোরী বয়সেই বাবা-মাকে হারান। জীবনে হঠাৎ বিপর্যয় নেমে আসে। ১৮ বছর বয়সে তাঁর দ্বিগুণ বয়সী ক্যাপ্টেন রুডলফ জন ম্যাকলেওডের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। ইস্ট ইন্ডিয়া আর্মির ক্যাপ্টেন ছিলেন তিনি। তারপর স্বামীর সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি। কিন্তু যৌন বিকার ও যৌন রোগগ্রস্ত রুডলফের সঙ্গে জীবনটা খুব স্বচ্ছন্দে কাটেনি তাঁর। এক চিঠিতে মাতা হারি লিখেছিলেন, ‘রুডলফ রুটি কাটার ছুরি নিয়ে আমাকে খুন করতে এসেছিলেন।’ বাবার যৌনরোগে বলি হয় তাঁদের ছেলে সন্তান। মেয়েকে নিজের কাছে রাখতে চেয়েও পারেনি তিনি। শেষমেশ দাম্পত্যে ইতি টানতে হয় তাঁদের।

জীবনের তাগিদে এক সময় প্যারিসে চলে যান মাতা হারি। সেখানে মার্গারিটা নাম বদলে ফেলে নাচের দুনিয়ায় পা রাখেন। মোহময় নাচের জাদুতে মুগ্ধ হতে থাকলেন অনেকেই। স্বামী রুডলফের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় ঘোরার সময় নাচটা রপ্ত করেছিলেন তিনি। সেই নৃত্যশৈলীই পরে ফ্রান্সে এসে কাজে লাগাতে থাকলেন। নাচের ভেতর নগ্নতাকেও শিল্পে রূপ দিয়েছিলেন মাতা হারি। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাঁকে। হুড়হুড় করে বাড়তে লাগল যশ ও অর্থ। তবে এর জন্য কর্মকর্তাদের যৌনসঙ্গীও হতে হতো তাঁকে।

আরেকটি চিঠিতে মাতা হারি তাঁর সাবেক স্বামী রুডলফের চাচাতো ভাইকে লিখেছিলেন, ‘একটি থিয়েটারে আমার স্থায়ী চাকরি হয়েছে। তবে এখানে অর্থের বিনিময়ে মানুষের সঙ্গে শারীরিক সংসর্গ করতে হয়। এটা শুনে ভেবো না যে, আমি এতে কষ্ট পাচ্ছি। অভাব ঘোচাতেই আমাকে এই কাজ করতে হবে।’

নেদারল্যান্ডসে মাতা হারির জন্ম শহর লিউওয়ার্ডেনে মিউজিয়াম অব ফ্রাইসল্যান্ডের কিউরেটর হ্যান্স গ্রোয়েনওয়েগ বলেন, মাতা হারির সামনে দুটি পথ খোলা ছিল। একটি ছিল ফ্রান্সে গিয়ে জীবনের আমূল পরিবর্তন। আরেকটি ছিল, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বাস করে সাবেক স্বামীর কাছ থেকে কন্যা সন্তানকে নিজের কাছে নিয়ে আসার লড়াই চালানো। কিন্তু মাতা হারি প্রথম পথটিই বেছে নিয়েছিলেন। জীবনে উন্নতির শীর্ষে পৌঁছেছিলেন ঠিকই, কিন্তু প্রতিটা মুহূর্ত তাঁর কন্যা সন্তানের চিন্তা তাড়িয়ে বেড়াতো তাঁকে। তিনিই মূলত সে সময় খোলামেলা নাচকে প্রথম শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।

মিয়ামি হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ফ্রান্সের সরকারি গোয়েন্দারা তাঁর কাছে থেকে নাচ আর যৌনতার চেয়েও বেশি কিছু চাইতে শুরু করলেন। সে সময় নেদারল্যান্ডসের নাগরিক হওয়ায় ইউরোপের সব জায়গায় যাতায়াত করতে পারতেন তিনি। এ কারণে তাঁকে গুপ্তচরবৃত্তিতে কাজে লাগানো শুরু করলেন। একবার জার্মানিতে নাচের অনুষ্ঠানে যাওয়ার সময় বার্লিনে তাঁকে আটক করা হয়। ব্যাংক হিসাব ও অর্থ নিয়ে তাঁকে ফেরত পাঠানো হয়। এর পরই জার্মানির এক কনসালের পরিচয় হয় তাঁর। বিপুল অর্থের বিনিময়ে তাঁকে সেই কনসালের চরবৃত্তির প্রস্তাব লুফে নেন মাতা হারি। ওদিকে ফ্রান্সেও সরকারি গোয়েন্দার গুপ্তচর তিনি। বিষয়টি টের পেয়ে ফ্রান্স পুলিশের জালে আটকা পড়েন তিনি।

বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে জানানো হয়, যুদ্ধের সময় জার্মান সামরিক কর্মকর্তা আরনল্ড ভন কাল্লের পাঠানো একটি টেলিগ্রাম ফরাসি গোয়েন্দারা হাতে চলে যায়। সেখানে ‘এজেন্ট এইচ টোয়েন্টিওয়ান’ বলে একজনের উল্লেখ আছে। ওই টেলিগ্রামে মাতা হারির গৃহকর্মী মহিলার ঠিকানা ও ব্যাংকের তথ্য ছিল। এ কারণে গোয়েন্দাদের কাছে এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, এজেন্ট এইচ টোয়েন্টিওয়ান আসলে মাতা হারি। টেলিগ্রামটি এখনো একটি জাদুঘরে রাখা আছে। অনেকে এর সত্যতা নিয়ে সন্দেহ করেন। তাদের ধারণা, মাতা হারিকে ফাঁসানোর জন্য ফরাসিরা এই নাটক সাজিয়েছিল।

চরবৃত্তির অভিযোগে ১৯১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্যারিসের এক হোটেল থেকে মাতা হারিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে বন্দী করে রাখা হয় সেন্ট লাজার কারাগারে। শেষ জিজ্ঞাসাবাদে মাতা হারি স্বীকার করেছিলেন, জার্মানিরা ১৯১৫ সালে তাঁকে গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ করেছিল। তবে তিনি আসলে মিত্রবাহিনীর প্রতি অনুগত ছিলেন। জার্মানিদের কাছ থেকে বিপুল অর্থ নিয়ে কেটে পড়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। কিন্তু নিজেকে নির্দোষ প্রমাণিত করতে পারেননি তিনি। তাঁর বিরুদ্ধে পাওয়া তথ্যেরও প্রমাণ হয়নি। তবে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন রহস্যময়ী এই নারী। ১৯১৭ সালের ১৫ অক্টোবর ফায়ারিং স্কোয়াডে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর মাতা হারির মরদেহ নিতে কেউ আসেনি। পরে তাঁর মরদেহ প্যারিসের একটি মেডিকেল স্কুলে শিক্ষার্থীদের জন্য দেওয়া হয়। মাথাটা রাখা হয় একটি অ্যানাটমি জাদুঘরে। তবে প্রায় ২০ বছর আগে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মাতা হারির সংরক্ষিত মাথা জাদুঘর থেকে হারিয়ে গেছে। ধারণা করা হয়, কেউ সেটিকে চুরি করে নিয়ে গেছে।

মাতা হারি ফ্রান্স ও জার্মানির দ্বৈত চর ছিলেন কি না, এ নিয়ে এই ১০০ বছরেও বিতর্কের শেষ হয়নি। এত দিনে তাঁকে নিয়ে লেখা হয়েছে অনেক বই ও নির্মাণ করা হয়েছে চলচ্চিত্র। নাচ আর যৌনতা নিয়ে তিনি যতটা খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছে গিয়েছিলেন, গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ নিয়ে ততটাই অসহায় হয়ে পড়েন। ১০০ বছর আগে মৃত্যু হলেও এসব গল্প এখনো মুখে মুখে ফেরে মানুষের।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here