বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন

0
115

দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ১৯৯৭ সালে এইচআইভি/এইডসের চিকিৎসায় যখন সাশ্রয়ী জেনেরিক ওষুধের ব্যবহার প্রচলনের উদ্দেশে্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিল, তখন বৈশ্বিক ওষুধশিল্প পুরো আইনি শক্তি নিয়ে দেশটির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারা এর বাস্তবায়ন দীর্ঘায়িত করল, যার কারণে বহু মানুষকে মূল্য দিতে হয়েছে। শেষমেশ দক্ষিণ আফ্রিকা মামলায় জিতলেও সরকার শিক্ষা পেয়ে যায়। মানে এরপর তারা প্রথাগত বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের রীতি চ্যালেঞ্জ করে নাগরিকের স্বাস্থ্যসেবা নিজের হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেনি।
দেশটির সরকার এখন বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ নীতি চূড়ান্ত করার চেষ্টা করছে, যার মাধ্যমে তারা মানুষের ওষুধপ্রাপ্তির সুযোগ যথেষ্ট অবারিত করার অঙ্গীকার আছে। এখন তাকে ধনী দেশগুলোর তরফ থেকে ব্যাপক দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় চাপ সইতে হবে। কিন্তু দেশটির সরকার সঠিক কাজটি করছে। উদীয়মান দেশগুলোরও তার পদাঙ্ক অনুসরণ করা উচিত।
বিগত দুই দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলার তরফ থেকে বর্তমান বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ হয়েছে। এর জন্য ধনী দেশগুলোর সবার জন্য একই তরিকা নীতি অনেকাংশে দায়ী। বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিধিবিধান প্রণয়নে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে তারা নিজেদের ইচ্ছা অন্যের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে। ধনী দেশগুলো যেভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা করতে চায়, তাতে আবিষ্কার বা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বাড়বাড়ন্ত হবে না, বরং তাতে বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো লাভবান হবে। এতে বড় কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে বাণিজ্য চুক্তিতে লাভবান হবে। সে কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও ভারতের মতো বড় উন্নয়নশীল দেশগুলো পাল্টা আক্রমণ করছে।
এই দেশগুলোর প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতার ওপর জোর দিচ্ছে। ২০০৫ সালে ভারতের এক আইন সংশোধনের মাধ্যমে পেটেন্টের মান নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্য ও ন্যায্যতা আসে। এর মাধ্যমে মানুষের ওষুধপ্রাপ্তি সুরক্ষিত হয়। অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই আইন বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিল এইচআইভি ও এইডসের চিকিৎসার জন্য প্রাথমিক পর্যায়েই ব্যবস্থা নিলে ওষুধের দাম উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসে।
অসম ও অন্যায্য বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রতিবাদ করে এসব দেশ সঠিক কাজ করেছে। নতুন এক গবেষণাপত্রে উন্নয়নপ্রক্রিয়ায় আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদের প্রসঙ্গটি পর্যালোচনা করেছি। আমরা দেখিয়েছি, বিপুল পরিমাণ তাত্ত্বিক ও বাস্তব সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দেখা যায়, আজকের উন্নত দেশগুলোর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান ও আইন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক তৎপরতা পরিচালনায় একেবারেই অপর্যাপ্ত। উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান বাজারের জন্য এটা জুতসই নয়। বস্তুত, এসব স্বাস্থ্যসেবার মতো মানবীয় চাহিদা পূরণের অন্তরায়।
মূল সমস্যা হলো জ্ঞান এক বৈশ্বিক গণসম্পত্তি, সেটা যেমন প্রায়োগিক দিক থেকে, তেমনি সাধারণ অর্থেও। কারণ, জ্ঞান ব্যবহারের প্রান্তিক ব্যয় শূন্য। আর জ্ঞানের ভান্ডার সমৃদ্ধ হলে সারা পৃথিবীতেই মানুষের অবস্থার উন্নতি হবে। এই পরিপ্রেক্ষিতে উদ্বেগের কারণ হচ্ছে বাজারে যথেষ্ট জ্ঞান উৎপাদিত না হওয়া আর গবেষণায় যথেষ্ট প্রণোদনা না দেওয়া।
বিংশ শতকের শেষভাগে মানুষের প্রথাগত জ্ঞানে মনে করা হতো বাজারের ব্যর্থতা মোকাবিলায় আরেকটি বাজার চালু করা যায়। সেটা হলো ব্যক্তিগত একচেটিয়া, যা কড়া মেধাস্বত্বের মাধ্যমে কঠোরভাবে চালু করা যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ সুরক্ষা গবেষণায় অর্থায়নের সমস্যা সমাধানের স্রেফ একটি পথ। কিন্তু যে রকমটা ভাবা হয়েছিল, এটা তার চেয়েও বেশি সমস্যাজনক, এমনকি উন্নত দেশগুলোর জন্যও।
২০১৩ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সিদ্ধান্ত দেন প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত জিন পেটেন্ট করা যাবে না। পেটেন্ট প্রকৃত অর্থে গবেষণা ও উদ্ভাবনে গতি দেয় কি না—এই সিদ্ধান্ত পেটেন্টবাদীদের প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, নাকি তা জ্ঞানের প্রবেশাধিকার রুদ্ধ করে গবেষণার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলাফল দ্ব্যর্থহীন, যথেষ্ট কম খরচে রোগ পরীক্ষা করা যাচ্ছে।
গবেষণায় অর্থায়ন ও প্রণোদনা দেওয়ার তিনটি তরিকা আছে। একটি হচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় সরাসরি গবেষণায় অর্থায়ন, যেমন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ ও ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন। আরেকটি হলো সরাসরি অর্থায়নের ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকৃত করা, যেমন রাজস্ব হ্রাস। অথবা সরকারি সংস্থা, বেসরকারি ফাউন্ডেশন ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সফল উদ্ভাবনের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করে।
পেটেন্ট ব্যবস্থাপনাকে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থা হিসেবে গণ্য করা যায়। কিন্তু পুরস্কার জ্ঞানের প্রবাহে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, এ থেকে প্রাপ্য সুবিধা কমায় ও অর্থনীতি বিকৃত করে। এর বিপরীতে ওপেন সোর্স বা উন্মুক্ত সফটওয়্যারের মতো ব্যবস্থায় জ্ঞানের প্রবাহ বাড়ে, যাকে এর চূড়ান্ত বিকল্প গণ্য করা যায়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর এসব মনোভাব ব্যবহার করে শিক্ষণ ও উদ্ভাবনে গতি সঞ্চার করা উচিত। সর্বোপরি অর্থনীতিবিদেরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, প্রবৃদ্ধির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হচ্ছে প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও তার প্রাসঙ্গিক জ্ঞান। উন্নয়নশীল দেশগুলোর সঙ্গে উন্নত দেশগুলোর ফারাক যেমন সম্পদে, তেমনি জ্ঞানেও। বৈশ্বিক সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে নীতিপ্রণেতাদের উচিত উন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে জ্ঞানের সঞ্চালন নিশ্চিত করা। কিন্তু আমাদের পৃথিবী যেন উল্টো দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বিদ্যমান বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা টেকসই নয়। একুশ শতকের বৈশ্বিক অর্থনীতি বিশ শতকের চেয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে ভিন্ন হবে। প্রথমত, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত ও ব্রাজিলের অর্থনৈতিক ভার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে। দ্বিতীয়ত, ‘নির্ভার অর্থনীতি’ অর্থাৎ চিন্তা, জ্ঞান ও তথ্যের অর্থনীতির ভাগ বাড়বে; সেটা যেমন উন্নত দেশে, তেমনি উন্নয়নশীল দেশেও।
তবে সময় বদলাচ্ছে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর উচিত হবে ভারসাম্যপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব দেওয়া; যেখানে উন্নয়ন, প্রবৃদ্ধি ও মানুষের কল্যাণে জ্ঞানের গুরুত্ব স্বীকৃতি পাবে। শুধু জ্ঞানের উৎপাদনই যথেষ্ট নয়, করপোরেট মুনাফার জায়গায় মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণে এটা ব্যবহার করতে হবে। দক্ষিণ আফ্রিকা মানুষের ওষুধপ্রাপ্তিতে যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা এই লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনূদিত।
জোসেফ ই স্টিগলিৎস: অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ।
ডেন বেকার: সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চের সহপ্রতিষ্ঠাতা।
অর্জুন জয়দেব: আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা পরিচালক।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here