ব্যাংক খাতে শেষ পর্যন্ত পরিবারতন্ত্রই কায়েম হতে যাচ্ছে

0
81

ব্যাংক খাতে শেষ পর্যন্ত পরিবারতন্ত্রই কায়েম হতে যাচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে পরিচালক হতে যাচ্ছেন দুজনের বদলে চারজন। আর তাঁরা পদে থাকবেন ছয় বছরের পরিবর্তে টানা নয় বছর।

আগে বিরোধিতা করেও গতকাল মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত সভায় এ দুই সুবিধা দিয়ে ‘ব্যাংক-কোম্পানি (সংশোধন) বিল, ২০১৭’ পাস করার সুপারিশ করেছে অর্থ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এই বিষয়ে কমিটির একটি প্রতিবেদন আজ বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে উপস্থাপন করা হবে। বিল পাস হতে পারে সংসদের চলতি অধিবেশনেই।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মইনুল ইসলাম এ বিষয়ে গত রাতে বলেন, ‘এমনিতেই ব্যাংক খাতে লুটপাটের মহাযজ্ঞ চলছে। তার ওপর নতুন করে একটি ব্যাংকে একই পরিবার থেকে চারজন এবং তাঁদের টানা নয় বছর পরিচালক থাকার বিধান করা হচ্ছে। এটি হলে ব্যাংক খাতে চলমান লুটপাটকে আরও উৎসাহিত করা হবে।’

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সংসদে বিলটি উত্থাপন করেছিলেন গত ১২ সেপ্টেম্বর। সেদিন এর বিরোধিতা করে জাতীয় পার্টির সাংসদ ফখরুল ইমাম নাম উল্লেখ না করে বলেছিলেন, ‘একজন ব্যক্তির স্বার্থে আইন হতে পারে না। একই পরিবারের দুজন থেকে চারজন করে পরিচালক হলে ব্যাংক খাতে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। পারিবারিক ব্যাংকিং শুরু হয়ে যাবে দেশে এবং সব লুটপাট হয়ে যাবে।’
বিরোধিতা নাকচ করে বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সংসদীয় কমিটিকে একটি প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। সংসদীয় কমিটি গতকাল এবং তার আগে

২৯ অক্টোবর বিলের ওপর আলোচনা করে। আগের বৈঠকে এক পরিবারের চারজন পরিচালক এবং তাঁদের টানা নয় বছর মেয়াদের বিরোধিতা করলেও গতকাল কমিটির সবাই ব্যাংকের মালিকদের পক্ষেই অবস্থান নেন। সরকারের সিদ্ধান্তই মেনে নেয় কমিটি।
বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো ধরনের পরিবর্তন ছাড়াই বিলটি পাস করে দেওয়া হয়েছে। আগামীকাল (আজ বুধবার) কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উপস্থাপন করা হবে।’

কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা যায়, আগের বৈঠকে আব্দুর রাজ্জাক বলেছিলেন, ‘এক পরিবার থেকে চারজন একটানা নয় বছর পরিচালকের দায়িত্ব পালন করতে পারবেন—এ বিষয়গুলো পুনর্বিবেচিত হওয়া দরকার।’ দেশের মূল চার নীতি সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদের কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেছিলেন, গুরুত্বপূর্ণ বিল হিসেবে অর্থমন্ত্রীর উপস্থিতিতে এর ওপর আলোচনা হওয়া উচিত। অন্য সদস্যরাও একই মত দিয়েছিলেন।

কার্যবিবরণী থেকে আরও জানা যায়, কমিটির সদস্য ফরহাদ হোসেন বলেছিলেন, বিলটি পাস হলে ব্যাংক খাত আরও বেশি পরিবারকেন্দ্রিক হয়ে উঠবে। আরেক সদস্য বেগম আখতার জাহানের মত ছিল বিলটি পাস হলে ব্যাংক খাত পরিবারকেন্দ্রিক হবে, মানুষের আস্থা হারাবে এবং এ খাতে স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে।

অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আবদুল মান্নান অবশ্য ওই বৈঠকে বলেছিলেন, মন্ত্রিসভা গভীরভাবে বিবেচনা করেই বিলটির অনুমোদন দিয়েছে। গতকালের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর কেউই উপস্থিত ছিলেন না।

বর্তমানে এক পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুজন একটি ব্যাংকের পরিচালক হতে পারেন। তিন বছর করে দুই মেয়াদে ছয় বছর পরিচালক থাকার পর তিন বছর বিরতি দিয়ে আবারও পরিচালক হওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁদের।

বেসরকারি ব্যাংকের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) দাবি ও তোড়জোড়ের মুখেই সরকার গত বছর ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনে হাত দেয়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ মতামত চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংক তখন জানিয়ে দিয়েছিল একই পরিবার থেকে দুজনের বেশি পরিচালক করা হলে একটি ব্যাংক একই পরিবারের মধ্যে কুক্ষিগত হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতামত আমলে না নিয়েই চলতি বছরের ৮ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে ব্যাংক কোম্পানি (সংশোধন) আইন, ২০১৭-এর খসড়া অনুমোদন পায়। এরপর ব্যাংক খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরাও সমালোচনা করে আসছেন। অনেকে মনে করেন, প্রভাবশালী কয়েকজন ব্যবসায়ীকে সুযোগ দিতেই ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধন করা হচ্ছে।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্পর্কে বলা হয়েছে, কোনো পরিবারের কেউ পৃথকভাবে ব্যবসা করলে এবং নিজেই করদাতা হলে তাঁকে পরিবারের ওপর নির্ভরশীল বলা যায় না। বর্তমান বিধানে একক পরিবার থেকে পরিচালক পদে নিয়োগযোগ্য সদস্যসংখ্যা দুজনে সীমিত। একক পরিবার থেকে দুজনের স্থলে চারজনকে সুযোগ দেওয়া হলে এ সমস্যা অনেকাংশে দূর হবে।

ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১ পাস হওয়ার পর থেকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিচালকদের মেয়াদ-সম্পর্কিত ধারাটি পাঁচবার সংশোধন করা হয়েছে। সর্বশেষ সংশোধন করা হয় ২০১৩ সালে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here