মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে

0
88
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কিছু প্রামাণ্যচিত্র নির্মিত হয়েছে, যার সূচনা করেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান স্টপ জেনোসাইড-এর মাধ্যমে। এসব প্রামাণ্যচিত্রে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংসতার কথা থাকলেও পাকিস্তানি ভাষ্য নেই, থাকা সম্ভবও ছিল না।

কানাডাপ্রবাসী প্রামাণ্যচিত্রকার ফুয়াদ চৌধুরী সম্ভবত প্রথম পাকিস্তানিদের ভাষ্যে তুলে এনেছেন একাত্তরে দেশটির শাসকদের নিষ্ঠুরতা, চক্রান্ত, হঠকারিতা এবং সেনাবাহিনীর গণহত্যা, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের বিষয়টি নিয়ে। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছর পরও যখন পাকিস্তানের সরকার একাত্তরের সত্য লুকিয়ে রাখতে তৎপর, দেশটির সামরিক ও বেসামরিক আমলারা একের পর এক বই লিখে সাফাই গাইছেন, তখন ফুয়াদ চৌধুরীর এ প্রামাণ্যচিত্র নির্মম সত্যই দর্শকদের কাছে তুলে ধরেছে। এতে তিনি প্রধানত তিনজন প্রবাসী পাকিস্তানি—সাংবাদিক তারিক খান, লেখক তারেক ফাতাহ ও সাবেক সচিব রওশন জামিরের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন, যাঁরা বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি শাসকদের চণ্ডনীতি এবং সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। দেশে থাকলে বলতে পারতেন কি না সন্দেহ।

ফুয়াদ চৌধুরী তাঁর Marciless Mayhem বা পূর্ব বাংলায় নৃশংসতা: পাকিস্তানিদের চোখে প্রামাণ্যচিত্রটি শুরু করেছেন দেশ বিভাগের পটভূমি দিয়ে। সাতচল্লিশে বিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চল পাকিস্তানের অংশ হলেও দেশটির পশ্চিমাংশের নেতা ও আমলারা বাঙালিদের নানাভাবে কোণঠাসা করতে থাকেন। সরকারি চাকরি, সেনাবাহিনীতে যোগদান কিংবা বাজেট বরাদ্দ—সবকিছুতে পূর্বাঞ্চল ছিল বঞ্চিত। পাকিস্তানি শাসকেরা শুরুতেই সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ওপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালান। তারিক খান যথার্থই বলেছেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ যেদিন ঢাকায় উর্দু পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে বলে ঘোষণা দিলেন, সেদিনই পাকিস্তান ভেঙে গেছে।

এই প্রামাণ্যচিত্রে পরিচালক নিজের ধারাভাষ্য ও সাক্ষাৎকারের পাশাপাশি সেই সময়ের কুশীলব ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, জেনারেল নিয়াজি, টিক্কা খান প্রমুখের ভাষ্য তুলে ধরেছেন বিভিন্ন ফুটেজ ব্যবহার করে। বেলুচিস্তানের কসাই বলে পরিচিত জেনারেল টিক্কা খান ঢাকায় এসেই ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরু করেন। একাত্তরে পাকিস্তানের তথ্যসচিবের দায়িত্ব পালনকারী রওশন জামিরের ভাষ্যে আমরা জানতে পারি সে সময় ক্ষমতালোভী ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টো চক্রান্ত করে কীভাবে নির্বাচনী ফলাফল বানচাল করেন। তিনি স্বীকার করেছেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একতরফা আক্রমণ ও গণহত্যার কারণে বিশ্বজনমত পাকিস্তানের বিপক্ষে চলে গিয়েছিল। পাকিস্তানিরা নির্বিচারে হত্যা করে বাঙালি পুলিশ, ইপিআর, সেনাসদস্য, রাজনীতিক, ছাত্র-তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষকে। নারীদের ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন।

প্রামাণ্যচিত্রে আমরা রওশন আরা নামের এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীকে দেখতে পাই, যাকে পাকিস্তানি সেনারা ক্যাম্পে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন চালিয়েছে। এ রকম অগণন বাঙালি নারী পাকিস্তানিদের বর্বরতার শিকার হয়েছেন। তবে ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান নিয়াজি যে বাঙালির জাত বদলে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেটি পূরণ হয়নি। বরং তাঁকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনা নিয়ে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে।

একাত্তরে তারেক ফাতাহ ছিলেন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হলে সেই সময় পাকিস্তানি ছাত্ররা কীভাবে উল্লাস করেছিলেন এবং বাঙালি ছাত্ররা কষ্ট পেয়েছিলেন, তা-ও উঠে এসেছে তাঁর ভাষ্যে। পাকিস্তানে জাতিগত লড়াই এখনো চলছে। সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠানরা আন্দোলন করছেন পাঞ্জাবি আধিপত্যের বিরুদ্ধে।

চিত্রের একেবারে শেষ দিকে বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে দেখা যায়, যাঁকে তুলনা করা হয়েছে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর সঙ্গে। সত্তরের নির্বাচনের আগে পশ্চিম পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর জনসভার বর্ণনা দিতে গিয়ে তারেক ফাতাহ জানিয়েছেন, করাচির জনসভায় ২০ লাখ লোকের সমাগম হয়েছিল।
নির্মাণশৈলী ও সম্পাদনার দিক দিয়ে প্রামাণ্যচিত্রটির যথেষ্ট দুর্বলতার আছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসংগতিও চোখে পড়ার মতো। তা সত্ত্বেও ফুয়াদ চৌধুরীকে ধন্যবাদ জানাই। তিনি পাকিস্তানিদের কণ্ঠে পাকিস্তানিদের অপকর্মের বয়ান তুলে ধরেছেন।
বাংলাদেশে তো বটেই, পাকিস্তানের তরুণ প্রজন্মের দর্শকদের এই ছবি বেশি বেশি করে দেখানো উচিত।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here