রোহিঙ্গা সংকট মেটাতে ঐকমত্য

0
52

জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনান বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে সম্ভাব্য পদক্ষেপ নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ঐকমত্য রয়েছে।

কফি আনান জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিরাপত্তা পরিষদের উন্মুক্ত অধিবেশনেই এই মতৈক্য হয়। সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, উপদ্রুত এলাকায় অবিলম্বে আন্তর্জাতিক ত্রাণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা এবং সব উদ্বাস্তুর নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে সবাই একমত হয়েছে।

গতকাল শুক্রবার নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের অনুরোধে আয়োজিত এক বৈঠকে কফি আনান রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে এসব কথা বলেন।

আনান মিয়ানমার সরকারের আমন্ত্রণে গঠিত রাখাইন রাজ্য প্রশ্নে উপদেষ্টা কমিশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই কমিশন গত আগস্ট মাসে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে রাখাইন রাজ্যের সংকট সমাধানের লক্ষ্যে ১০ দফা সুপারিশমালা পেশ করে। এই কমিশনের সভাপতি হিসেবে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হয়ে কফি আনান পরিষদের সদস্যদের পরিস্থিতি বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার এ রূপরেখা তুলে ধরেন।

আরিয়া ফর্মুলার অধীনে আয়োজিত এই বৈঠক সদস্য রাষ্ট্র ও সুশীল সমাজভুক্ত সংগঠনগুলোর জন্য উন্মুক্ত ছিল। তবে সেখানে সাংবাদিকদের থাকতে দেওয়া হয়নি। বৈঠক শেষে কফি আনান সাংবাদিকদের সামনে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেন।

বৈঠকে মিয়ানমারের প্রতিনিধি ও দেশটির সামরিক উপদেষ্টা দাবি করেন, রাখাইন রাজ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সামরিক তৎপরতা বন্ধ হয়েছে। সেখানে আর কোনো সহিংসতা নেই। তাঁর কথায় সন্দেহ প্রকাশ করে কফি আনান বলেন, সহিংসতা যদি বন্ধ হয়ে থাকে, তাহলে এখনো দলে দলে মানুষ কেন দেশ ছাড়ছে? এর কারণ কি ক্ষুধা, সন্ত্রাসী দলের তৎপরতা, নাকি রোহিঙ্গাদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ভয়? কফি আনান জোর দিয়ে বলেন, কারণ যা-ই হোক, সহিংসতা বন্ধ করতে হবে।

কফি আনান বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারটা অত সহজ নয়। রোহিঙ্গারা যদি নিরাপদবোধ না করে, তাদের জীবন আগের চেয়ে ভালো হবে, এটা ভাবতে না পারে, তাহলে তারা হয়তো ফিরে যাবে না।

সাবেক মহাসচিব বলেন, যারা মিয়ানমারে ফিরে যাবে, তাদের কোনো আশ্রয়শিবিরে রাখা যাবে না। নিজ নিজ গ্রামে ফিরে যেতে দিতে হবে। নতুন জীবনের জন্য সব সহায়তা দিতে হবে।

কফি আনান মনে করেন, রাখাইন কমিশনে যে সুপারিশমালা রয়েছে, এর ভিত্তিতে একটি রোডম্যাপ প্রস্তুত করা সম্ভব। আর তা অনুসরণ করলে স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান অর্জন করা সম্ভব। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কমিশনের সুপারিশে সমস্যার মূল কারণ, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের প্রশ্নটি, সমাধানের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের কথাও এতে বলা হয়েছে।

কফি আনান জানান, মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি কমিশনের সুপারিশগুলো অনুমোদন করেছেন। কীভাবে সেগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব, তা বিবেচনার জন্য আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করেছেন। সু চি আন্তর্জাতিক সদস্য সমন্বয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনেও আগ্রহী বলে জানান কফি আনান।

যেভাবে হত্যাযজ্ঞ চলছে, সেই সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের সদিচ্ছা রয়েছে, এ কথা ভাবার কোনো কারণ রয়েছে কি না, তা জানতে চাওয়া হলে কফি আনান বলেন, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। তিনি মনে করেন, প্রায় পাঁচ দশক সামরিক শাসনাধীন থাকার পর মিয়ানমার বর্তমানে জটিল রূপান্তরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এখানে বেসামরিক ও সামরিক নেতৃত্বের ভিত্তিতে দ্বৈত শাসনব্যবস্থা চলছে। এর কারণে এই সংকট সমাধানে অতিরিক্ত জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

সাবেক এই মহাসচিব মনে করেন, মিয়ানমারের নিজের স্বার্থেই তাকে এই সংকটের সমাধান করতে হবে। এই সংকট জিইয়ে রাখার কারণে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক উন্নয়নও থমকে আছে।

সংকট সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদ কী ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে, এই প্রশ্নের জবাবে কফি আনান বলেন, তাঁর আশা, পরিষদ এমন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করবে, যাতে উদ্বাস্তুদের নিরাপদ ও সম্মানজন প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের ওপর চাপ দেবে। শুধু ফিরে গেলেই হবে না, উদ্বাস্তুদের নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে হবে।

আনান বলেন, রাখাইন কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতে যে ‘রোডম্যাপ’ রয়েছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তা বাস্তবায়নে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষকে সহায়তা দিতে প্রস্তুত। এই সংকট সমাধানে ব্যর্থতা শুধু মিয়ানমার ও তার প্রতিবেশীদের জন্য নয়; এর বাইরেও সংকট দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার তৈরি করতে পারে।

অন্য এক প্রশ্নের জবাবে কফি আনান জানান, কমিশনের সুপারিশের বাইরে কোনো বিকল্প প্রস্তাব তাঁর নেই। সবাই সম্মিলিতভাবে এই সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে উদ্যোগী হলে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।

এক প্রশ্নের জবাব কফি আনান জানান, তিনি যত দূর জানেন, সহিংসতা থেমে এসেছে। পরিস্থিতি এখন শান্ত। তিনি বলেন, এ কথার অবশ্য এই অর্থ নয় যে নিরাপত্তা বাহিনী প্রত্যাহার করা হলে কোনো ব্যক্তি বা দল আবার সহিংস পথে যাবে না।

বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন বক্তব্য দেন। প্রথম আলোর সঙ্গে টেলিফোন সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রদূত মোমেন বৈঠকের ফলাফলে নিজের সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, মিয়ানমার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে স্পষ্ট মতৈক্য রয়েছে। ২৮ সেপ্টেম্বরে নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে সংকট সমাধানের লক্ষ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব যে রূপরেখা দেন, কফি আনান তাতে সমর্থন দেন। রাষ্ট্রদূত মোমেন বলেন, সংকটের নিষ্পত্তি খুব সহজেই হবে বলে মনে হয় না। তবে তাঁরা সঠিক পথেই চলছেন।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here