রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

0
73
রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ

মিয়ানমারে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে করা মামলায় আজ সোমবার রায় ঘোষণার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। বিচারক অসুস্থ থাকায় আগামী ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিষয়টি মুলতবি থাকবে।

দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁদের সর্বোচ্চ ১৪ বছর করে কারাদণ্ড হতে পারে। তাঁদের আইনজীবী বলছেন, ‘যদি বিচার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ হয়’, তাহলে তাঁর দুই মক্কেল বেকসুর খালাস পাবেন।

রয়টার্সের গ্রেপ্তার দুই সাংবাদিক হলেন ওয়া লোন (৩২) ও কিয়াও সোয়ে ওউ (২৮)। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষ ও কিশোরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান চালানোর সময় গত ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার হন তাঁরা।

আজ রায় উপলক্ষে অনেক সাংবাদিক ও কূটনীতিক ইয়াঙ্গুন আদালতে জড়ো হয়েছিলেন। আদালতের কার্যক্রম চলে মাত্র কয়েক মিনিট। এই মামলার বিচারক ইয়ে লুইন বলেন, আগামী সপ্তাহে রায় ঘোষণা করা হবে।

ভারপ্রাপ্ত বিচারক খিন মায়ুং মায়ুং বলেন, ‘এই আদালতের বিচারক খুবই অসুস্থ। তাই আমি আগামী মাসের ৩ তারিখ পর্যন্ত রায় ঘোষণা স্থগিত করতে এখানে এসেছি।’

বিবাদীপক্ষের আইনজীবী খিন মায়ুং জ সাংবাদিকদের বলেন, ভারপ্রাপ্ত বিচারক জানিয়েছেন, রায় প্রস্তুত। কিন্তু এ মামলার যিনি বিচারক, তাঁকেই এ রায় ঘোষণা করতে হবে।

আদালতের দিকে হেঁটে যাওয়ার সময় হাসি ছিল ওয়া লোনের মুখে। হাতকড়া পরা অবস্থাতেই তিনি সব ঠিক আছে—এমন ইশারা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ভীত নই। সত্য আমাদের পক্ষে। পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আমরা ঝরে পড়ব না। তারা আমাদের দুর্বল করতে পারবে না।’

গ্রেপ্তারের পর এই দুই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। আদালতে শুরু হয় প্রাথমিক শুনানি। ছয় মাসের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত ৯ জুলাই ইয়াঙ্গুনের ডিস্ট্রিক্ট আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।

ওয়া লোন বলেন, তাঁরা গণমাধ্যমের সব নীতিমালা মেনেই কাজ করেছেন। ‘আমরা বাস্তব পরিস্থিতির সত্যটা সবাইকে জানাতে চেয়েছি।’

এরই মধ্যে দুই সাংবাদিকের মুক্তির দাবিতে প্রচারে নামেন লেখক, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীরা। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা কয়েকটি দেশও তাঁদের মুক্তির দাবি জানায়।

দুই সাংবাদিকের সঙ্গে কী ঘটেছিল
গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর রাখাইন রাজ্যের উত্তরাঞ্চলে ইনদিন গ্রামে ১০ জন রোহিঙ্গা পুরুষ ও কিশোরের হত্যাকাণ্ডের তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন ওয়া লোন ও কিয়াও সোয়ে ওউ। রয়টার্সের খবরে জানানো হয়, একদল রোহিঙ্গা সৈকতে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজছিল। তাদের বেছে নিয়ে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয় বৌদ্ধ গ্রামবাসীর হাতে আর অন্যরা সেনাবাহিনীর গুলিতে।

গত ১২ ডিসেম্বর দুই পুলিশ কর্মকর্তা ওই দুই সাংবাদিককে নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানান। সেখানে তাঁদের হাতে কিছু কাগজপত্র তুলে দেওয়া হয়। রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তাঁরা গ্রেপ্তার হন।

তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। পুলিশ বলেছে, বিদেশি গণমাধ্যমকে সরবরাহ করতে এসব তথ্য অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে।

দুই সাংবাদিকের বক্তব্য
এই দুই সাংবাদিকের আইনজীবী বলছেন, পুলিশই তাঁদের ফাঁসিয়েছে। কারণ, গণহত্যার বিষয়টি প্রকাশ করায় কর্মকর্তারা তাঁদের শাস্তি দিতে চাইছেন।

গত সপ্তাহে ওয়া লোন আদালতে বলেছেন, ‘আমরা কোনো ভুল করিনি। বাদীপক্ষের সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।’ প্রত্যক্ষদর্শী একজন পুলিশ কর্মকর্তা জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন, এই দুই সাংবাদিককে শাস্তি দিতে বা মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে যাতে সংবাদ প্রচার করতে না পারেন, সে জন্য এই নৈশভোজের নাটক সাজানো হয়েছিল।

মিয়ানমার সরকার যা বলছে
মিয়ানমার সরকার বরাবরই রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযানকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ইনদিনে গণহত্যা নিয়ে তদন্ত শেষে পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, গ্রামের যেসব লোক ও নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন আইন লঙ্ঘন করে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংবাদিকদের প্রসঙ্গে সরকার বরাবরই বলে আসছে, অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্টস (দাপ্তরিক গোপনীয়তা আইন) ভঙ্গ করার অভিযোগে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়।

গত বছরের আগস্টে রাখাইনে তল্লাশি চৌকিতে হামলাকে কেন্দ্র করে রাজ্যটিতে অভিযান শুরু করে দেশটির সেনাবাহিনী ও পুলিশ। এই অভিযান শুরুর পর প্রাণ বাঁচাতে সাড়ে ছয় লাখের বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়। তাদের প্রায় সবার অভিযোগ, মিয়ানমারের বাহিনী রাখাইনে হত্যা, গণহত্যা, ধর্ষণ, লুটতরাজ ও অগ্নিসংযোগ করেছে। তবে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ভাষ্য, তারা ‘সন্ত্রাসের’ বিরুদ্ধে লড়ছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here