স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগ বিবেচনায় নিতে হবে

0
80

২৫ আগস্টের পর থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ৬ লাখ ৩ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এখনো রোজই আসছে। আগে আসা নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত রোহিঙ্গাসহ বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা ৮ লাখ ১৫ হাজার। এসব তথ্যের উৎস ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন অব মাইগ্রেশন (আইওএম)। আর এ দেশে আসা রোহিঙ্গারা প্রায় সবাই অবস্থান করছে দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। প্রাণভয়ে, সম্পদ ও সম্ভ্রম হারিয়ে নিরুপায় হয়ে এ দেশে এসেছে তারা। আমাদের সরকার এই মানবিক বিপর্যয়ে প্রশংসনীয় সাড়া দিয়েছে। নৈতিক ও বৈষয়িক সহায়তা দিচ্ছে পৃথিবীর বহু দেশ, আন্তসরকারি সংস্থা (আইজিও), বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) এবং বাংলাদেশের সব দল–মতের জনগণ। সরকার তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর জন্য নিচ্ছে বিভিন্ন প্রচেষ্টা। পাশাপাশি প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে সব হারানো রোহিঙ্গাদের এ দেশে অবস্থানকে যতটা সম্ভব স্বাচ্ছন্দ্য দিতে। বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি কাজ করছে সেনাবাহিনী। আইজিওগুলো সরাসরি বা কোনো এনজিওর মাধ্যমে দিচ্ছে মানবিক সেবা। আশা করা যায়, এটা দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে। তবে মিয়ানমারে তাদের প্রত্যাবাসন খুব দ্রুত হবে এমন মনে হয় না।

সেটা যা-ই হোক, এ কাজটি আরও সুচারুভাবে করতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিরঙ্কুশ সহযোগিতা প্রয়োজন। আর তাদের আন্তরিক সহযোগিতা পেতে হলে রোহিঙ্গা আগমনে এ অঞ্চলের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বা হয়ে চলছে তার কিছুটা নিরসনের প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এ সমস্যা বহুবিধ। এর চাপ গোটা দেশের অর্থনীতিতে। তবে তারা যে অঞ্চলটিতে মূলত বসবাস করছে, ক্ষতির ব্যাপকতা সেই উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায়। এ দুটো উপজেলার জনসংখ্যা পাঁচ লাখের মতো। আর এর চেয়ে অনেক বেশিসংখ্যক রোহিঙ্গা ইতিমধ্যে এখানে বসবাস করছে। ক্ষতির বিবরণ পত্রিকায় কলাম লিখে হিসাব দেওয়া একরকম অসাধ্য কাজ। শুধু প্রধান সমস্যাগুলোর দিকে একটু নজর দেওয়া যায়।

প্রথমত আসতে হয় রোগব্যাধির কথা। রাখাইন রাজ্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মান আমাদের অনেক পেছনে। আর তাও রোহিঙ্গারা তেমন পেত বলে মনে হয় না। সে কারণেই নতুন আসা রোহিঙ্গাদের এ পর্যন্ত যতটুকু স্বাস্থ্য পরীক্ষা হয়েছে তার মাঝে আছে বেশ কিছু টিবি, ম্যালেরিয়া, হাম, জন্ডিস, এইডস, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত নারী, পুরুষ, শিশু। আসার পরপরই সবার পরিষ্কার পানির ব্যবস্থা করা যায়নি বলে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছে ডায়রিয়ায়। রোহিঙ্গাদের মাঝে স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন টিকাদান কর্মসূচি চলছে। তবে আছে অনেক ছোঁয়াচে রোগ। সে পরিপ্রেক্ষিতে স্থানীয় লোকজনের স্বাস্থ্যসেবা দিতে উখিয়া ও টেকনাফে বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের মান ও পরিসর জরুরিভাবে বাড়ানো দরকার। এমনিতেই এ দুটো উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোহিঙ্গাদের ভিড় স্থানীয় বাসিন্দাদের চেয়ে অনেক বেশি। এনজিও এবং সরকার নিযুক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন। সেটা আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনের মাঝে কোনো ছোঁয়াচে রোগ যাতে ছড়িয়ে পড়তে না পারে, সে জন্য সম্ভাব্য প্রতিকারের ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। তারপর থাকছে গোটা কক্সবাজার জেলার স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে দুটো কথা। দেখা গেছে, মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অথচ ২০০৮ সাল থেকে কক্সবাজারে একটি মেডিকেল কলেজ চলছে সেখানকার আগের ২৫০ শয্যা হাসপাতালকে কেন্দ্র করে। এখনো নিজেদের হাসপাতাল হয়নি। এই জেলা শহর দেশের পর্যটনের সর্বাধিক আকর্ষণীয় স্থান, লবণ ও চিংড়ি চাষ আর সামুদ্রিক মাছ আহরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে করছে সমৃদ্ধ। তাদের স্বাস্থ্যসেবার এই হাল। আর এই শহর থেকেই রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনা সমন্বয় চলছে। অথচ এখানকার স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাই উপেক্ষিত।

এমনিতে উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় বেশ কিছু ধনী লোক থাকলেও সাধারণ মানুষ শ্রমজীবী। তারা চিংড়ি, লবণ বা কৃষিজমিতে কাজ করে। কেউ করে সমুদ্রে মাছ ধরার কাজ। চোরাচালানের সঙ্গেও জড়িত আছে কিছু। তবে তারা শ্রমিকই। ধরা পড়লে জেল খাটে তারাই। আসল নায়কেরা থাকে নেপথ্যে। যাহোক, এই শ্রমজীবী লোকজন এখন প্রবল এক প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ বেআইনিভাবে শ্রমবাজারে প্রবেশ করায় শ্রমের মূল্য কমে গেছে অস্বাভাবিক হারে। এটা স্থানীয় লোকজনের মাঝে ক্ষোভ সৃষ্টি হওয়ার একটি কারণ হতে পারে। শিবিরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের সব প্রয়োজন না মিটলেও মোটামুটি চলে যাওয়ার কথা। ১৯৯২ সালে আসা অবশিষ্ট শরণার্থীরা দুটো শিবিরে আছে। সেখানে তাদের ২২৬০ ক্যালরি পরিমাণ শক্তি পেতে পারে এবং জ্বালানি দেওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। এখন চলমান বাজারমূল্যে নগদ টাকা দেওয়া হয়। শিবিরে স্থাপিত দোকান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সংগ্রহ করার কথা। অনিবন্ধিত ও এবার আসা রোহিঙ্গাদেরও ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হচ্ছে যথেষ্ট পরিমাণেই। তবে দ্রুত শিবির নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা প্রয়োজন। তারা ভিনদেশের নাগরিক। আমরা তাদের জনবহুল এ দেশের শ্রমবাজারে ঢুকতে দিতে পারি না। এর জন্য বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে। আর তা নিতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। যারা কাজে যায়, তাদের পাশাপাশি নিয়োগকারীদেরও সাজার ব্যবস্থা করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে। জনসচেতনতা বাড়ানোও দরকার।

কক্সবাজার থেকে টেকনাফগামী রাস্তাটি যথেষ্ট প্রশস্ত নয়, আর আঁকাবাঁকাও। তাই ইদানীং ব্যাপক যানজট হচ্ছে। আর তা হচ্ছে ত্রাণ পরিবহন থেকে ভিআইপি গমনাগমনসহ এ–জাতীয় অনেক কাজে। উখিয়া-টেকনাফে সংযোগ সড়কগুলোতেও একই ধরনের চাপ। সুযোগ বুঝে কিছুসংখ্যক পরিবহন ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে। দ্বিগুণ ভাড়া নিচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোগুলো। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ছে। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত অঞ্চলের হাটবাজারগুলো জনাকীর্ণ। অন্য যেকোনো স্থানের চেয়ে এখানে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি। অথচ স্থানীয় শ্রমজীবী মানুষের আয় গেছে কমে। তাদের একটি অংশ অবশ্য এসব ব্যবসায় নেমেছে। পাশাপাশি নেমেছে রোহিঙ্গারাও। এটাও আইনসম্মত নয়। তাহলে স্থানীয় দরিদ্র শ্রেণির লোকজন করবেটা কী? জানা যায়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ অঞ্চলে অতিরিক্ত কিছু বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা নিচ্ছে। এটাকে স্বাগত জানাতে হয়। তবে বিধবা বা বয়স্ক না হলে তো সে ভাতা পাবে না। আর ভাতার পরিমাণও তেমন বেশি কিছু নয়। দরিদ্র শ্রেণির জন্য একটি বিশেষ ভিজিএফ কর্মসূচি চালানোর প্রস্তাবও অযৌক্তিক বলা যাবে না। দ্রব্যমূল্যের চাপ বহন করার জন্য প্রয়োজন ছিল শ্রমজীবী মানুষের আয় বৃদ্ধি। আর এটা সম্ভব রোহিঙ্গাদের শ্রমবাজার ও ব্যবসা থেকে সম্পূর্ণ বিরত রাখলে। এটা নৈতিক ও আইনসংগত। আগেও ক্যাম্প ইনচার্জের লিখিত অনুমতি ব্যতীত এরা শিবির এলাকার বাইরে যেতে পারত না। আর সে অনুমতিও দেওয়া হতো উন্নত চিকিৎসা বা এ ধরনের কোনো মানবিক কাজ বিবেচনায়। এমনটা করলে স্থানীয় ও অস্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক মজবুত হবে।

 রোহিঙ্গাদের জ্বালানি কাঠের প্রয়োজনে এ অঞ্চলের বনভূমি দ্রুত উজাড় হয়ে যাচ্ছে। আর এ কাঠ ব্যবসায় নেমে গেছে স্থানীয় ও অস্থানীয় সবাই। টেকনাফের নয়াপাড়া থেকে উখিয়ার কুতুপালং পর্যন্ত রাজপথে হাজার হাজার মণ লাকড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রকাশ্যে। বিকল্প জ্বালানির ব্যবস্থা দ্রুত না করে এটা বন্ধ করারও উপায় নেই। সেদিকে জরুরি মনোযোগ সময়ের দাবি। এ উপত্যকার পরিবেশের ভারসাম্য দ্রুত ফিরিয়ে আনতে ক্ষতিগ্রস্ত সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নতুনভাবে ও অন্যান্য ভূমিতে সামাজিক বনায়নের ব্যাপক উদ্যোগ আবশ্যক। এ ধরনের বনায়ন কর্মসূচি স্থানীয় কিছু লোকের জন্য কর্মসংস্থানেরও সহায়ক হবে।

আগে শিবির অভ্যন্তরে ছোটখাটো কোনো মেরামতকাজে রোহিঙ্গাদের নিয়োগ দেওয়া হতো। বাইরের কোনো কাজে কোনো অবস্থাতেই নয়। এখন গোটা ত্রিশেক এনজিও কাজ করছে বিভিন্ন শিবির ঘিরে। কাজ চলছে বাংলাদেশ সরকারসহ আইজিওগুলোর। তাদের অনেক অস্থায়ী লোক দরকার। এ ধরনের সব কাজে যোগ্যতা থাকলে শুধু স্থানীয় লোকজনই নিয়োগ দেওয়ার জন্য বাধ্য করার বিধান করা সংগত। জাতীয় পর্যায়ের সমন্বয় কমিটি থেকে এ ধরনের নির্দেশনা সময়োপযোগী ও ফলপ্রসূ হবে। এ–জাতীয় পদক্ষেপ প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা ও স্থানীয় সবার জন্য হবে সহায়ক। এ ধরনের একটি পরিবেশ রোহিঙ্গা ব্যবস্থাপনাকে সহজতর ও সফল করবে। রোহিঙ্গাদের আমরা সর্বতোভাবে সহায়তা করব। আর তা করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় লোকজনের প্রতিও করতে হবে সুবিচার।

আলী ইমাম মজুমদার: সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here