১০ বছর হতে চলল পিপিপি স্বপ্ন তেমনভাবে আর বাস্তব চেহারা দেখল না।

0
117
১০ বছর হতে চলল পিপিপি স্বপ্ন তেমনভাবে আর বাস্তব চেহারা দেখল না।

১০ বছর হতে চলল, অবকাঠামো খাতের উন্নয়নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি (পিপিপি) স্বপ্ন তেমনভাবে আর বাস্তব চেহারা দেখল না।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবারই (২০০৯-১০ অর্থবছর) অবকাঠামো উন্নয়নের কিছু বিষয় চিহ্নিত করেছিলেন মুহিত। পিপিপিকে ‘নব উদ্যোগ বিনিয়োগ প্রয়াস’ নাম দিয়ে সেবার তিনি বেশ আশার কথা শুনিয়েছিলেন। আগামী ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও অর্থমন্ত্রী পিপিপি নিয়ে আশার কথা শোনাবেন বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে।

অর্থমন্ত্রী ৯ বছর আগে বলেছিলেন, প্রতিবছর ৩৯ হাজার কোটি টাকা হিসেবে ৫ বছরে ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা পিপিপি উদ্যোগ থেকে পাওয়া যাবে। তাঁর কথায় আস্থাও রেখেছিলেন অনেকে। শুধু মুখের কথা নয়, বাজেটে কোনো বছর ২ হাজার, কোনো বছর ২ হাজার ৫০০, কয়েকবার ৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দও রেখে আসছিলেন তিনি। কিন্তু বেসরকারি খাত এগিয়ে আসেনি বলে টাকাও খরচ হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন সংস্থা পিপিপি কর্তৃপক্ষই পিপিপি নিয়ে সবকিছু দেখভাল করে থাকে। গত বুধবার পিপিপি কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের সভায় পিপিপি নিয়ে এবার নতুন করে আশাবাদী হন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রেস উইংয়ের ফেসবুক পেজের স্ট্যাটাসে ওই দিন জানানো হয়, পিপিপির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে সাফল্যের উদাহরণ সৃষ্টির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী তাগিদ দিয়েছেন।

পিপিপির মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য ৪৭টি প্রকল্প চিহ্নিত করে পিপিপি কর্তৃপক্ষ। জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে ১ হাজার ২৬০ কোটি ডলার বিনিয়োগ দরকার, প্রতি ডলার ৮২ টাকা হিসাবে পরিমাণটি দাঁড়ায় ১ লাখ ৩ হাজার ৩২০ কোটি টাকা।

মোট চিহ্নিত প্রকল্পের মধ্যে দুটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। দুটির চলছে, এর মধ্যে একটি বিদেশি অংশীদারের সঙ্গে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, অন্যটি দেশি অংশীদারদের নিয়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈর হাইটেক পার্ক। এ ছাড়া ১০টি বাস্তবায়নের জন্য বেসরকারি অংশীদারদের সঙ্গে চুক্তি সই হয়েছে।

পিপিপি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বেশির ভাগ প্রকল্প এখনো সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে কয়েকটি অনুমোদিত হয়েছে। কয়েকটিতে উপদেষ্টা নিয়োগ হয়েছে আর কয়েকটি রয়েছে চুক্তির অপেক্ষায়।

পিপিপি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারি ব্যবস্থা, যেখানে জনগণকে সেবা দেওয়ার উদ্দেশে বেসরকারি খাত বিনিয়োগ করে থাকে। এতে সরকারের সঙ্গে বেসরকারি খাতের চুক্তি হয় বা সেবা তৈরির জন্য বেসরকারি খাতকে সরকার নিবন্ধন দিয়ে থাকে, অর্থ সহযোগিতাও দিয়ে থাকে। অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বজুড়েই পিপিপি এখন জনপ্রিয় পদ্ধতি।

নির্মাণ, মালিকানা, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওওটি); নির্মাণ, পরিচালনা ও হস্তান্তর (বিওটি) এবং নির্মাণ, মালিকানা ও পরিচালনা (বিওও)—পিপিপির এ তিন পদ্ধতিই প্রচলিত। পিপিপি আইন, পিপিপি নীতিমালা ও কৌশল, পিপিপি কারিগরি সহায়তা অর্থায়ন নীতিমালা (পিপিপিটিএএফ), পিপিপিটিএএফ কর্মসূচি—সবই হয়েছে গত কয়েক বছরে।

 

পিপিপি নিয়ে আশা-নিরাশা

অর্থমন্ত্রী ২০০৯-১০ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে বলেছিলেন, আগামী পাঁচ বছরে দরকার অতিরিক্ত ১ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা। পিপিপি উদ্যোগে এ বিনিয়োগ ঘাটতি পূরণ করা হবে।

এরপর ‘ব্যক্তি খাতের সম্পৃক্ততায় ব্যাপক গতি পাবে পিপিপি’, ‘সফলভাবে পিপিপি বাস্তবায়ন করতে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত’, ‘আশানুরূপ না হলেও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পিপিপি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। আশা করি, অচিরেই এগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করা যাবে’, ‘অবকাঠামো উন্নয়নে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণে পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নকে উৎসাহিত করব’—বাজেট বক্তব্যে এসব কথা বলে আসছেন অর্থমন্ত্রী।

২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী একটি স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন। সেটি হচ্ছে, ‘পিপিপি বাস্তবায়নে গত ছয়টি বছর আমি অনেক বক্তব্য দিয়েছি। কিন্তু বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নেই।’

পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নে বেসরকারি খাতকে আকৃষ্ট করতে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফিন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) নামে একটি কোম্পানিও গঠন করে সরকার। অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী পদাধিকারবলে এর চেয়ারম্যান। পরিচালনা পর্ষদে আরও ছয়জন সচিব রয়েছেন। বেসরকারি খাতকে এ কোম্পানিও আকর্ষণ করতে পারছে না।

বাংলাদেশ শিল্প ও বণিক সমিতি ফেডারেশনের (এফবিসিসিআই) সভাপতি শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘পিপিপি মডেলটি খুব ভালো। অনেক দেশেই এই মডেলে অবকাঠামো উন্নয়ন সফল হয়েছে। আমরাও পারব, শুধু সময়ের ব্যাপার।’

পিপিপিতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের ওইভাবে এগিয়ে না আসার কারণ জানতে চাইলে এফবিসিসিআই সভাপতি বলেন, কারণ তো আছেই। ব্যবসায় সহজ সূচকে আমাদের অবস্থান এখনো ১৬৭। আগে এর উত্তরণ ঘটাতে হবে।

তবে একেবারেই হতাশ নন পিপিপি কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আফসর এইচ উদ্দিন। গত শুক্রবার তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে সরকার থেকে সরকার পর্যায়ে (জিটুজি) পিপিপি প্রকল্প বাস্তবায়নের গেজেট প্রকাশের পর চীন, জাপান ও সিঙ্গাপুর থেকে ভালো সাড়া পাচ্ছি। জাপানই ৭০০ থেকে ৮০০ কোটি ডলারের বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে।’

সৈয়দ আফসর জোর দিয়ে বলেন, ‘দেশের অবকাঠামো খাতের উন্নয়নের চূড়ান্ত বিকল্প হচ্ছে পিপিপি। এটা শুধু সময়ের ব্যাপার।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here