১১ বছরে পাচার হয়েছে সাড়ে ৬ হাজার কোটি ডলার

0
122

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেছেন, ১১ বছরে (২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত) দেশ থেকে ৬ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার পাচার হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২০০৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পাচার হয়েছে ৫৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর ২০১৪ সালেই পাচার হয়েছে ৯ মিলিয়ন ডলার। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) কাছে এ অর্থ পাচারের তথ্য রয়েছে। এভাবে দেশের অর্থ বাইরে পাচারে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ১৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে মঙ্গলবার তিনি দেশ থেকে অর্থ পাচারের বিষয়ে তথ্য তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন।

রাজধানীর শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা অডিটোরিয়ামে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায় ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, অনেকেই বলছেন দেশের ভেতরে বিনিয়োগের কিছু সমস্যা আছে। তাই বলে ওভার ইনভয়েসিং ও আন্ডার ইনভয়েসিং করে এভাবে দেশের বাইরে অর্থ পাচার করতে হবে? দেশের শিল্পপতিদের শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখেন জানিয়ে তিনি বলেন, ’৭২ সালে দেশে কি ছিল? এক্ষেত্রে তাদের (শিল্পপতি) অবদান ভুলে যাওয়ার নয়। কিন্তু কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানকে এখন দেশের বাইরে থেকে ঋণ নেয়ার অনুমতি দেয়া হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশ ব্যাংকেই ৩৩ বিলিয়ন ডলার পড়ে আছে। ওখানে (দেশের বাইরে) সুদ কম বলে অনেকেই ঋণ নিচ্ছেন।

তিনি বলেন, দেশে অর্থনৈতিক দুর্নীতি সবচেয়ে খারাপ জিনিস। দুর্নীতিতে জড়িত এক হাজার খুচরা দুর্নীতিবাজকে সাজা না দিয়ে মাথাকে (বড় দুর্নীতিবাজ) ধরতে হবে। যদি সমাজে ঢেউ তোলা যায় যে, ‘দুর্নীতি ভালো জিনিস নয়, এটা রুখতে হবে’ তাহলে বিচার করা কঠিন হলেও রোধ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

এদিন সকালে দুদকের প্রধান কার্যালয় প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা এবং দুদকের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে কমিশনের ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কমিশনার ড. নাসির উদ্দীন আহমেদ ও কমিশনার এএফএম আমিনুল ইসলাম। পরে কমিশনের সামনের সড়ক-দ্বীপে শান্তির প্রতীক পায়রা অবমুক্ত করেন তারা। এ সময় দুদক চেয়ারম্যান বলেন, কমিশনের ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর শুভলগ্নে দেশের সাধারণ জনগণ, সুশীল সমাজ, সরকারি কর্মকর্তা, গণমাধ্যমসহ সবার কাছে অনুরোধ- আসুন, আমরা জনগণের কল্যাণে সম্মিলিতভাবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করি। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, আগামী নির্বাচনে যারা অংশ নিতে চান, তারা নির্বাচন কমিশনে যে হলফনামা জমা দেবেন, সেখানে অবশ্যই সম্পদের সঠিক হিসাব দিতে হবে। মিথ্যা তথ্য দিলে তা খতিয়ে দেখা হবে এবং এক্ষেত্রে আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে। পানামার পর প্যারাডাইস পেপারস কেলেঙ্কারিতে জড়িত বাংলাদেশিদের বিষয়ে অনুসন্ধান প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আমরা তাদের বিষয়টা খতিয়ে দেখছি। দুদকের আইনে অনুসন্ধানযোগ্য হলে অনুসন্ধান হবে। না হলে এনবিআরসহ আর যেসব প্রতিষ্ঠান এ নিয়ে তদন্ত করতে পারে তাদের কাছে দুদক থেকে সুপারিশ করা হবে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য।

এদিকে, দুদকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন আরও বলেন, ১৯৭৪ সালে জাদরেল সিএসপি বোরহানউদ্দিনকে তৎকালীন দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার (দুর্নীতি দমন ব্যুরো) প্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধু সরকার নিয়োগ দিয়েছিলেন। তিনি দুর্নীতি দমনে একটা বড় ধরনের নাড়া দিয়েছিলেন। বর্তমান দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদের ভেতর বোরহানউদ্দিনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই।

তিনি বলেন, বাজার অর্থনীতিতে উন্নয়নের পাশাপাশি দুর্নীতিপরায়ণরা লুটপাট করতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক। এখানেই দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম দরকার। দেশের মোবাইল ব্যাংকিং এবং ই-কমার্স ক্ষেত্রে নিয়ামক পরিমণ্ডল না থাকায় দুর্র্নীতি হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, টাকা পাঠান বা তোলেন দুই ক্ষেত্রেই শতকরা ২ টাকা কেটে রাখা হয়। এখন মোবাইল ব্যাংকিং না বলে ফান্ড ট্রান্সপার বলা হচ্ছে। এক মাস আগে বাংলাদেশ ব্যাংক এ ধরনের কয়েক লাখ অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিয়েছে। অনেক এজেন্টের লাইসেন্স বাতিল করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ায় মোবাইল ফান্ড ট্রান্সফারের ক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ফিরলেও ই-কমার্সের মাধ্যমে বিত্তবানরা ট্যাক্স না দিয়েই দ্রব্যসামগ্রী ক্রয় করছেন। বাংলাদেশ ছাড়া অন্য কোনো দেশে এ জাতীয় ঘটনা বিরল।

তিনি বলেন, দুর্নীতি দমন বা প্রতিরোধে একটি নিয়ামক পরিমণ্ডল দরকার, শুধু মামলা করে আর বিচার-আচার করে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব হবে না, দুর্নীতি দমন করতে হলে বড় ধরনের নাগরিক সচেতনতা প্রয়োজন। প্রতিটি দেশেই নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ রয়েছে- পাশাপাশি রয়েছে শক্তিশালী গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ। আমাদের দেশেও গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজ রয়েছে । কিন্তু তারাও বিভক্ত। তবে দুর্নীতির ক্ষেত্রে যদি সুশীল সমাজ ও মিডিয়া সোচ্চার হয় তবে অবশ্যই দুর্নীতিবিরোধী ব্যাপক গণসচেতনতা সৃষ্টি হবে।

ড. ফরাসউদ্দিন বলেন, দুদকের উচিত দুর্নীতির ঘটনা ঘটার যে সব পদ্ধতি রয়েছে সেগুলো নির্ণয় করে তা অঙ্কুরেই বিনাশ করা। এক্ষেত্রে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক ও দুদক যৌথভাবে প্রাতিষ্ঠানিক টিম গঠন করে অর্থনৈতিক দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে পারে। দুর্নীতিতে জড়িত ছোট দুর্নীতিবাজ না ধরে মাথা ধরার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন- অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন কিংবা অন্য যে কোনো প্রকার উন্নয়ন টেকসই করতে হলে দুর্নীতি দমন ও প্রতিরোধ করতেই হবে।

দেশে রেগুলেটরি অথরিটি ছাড়া বাজার অর্থনীতিতে যাওয়ার ফলে চুরি, ডাকাতি ও দুর্নীতি বাড়ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাজার অর্থনীতির কারণে দুর্নীতিবাজ লুটেরা বেশি সক্রিয় হয়েছে।

তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড, মোহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করে বলেন, ১৯৯৯ সালে আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকে ছিলাম, তখন গ্রামীণ ব্যাংকের এমডি প্রফেসর ইউনূস ও ডিএমডি খালেদ শামসের বয়স ৬০ বছর পেরিয়ে গেছে। গ্রামীণ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী বয়স ৬০ পেরোলে কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবসরে যেতে হবে। আমি ইউনূস ও শামসকে বললাম, আপনারা অবসরে যান। শামস অবসরে গেলেন। কিন্তু প্রফেসর ইউনূস গেলেন না। বরং গ্রামীণ ব্যাংকের বোর্ড সভায় অনুমোদন করে নেয়া হল প্রফেসর ইউনূস আজীবন এমডি থাকবেন। এ দুর্নীতির প্রতিকার কি দুদকের কাছে জানতে চান ফরাসউদ্দিন। তিনি একই গ্রুপ থেকে প্রকাশিত প্রথম সারির দুটি পত্রিকা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ইঙ্গিত করে বলেন, তারা এক পক্ষের দুর্নীতি দেখে আরেক পক্ষের দুর্নীতি দেখে না। এটাও এক ধরনের দুর্নীতি বলে তিনি মনে করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, উন্নয়ন এবং দুর্নীতি সম্ভবত যমজ ভাই। তবে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক যদি সঠিকভাবে কাজ করে তাহলে অবশ্যই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব। তিনি বলেন, সরকারি কর্মকর্তা, সিভিল সোসাইটি, মিডিয়াসহ আমরা সবাই যদি সম্মিলিতভাবে চেষ্টা করি তাহলে দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা অসম্ভব নয়।

ইকবাল মাহমুদ দুদক কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, তদন্তের গুণগত মান বৃদ্ধিতে কমিশন যেসব নির্দেশনা দিয়েছে তা অনুসরণ করতে হবে; কোনো মানুষকে হয়রানি করা যাবে না। প্রতিটি অনুসন্ধান বা তদন্ত হতে হবে আইন ও বিধি-বিধানের আলোকে। যাতে অভিযোগটি আদালতে প্রমাণ করা যায়। আমরা এমন কোনো কাজ করতে চাই না, যে কাজে কোনো ফল আসবে না অথবা যে কাজ আমরা শেষ করতে পারব না বা আদালতে প্রমাণ করতে পারব না।

দুদকের ব্যর্থতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন- সেই ব্যর্থতা আমরা নিয়মিত পর্যালোচনা করি যাতে আরও পরিশুদ্ধভাবে কাজ করতে পারি। আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি, দুর্নীতি ঘটার আগেই তা প্রতিরোধ করতে হবে। এ কারণেই কমিশন দুর্নীতি প্রতিরোধে অধিকতর গুরুত্ব দিচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেক সমালোচকদের সঙ্গে আমিও একমত যে, বড় দুর্নীতিবাজদের কাছে হয়তো আমরা এখনও যেতে পারিনি। তবে সবাইকে এটাও মনে রাখতে হবে, পরিবেশ-পরিস্থিতি দেখে যদি আমরা এদের ধরতে হাত বাড়াই, তাহলে এ হাত তুলে আনব না, মাঝ পথে থেমে যাব না।

অনুষ্ঠানে দুদক কমিশনার ড. নাসিরউদ্দীন আহমেদ বলেন, সরকারি সেবা নিতে গিয়ে মানুষের চোখে কান্নার পানি আমরা দেখেছি। আমরা এ অবস্থা থেকে উত্তরণে গণশুনানিসহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছি। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- দুদক কমিশনার (তদন্ত) এএফএম আমিনুল ইসলাম, সচিব ড. শামসুল আরেফিন ও প্রতিরোধ বিভাগের মহাপরিচালক জাফর ইকবাল।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here