৮০ শতাংশ গাড়িতে ‘স্পিড গভর্নর’ হয়নি

0
63
৮০ শতাংশ গাড়িতে ‘স্পিড গভর্নর’ হয়নি

দেশের মহাসড়কগুলোয় ৯০ শতাংশ গাড়িই গতিসীমা না মেনে বেপরোয়াভাবে চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট। অথচ গতিসীমা নিয়ন্ত্রণে গাড়িতে ‘স্পিড গভর্নর’ সংযোজনের সিদ্ধান্ত হলেও ৮০ শতাংশ দূরপাল্লার গাড়িতেই তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানিয়েছে খোদ মালিক সমিতি।

‘স্পিড গভর্নর’-এ গাড়ির সর্বোচ্চ গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া থাকে। গতিসীমা অতিক্রম করলেই গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।

এ ছাড়া মহাসড়কে একক দুর্ঘটনায় বেশি প্রাণহানির অন্যতম প্রধান কারণ অনুমোদন ছাড়াই গাড়ির বাড়তি অংশ সংযোজন, অতিরিক্ত যাত্রী ও পণ্য পরিবহন। আবার ২০১৫ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ করা হলেও দেশের ২২টি মহাসড়কেই তিন চাকার হালকা যানবাহন চলাচল এখনো বন্ধ হয়নি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতির তথ্যেই এ চিত্র উঠে এসেছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটে গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৯৯৮ থেকে ২০১৫ সালের সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করে তারা অনুসন্ধানে দেখতে পায়, অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানো ও চালকদের নিয়ম না মেনে গাড়ি চালানোয় ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা ঘটছে। ২০১৫ সালের পর দুই বছরে মহাসড়কে গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য হাইওয়ে পুলিশ, বিআরটিএ মাঝে মধ্যে তৎপরতা চালালেও ধারাবাহিকতা রক্ষা হয়নি।

আর বিআরটিএতে ওই দিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত তাদের হিসাবে দেশে দুই হাজার ৩৮৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় দুই হাজার ৩৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটে, আহত হয় ১০ হাজার ব্যক্তি।

এ ছাড়া নিরাপদ সড়ক চাই-এর (নিসচা) কাছে তথ্য চেয়ে জানা গেছে, গত বছরের ১২ মাসে দেশে তিন হাজার ৩৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় পাঁচ হাজার ৬৪৫ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। আর বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি বলেছে, একই বছরে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেছে সাত হাজার ৩৯৭ জনের।

দেশে দিনে বিভিন্ন জেলায় গড়ে ১৩টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ ২০১৫ সালের তথ্যে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮৩ সালের মোটরযান অধ্যাদেশেই গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণে গভর্নর সিল সংযোজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। পরে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদ ২০১৫ সালের ১০ অক্টোবর এক সভায় মহাসড়কে যানবাহনের সর্বোচ্চ গতিসীমা ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করে দেয়। এ জন্য গাড়ির ফিটনেস পরীক্ষার সময় গভর্নর সিল সংযোজন করা হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বিআরটিএকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে ‘স্পিড গভর্নর’ সংযোজন করে গভর্নর সিল নেওয়ার বিষয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের জানানো হয় যে মাত্র ২০ শতাংশ দূরপাল্লার গাড়িতে তা বসানো হয়েছে।

এ ছাড়া জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা পরিষদের সভায় মহাসড়কে ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন বা বাইলেন নির্মাণ, মহাসড়কের টার্নিং পয়েন্টে বিভাজক নির্মাণ এবং চালকদের পাঁচ ঘণ্টায় কমপক্ষে ৩০ মিনিট বিশ্রাম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছিল। এগুলোর কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি বলে বলেছেন সংশ্লিষ্টরা।

কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে গত কয়েক দিন ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের মাধবপুর, শায়েস্তাগঞ্জ ও বাহুবল এবং ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের তথ্য সংগ্রহ করে দেখা গেছে, এসব মহাসড়কে অটোরিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ তিন চাকার যানবাহন চলা অব্যাহত আছে।

ঢাকা সিএনজি অটোরিকশা শ্রমিক সমন্বয় পরিষদের মহাসচিব মো. হানিফ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২২টি মহাসড়কেই নিষিদ্ধ হালকা যানবাহন যে চলছে তার নেপথ্যে স্থানীয় সিন্ডিকেটই দায়ী। পুলিশ চাঁদা নিয়ে চলতে দিচ্ছে।’

হানিফ খোকন জানান, বিভিন্ন মহাসড়কে বাইলেন বা ধীরগতির আলাদা লেন চালু করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তা হয়নি।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য মতে, বিভিন্ন মহাসড়কের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বেশি দুর্ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁসংলগ্ন এই মহাসড়কে।

প্রসঙ্গত, গত ৭ মার্চ সোনারগাঁর মল্লিকেরপাড়ায় তিশা পরিবহনের বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে দুজনের প্রাণ যায়। এর আগে ২৬ ফেব্রুয়ারি লরির সঙ্গে সংঘর্ষে সিডিএম ট্রাভেলসের বাস (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-০৮২৬) দুমড়ে-মুচড়ে ১০ জনের প্রাণহানি ঘটে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট বলেছে, সিডিএম ট্রাভেলসের বাসের দুর্ঘটনা নিয়ে বুয়েটের তদন্তদল সেখানে গিয়ে জানতে পারে, বাসটি চালানো হচ্ছিল ১০০ কিলোমিটার গতিতে। এটির ফিটনেস সনদ ২০১৫ সালের পর আর যাচাই করা হয়নি। বাসটির মালিকানা বারবার বদল হয়েছে। তাতে গভর্নর সিল ছিল না।

কালের কণ্ঠ থেকে মালিকের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেও গত বহস্পতিবার পর্যন্ত তাঁর হদিস পাওয়া যায়নি। বিআরটিএর কাছেও এসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই বলে তারা জানিয়েছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোয়াজ্জেম হোসেন গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গাড়ির তুলনায় প্রকৃত চালক নেই। তারা স্টিয়ারিং হাতে নিয়েই বেপরোয়া চলতে থাকে।’

বিআরটিএ সূত্রে জানা গেছে, দেশে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত গাড়ি আছে ৩৩ লাখের বেশি। এর মধ্যে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্মার্ট কার্ড লাইসেন্স আছে মাত্র ১৯ লাখ ২২ হাজার ৯৯ জন চালকের।

এদিকে ভারী যানবাহন চালকদের ওপর পরিচালিত ব্র্যাকের গবেষণার তথ্য হচ্ছে—প্রত্যেক চালক দৈনিক গড়ে ৯ দশমিক ২ ঘণ্টা যানবাহন চালায়। কোনো সময় গাড়ি চালাতে হয় ১৮ ঘণ্টা পর্যন্ত। অথচ শ্রম আইন অনুসারে একজন চালকের কর্মঘণ্টা ৮ ঘণ্টা।

এ বিষয়ে বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, মালিকরা বেশি ট্রিপ দিতে চালককে দিয়ে বেশি সময় গাড়ি চালিয়ে নিচ্ছেন। এর জন্য বেশি গতিতে চালাতে হচ্ছে, যানজটে আটকে সময় নষ্ট হলে সময় ঘাটতি পূরণের জন্য চালক চাপে থাকেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, মালিকরা পরিবহন শ্রমিকদের নিয়োগপত্রও দেন না। বেকারত্ব থেকে রেহাই পেতে ওস্তাদের কাছে থেকে গাড়ি চালনা শিখেই বড় গাড়ি চালাচ্ছে বেশির ভাগ চালক—এটা ঠিক। তাদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

গভর্নর সিল বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান ও সোহাগ পরিবহনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক তালুকদার বলেন, ‘আগে গতিসীমা ছিল ১২০ কিলোমিটার। এখন ৮০ কিলোমিটার। আমার কম্পানির গাড়িগুলোয় গতি নিয়ন্ত্রণে গভর্নর সিল সংযোজন করা হয়েছে।’

 

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here