একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘রাতে ভোট’ ও অনিয়মের অভিযোগ

0
33
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘রাতে ভোট’ ও অনিয়মের অভিযোগ

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ‘রাতে ভোট’ ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সকল নির্বাচন বয়কট করছে বিএনপি। সমপ্রতি শেষ হওয়া চার পর্বের স্থানীয় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা নির্বাচন বর্জন করেছে দলটি। দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয় তৃণমূলের ১৮১ জন নেতাকে যাঁরা ছিলেন দলের জেলা-উপজেলা পর্যায়ের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে। কিন্তু এই বহিষ্কৃতদের ভাগ্য তাদের সহায় ছিল না। তারা বিজয়ী হওয়ার আশায় দলকে চ্যালেঞ্জ করে নির্বাচনে গেলেও জয় পেতে ব্যর্থ হন। তারা দুই কূলই হারিয়েছেন।

দল তাদের বের করে দিয়েছে আবার নির্বাচনেও জিততে পারেননি। এখন দলের স্থানীয় পর্যায়ের সাধারণ নেতা-কর্মীরাও তাদের এড়িয়ে চলছেন। তাদের পদ-পদবিগুলোতে অন্যরা স্থান করে নেওয়ার জন্য কেন্দ্রে লবিং করছেন। এদিকে বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, দুই কূল হারিয়ে বহিষ্কৃতরা আবার দলে ফেরার জন্য প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের জন্য ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বরাবর আবেদনও করেছেন। বহিষ্কৃত বগুড়া জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মীর শাহে আলমসহ কয়েকজন লিখিত আবেদনের পর নেতাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে অনুনয়-বিনয় করছেন। তবে বিএনপি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বহিষ্কৃতদের আর দলে ফিরিয়ে নেওয়া হবে না। তাদের শূন্য স্থান পূরণ করা হবে অন্য ত্যাগী নেতাদের পদায়ন করে।

জানা গেছে, কেবল নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী নেতাই নন, তাদেরকে সহযোগিতাকারী নেতাদেরও চিহ্নিত করে অনেকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। বাকিদেরও নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

বিএনপিসূত্র জানায়, অধিকাংশ উপজেলায় চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানের দুটি পদেই প্রার্থী হন স্থানীয় বিএনপি নেতারা। তারা বিএনপির উপজেলার সভাপতি, সহসভাপতি, সাধারণ সম্পাদক বা গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও হলফনামায় নিজেদের ‘স্বতন্ত্র’ হিসেবে পরিচয় দেন। বহিষ্কৃৃত কোনো কোনো নেতা ভোটের সময় প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ভোটের মাঠ তাদের পক্ষে আছে, তারা জিতবেন। জয়ী হলে বিএনপি থেকে ফুলের মালা দিয়ে তাঁদের বরণ করা হবে। কিন্তু সেই আশা আর পূরণ হয়নি। তারা এখন পরাজয়ের কারণ হিসেবে বলছেন, নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি, কারচুপি হয়েছে, ব্যালট ছিনতাই হয়েছে, রাতে ভোট হয়েছে এবং ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে আসেনি।

চার ধাপে ৪৪৪টি উপজেলার মধ্যে শুধু চারটি উপজেলায় পাস করেছেন বিএনপি থেকে বহিষ্কৃতরা। তারা সবাই ছিলেন সিটিং উপজেলা চেয়ারম্যান। নির্বাচিত চারজন হলেন: হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় দলের সভাপতি সৈয়দ মো. শাহজাহান, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলায় জেলা বিএনপির সহসভাপতি ফারুক আহমেদ, বান্দরবানের আলী কদম উপজেলায় আবুল কালাম ও টাঙ্গাইলের নাগরপুরে আবদুস সামাদ।

চার ধাপে ৪৪৪টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দেওয়া ফলাফলে দেখা গেছে—১৩৬টি উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে বিজয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। ৩০৪টি উপজেলায় জিতেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা। এর মধ্যে ১০৭ জন বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) ৩টিতে জয়লাভ করেছে। অন্যদিকে ১৪ দলের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি-জেপির প্রার্থী একটি উপজেলায় জয়ী হয়েছেন। ৩০ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বীরা ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছেন।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, ২৯ ডিসেম্বর ‘রাতের ভোট’ ও ব্যাপক কারচুপির কারণে দলের স্থায়ী কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে এ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপিসহ ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোট। ফলে উপজেলা নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু বারবার নিষেধ করার পরও বিভিন্ন উপজেলায় চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা অংশ নেন। তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলেও তারা তা অগ্রাহ্য করেন। এছাড়া কোনো কোনো নেতা অন্য দলের প্রার্থীকে সমর্থন দেন। ফলে দলের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদের দলের সর্বস্তরের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাদের আর ফিরিয়ে নেওয়ার কথা দল ভাবছে না। কারণ যারা এই দুঃসময়ে দলের আদেশ নির্দেশ মানেন না তারা দলে থাকার অধিকার রাখেন না।

উল্লেখযোগ্য বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতারা হলেন:হবিগঞ্জের মো. শাহজাহান, মনজুর উদ্দিন আহমদ শাহীন, চুনারুঘাটের এস লিয়াকত হাসান, জেলা কৃষক দলের মাহবুবুর রহমান আওয়াল, মাধবপুরের আব্দুল আজিজ, বানিয়াচং উপজেলার তানিয়া খানম, সুফিয়া আক্তার হেলেন, বাহুবলের নাদিরা খানম, লাখাই যুবদলের তাউস আহমদ, সিলেটের মাজহারুল ইসলাম ডালিম, জিল্লুর রহমান সোয়েব, শামছুল আলম, মাওলানা রশীদ আহমদ, সোহেল আহমদ চৌধুরী, আব্দুর রহমান খালেদ, আশরাফ উদ্দিন রুবেল, নাজমা বেগম, স্বপ্না শাহীন, আবদাল মিয়া, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের খালেদুর রশীদ ঝলক, যুবদল নেতা সুন্দর আলী, জকিগঞ্জের ইয়াহইয়া বেগম, ছাত্রদলের ফজলে আশরাফ মান্না, গোয়াইনঘাটের লুত্ফুল হক খোকন, শাহ আলম স্বপন, জয়নাল আবেদীন, মহিলা দলের খোদেজা বেগম কলি, জৈন্তাপুরের আব্দুল হক, বিশ্বনাথের মিসবাহ উদ্দিন আহমদ, আহমদ নূর উদ্দিন, জুবেল আহমদ, নুরুন্নাহার ইয়াসমিন, কোম্পানীগঞ্জের লাল মিয়া, আবিদুর রহমান, ফেঞ্চুগঞ্জের ওয়াহিদুজ্জামান সুফী, মনির আলী নানু মিয়া, হারুন আহমদ চৌধুরী, জহিরুল ইসলাম মুরাদ, সাহেদ আহমদ, ফেরদৌসী ইকবাল, বালাগঞ্জের গোলাম রব্বানী, সেবু আক্তার মনি, বগুড়ার মাছুদুর রহমান (হিরু মণ্ডল), টিপু সুলতান, রাফি পান্না, সারিয়াকান্দির গোলাপী বেগম, সোনাতলার জিয়াউল হক লিপন, রঞ্জনা খান, নয়নতারা, শিবগঞ্জের মোছা. বিউটি বেগম, নন্দীগ্রামের আলেকজান্ডার, এ কে আজাদ, কাহালুর শাহাবুদ্দিন, মমতাজ আরজু কবিতা, ধুনটের আখতার আলম সেলিম, আলিমুদ্দিন হারুন, সদর থানার মোছা. নাজমা আক্তার, মাহিদুল ইসলাম গফুর, শাজাহানপুরের আবুল বাশার, জাহেরুল ইসলাম, সুলতান আহম্মেদ, মোছা. জুলেখা বেগম, মোছা. কোহিনুর বেগম, রহিমা খাতুন মেরি, ডা. মেহেরুল আলম মিশু, আনোয়ার এহসানুল বাশার জুয়েল, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সুরাইয়া জেরীন রনি, গাবতলীর তাহমিনা আকতার রুমা, শ্যামল সরকার, নওগাঁর নিয়ামতপুরের সদরুল আমিন চৌধুরী, মোছা. মনোয়ারা বেগম, মান্দার আহসান হাবীব, সাপাহার উপজেলার জয়নুল আবেদীন, আশরাফুল ইসলাম, ধামইরহাটের মোছা. শাহিনা, রাঙ্গামাটির কাপ্তাইয়ের নূর নাহার বেগম, নানিয়ারচরের নুরুজ্জামান হাওলাদার, রাঙ্গামাটির রনো চাকমা, বান্দরবানের আবদুল কুদ্দুছ, আবুল কালাম, শিরিন আক্তার, রুমা উপজেলার জিমসম লিয়ান বম, হামিদা চৌধুরী প্রমুখ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here