১৯৪৭ ট্র্যাজেডির অগ্রপশ্চাৎ

0
55

১৯৪৭ সাল। ভারতবর্ষ থেকে পাততাড়ি গোটাল ব্রিটিশ উপনিবেশ। তিনটি খণ্ডে দুটি রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল অখণ্ড ভারত। ভাগ হলো বাংলা। অসংখ্য মানুষ আজন্মের ভিটামাটি ছেড়ে গেল নিজের নতুন দেশের খোঁজে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান—এই তিন রাষ্ট্রের সম্পর্ক ও পরবর্তী রাজনীতির বড় নিয়ামক হয়ে উঠল দেশভাগ। ৭০ বছর পর ফিরে দেখা


আধুনিক ভারতবর্ষের ইতিহাসে দুটি ট্র্যাজেডি খুবই ভয়ংকর: একটি ঘটেছে ১৮৫৭ সালে, আরেকটি ১৯৪৭-এ। একটি অন্যটির সঙ্গে যুক্ত। মাঝখানে আছে স্বাধীনতাসংগ্রামের মহাকাব্য, কিন্তু সে সংগ্রামের পরিণতি মহাকাব্যিক হয়নি, হয়েছে ট্র্যাজিক। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্টে যে ঘটনাটা ঘটল, আপাতদৃষ্টিতে তা ছিল প্রায় অসম্ভব এবং পুরোপুরি অকল্পনীয়। কেউ ভাবেনি এমনটি ঘটবে। স্বাধীনতার নামে যে ডমিনিয়ন স্ট্যাটাস পাওয়া যাবে, এবং ভারতবর্ষ যে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার মতো ডমিনিয়ন হয়ে ব্রিটিশ কমনওয়েলথের ভেতরেই রয়ে যাবে, এটা মোটামুটি জানা ছিল। কংগ্রেস ও লীগ এ ব্যাপারে সম্মত ছিল; কিন্তু দেশভাগ ঘটবে, বাংলা ও পাঞ্জাব দু-টুকরো হয়ে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের অংশ হবে—এটা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।
মুসলিম লীগ যা চেয়েছিল, সেটা হলো মুসলমানদের অন্য একটি স্বতন্ত্র আবাসভূমি, তার জন্য যে দেশভাগ প্রয়োজন হবে, এটা তারা ভাবেনি। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তারা যে ক্যাবিনেট মিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী একটি ঢিলেঢালা কেন্দ্রের অধীনে তিনটি ভৌগোলিক গ্রুপ তৈরির ধারণাটাকে গ্রহণ করেছিল, তার পেছনে এই বোধ কার্যকর ছিল, এর বেশি পাওয়া যাবে না। কংগ্রেস সেটা মানতে রাজি হয়নি। কারণ তাদের বক্তব্য ছিল, ভারতবর্ষ এক জাতির দেশ; এবং তাকে কোনো রকমেই বিভাজিত করা চলবে না। তবে দুই পক্ষই আবার এই ব্যাপারে একমত ছিল যে প্রদেশগুলোকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়া যাবে না, রাষ্ট্র থাকবে এককেন্দ্রিক; বিরোধটা ছিল এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা কীভাবে ভাগ করা যায়, তা নিয়ে। জওহরলাল নেহরু ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কেউই প্রাদেশিক নেতা হতে চাননি, চেয়েছেন সর্বভারতীয় কর্তা হবেন।
ওই যে এক জাতির দেশ বলে দাবি করা—এর ভেতরেই কিন্তু লুকিয়ে ছিল সাতচল্লিশের দেশভাগের বীজ। কারণ এক জাতির দেশ বলার অর্থ দাঁড়িয়েছিল হিন্দুদের দেশ বলা। আসলে ভারতবর্ষ তো কখনোই এক জাতির দেশ ছিল না, ছিল বহু জাতির দেশ; আর সে জাতীয়তার ভিত্তি ধর্ম নয়, ভাষা। সে হিসাবে ১৯৪৭-এ ভারতবর্ষে একটি-দুটিও নয়, সতেরোটি জাতি ছিল। ভারতবর্ষের মানুষের জন্য প্রধান সমস্যাটা ছিল শ্রেণির। কিন্তু কংগ্রেস ও লীগ কেউই শ্রেণি সমস্যার সমাধান চায়নি। দুই দলই ছিল বিত্তবানদের সংগঠন। তারা চেয়েছে ইংরেজ শাসকেরা তাদের কাছে শাসনক্ষমতা হস্তান্তর করে চলে যাবে, এবং তারা গদিতে বসে পড়ে ঠিক সেভাবেই দেশ শাসন করবে, যেভাবে ইংরেজরা করেছে। শাসন মানে আগের মতোই দাঁড়াবে শোষণ। শ্রেণিবিভাজনের সমস্যা সমাধান করতে হলে সমাজ বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল; সেটা কংগ্রেস ও লীগ কেউ চায়নি; ইংরেজরা তো চায়ইনি। ইংরেজরা চেয়েছে তাদের আনুকূল্যে তৈরি বিত্তবান তাঁবেদার শ্রেণির হাতে ক্ষমতা দিয়ে চলে যাবে, যাতে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকে।

দেশভাগ হয়েছে এই তিন পক্ষের আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে। মেহনতি মানুষ এর ধারেকাছেও ছিল না। বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে কংগ্রেস ও লীগের নেতাদের দর-কষাকষি চলেছে। জিন্নাহ ও নেহরুর সঙ্গে বড়লাট মাউন্টব্যাটেনের সম্পর্ক দাঁড়িয়েছিল সৌহার্দ্যপূর্ণ। নেহরুর সঙ্গে তো সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায়েই চলে গিয়েছিল। এই বন্ধুত্ব বড়লাটের স্ত্রী পর্যন্ত গড়িয়েছিল। নেহরু-জিন্নাহর কলহটা ছিল পৈতৃক সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়ার মতো। বাগ্বিতণ্ডা চলল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই ভাই-ই মেনে নিলেন যে ক্ষমতার ভাগটা দেশভাগ ছাড়া সম্ভব নয়। ফলে অবিশ্বাস্য ঘটনাটি ঘটে গেল।
ক্ষতি বিত্তবানদের হয়নি। ক্ষতি হয়েছে সাধারণ মানুষের। ঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি, তবে ধারণা করা হয়, ১ কোটি ২০ লাখ মানুষ শরণার্থী হয়েছে। দাঙ্গায় প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ৫ লাখ। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের দেশত্যাগের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি। অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ক্ষতিটা অপূরণীয়। সাংস্কৃতিক ক্ষতির হিসাব করা যায়নি, যাবেও না। অথচ মূল যে সমস্যা—যেটা হলো শ্রেণিবিভাজনের—তার কোনো সমাধান ঘটল না। ধনী-গরিবের পার্থক্য আগের মতোই রয়ে গেল। উন্নতি যা হলো তা বিত্তবানদের, সেই উন্নতির বাহক হয়ে থাকল মেহনতি মানুষ, আগে যেমন ছিল। শ্রেণি সমস্যার সমাধানের চেষ্টা সমাজতন্ত্রীরা করেছিলেন। তাঁরা সংগ্রামে ছিলেন। কিন্তু নেতৃত্ব চলে গিয়েছিল দুই দিকের দুই জাতীয়তাবাদী দলের হাতে। যারা ছিল পুঁজিবাদে দীক্ষিত, এবং সমাজতন্ত্রবিরোধী। বস্তুত দেশভাগে তড়িঘড়ি সম্মত হওয়ার পেছনে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তো ছিলই, আরও বড় করে ছিল সমাজবিপ্লবের ভয়। হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার একটা মীমাংসা সম্ভব, কিন্তু বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটলে সবকিছু তছনছ হয়ে যাবে—ছালা তো যাবেই, আমও হাতছাড়া হবে। অতএব যা পাওয়া যায়, তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা ভালো। অস্পষ্টভাবে হলেও নেহরু-জিন্নাহরা জানতেন, ইংরেজের সঙ্গে দর-কষাকষি সম্ভব, কিন্তু মেহনতিরা উঠে এলে কোনো আলাপই চলবে না। তাঁরা জানতেন, ইংরেজ তাঁদের শত্রু বটে, তবে আরও বড় শত্রু হচ্ছে স্বদেশি মেহনতি মানুষ। এর প্রমাণ সুন্দরভাবে পাওয়া গেছে ‘স্বাধীনতা’র পরে। ভারতে কংগ্রেসবিরোধী মুসলিম লীগ নিষিদ্ধ হয়নি, যেমন পাকিস্তানে নিষিদ্ধ হয়নি লীগবিরোধী কংগ্রেস; কিন্তু উভয় রাষ্ট্রেই নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি।
শ্রেণি সমস্যা আড়াল করার জন্যই কিন্তু জাতি সমস্যাকে প্রধান করে তোলা হয়েছিল। এবং জাতীয়তার মূল ভিত্তি যে ভাষা, সেটাকে অস্বীকার করে ধর্মকে নিয়ে আসা হয়েছিল সামনে। ফলে সম্প্রদায় জাতি হয়ে গেল, জাতি রয়ে গেল আড়ালে। কংগ্রেস বলল, দেশটা এক জাতির, লীগ বলল, সেটা সত্য নয়, দেশ দুই জাতির। এক ও দুইয়ের হট্টগোলে সতেরো জাতি হারিয়ে গেল। কমিউনিস্ট পার্টি সতেরো জাতির কথা বলেছিল, কিন্তু কংগ্রেস ও লীগের যৌথ তৎপরতার কারণ ওই সত্যটিকে সামনে নিয়ে আসতে পারেনি।
বহু জাতিত্বের সত্যটাকে অস্বীকার করার পেছনে পরস্পরের শত্রু দুই দল এক হলো কেন? এক হলো এই জন্য যে দুই দলই ধর্মকে ব্যবহার করতে চেয়েছে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে। কংগ্রেস যতই নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষ বলে দাবি করুক, তাদের ‘বন্দে মাতরম’ রণধ্বনি মুসলমানদের কাছে টানেনি, বরং ‘আল্লাহু আকবর’ আওয়াজ তুলতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ধর্মকে সামনে নিয়ে আসাতে আরও একটি সুবিধা হয়েছে। তা হলো মেহনতিদের শ্রেণি সচেতনতাকে ভোঁতা করে দেওয়া। গরিব হিন্দু ও গরিব মুসলমান যে ভাই ভাই এবং তারা উভয়েই যে ধনীদের দ্বারা শোষিত হচ্ছে—এই চেতনা যদি সজীব থাকে, তাহলে হিন্দু ধনী ও মুসলমান ধনী দুজনেরই বিপদ; তাই হিন্দু কংগ্রেস ও মুসলমানের মুসলিম লীগ দুই দলই মেহনতিদের তাদের গরিব পরিচয় ভুলিয়ে দিয়ে ধর্মীয় পরিচয়কে প্রধান করে তুলতে চেয়েছে। এবং পেরেছেও। নইলে হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা হবে কেন? জাতি প্রশ্নের সমাধান জাতীয়তাবাদী দুই পক্ষের কোনো পক্ষই চায়নি। তাদের ভেতর অকথিত চুক্তি ছিল যে ধর্মের প্রশ্নটিকে তারা জিইয়ে রাখবে শ্রেণি প্রশ্নটি ঠেকানোর জন্য।
কংগ্রেস বলেছিল, ভারতকে খণ্ডিত করাটা তারা কিছুতেই মেনে নেবে না, মুসলিম লীগ বলেছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা, বিশেষ করে পাঞ্জাব ও বাংলার পুরোটাই তাদের চাই; তা সত্ত্বেও কংগ্রেস কেন দ্বিখণ্ডীকরণ মেনে নিল, মুসলিম লীগইবা কেন ‘কীট-দষ্ট’ পাকিস্তানে সম্মত হলো? নানা কারণের কথা আমরা জানি। যেমন কংগ্রেস ভাবছিল, লীগ যখন কিছুতেই তাদের দাবি ছাড়বে না, তখন কিছুটা ছাড় দিয়ে বড় অংশটা নিয়ে নেওয়া যাক। তা ছাড়া তাদের ধারণা ছিল যে খণ্ডিত বাংলা ও পাঞ্জাব নিজেরা টিকিয়ে রাখতে পারবে না, এবং ১০ কি ২০ বছর পরে ভারতের সঙ্গে স্বেচ্ছায় যুক্ত হয়ে যাবে। ভাগাভাগিটা তাই সাময়িক মাত্র। সম্মত হওয়ার পেছনে আরেকটি বিবেচনার কথাও জানা যায়, যা স্বয়ং নেহরু স্বীকার করেছেন। সেটা হলো, তাঁদের বয়স হয়ে যাচ্ছিল; এবং জেল খাটতে খাটতে তাঁরা ক্লান্ত বোধ করছিলেন। জিন্নাহকে অবশ্য জেল খাটাখাটনির বিড়ম্বনায় পড়তে হয়নি, কিন্তু বয়স তাঁরও হয়েছিল, এবং অন্যরা জানত না বটে, তবে তিনি জানতেন যে তাঁকে ক্ষয়রোগে ধরেছিল; যার দরুন হাতে বেশি সময় ছিল না নষ্ট করার মতো। কিন্তু মেহনতিদের অভ্যুত্থানের ভয়টা তাঁদের সবারই ছিল। সেটাই ছিল অস্বীকৃত চালিকাশক্তি।
অভ্যুত্থানের লক্ষণ তো দেখাও যাচ্ছিল। আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতাদের প্রতি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যবদ্ধ সমর্থন, নৌবিদ্রোহ, সামরিক বাহিনীর ভারতীয় সদস্যদের ভেতর অসন্তোষ, সর্বোপরি শ্রমিক ধর্মঘট ও কৃষক আন্দোলন এবং সেই সঙ্গে কমিউনিস্টদের শক্তিবৃদ্ধি—সবকিছুই বিপ্লবী অভ্যুত্থানের আভাস দিচ্ছিল। এই ধরনের অভ্যুত্থানের আশঙ্কাতে ইংরেজরাও উদ্বিগ্ন ছিল। স্মরণীয় যে ১৮৫৭-এর সিপাহি অভ্যুত্থান দেখে ইংরেজরা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। সিপাহি অভ্যুত্থানে মধ্যবিত্ত যে যোগ দেয়নি, এটা ছিল ইংরেজদের জন্য একটা বড় ভরসা; ভবিষ্যতের কোনো অভ্যুত্থানে যদি মধ্যবিত্তের বিক্ষোভ মেহনতিদের বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়, তাহলে তাকে দমন করা যে সম্ভব হবে না—এটা তারা বুঝে নিয়েছিল। তাই তাদের চেষ্টা ছিল কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও মধ্যবিত্তকে আরও কাছে টেনে নেওয়া। এর জন্যই কংগ্রেস গঠনে উৎসাহদানে তারা আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। মধ্যবিত্তের একটা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম থাকবে, সেখানে তারা অভাব-অভিযোগের কথা বলবে এবং আবেদন-নিবেদন করবে, অর্থাৎ ‘স্টিম’ ছাড়তে পারবে। মেহনতিদের সঙ্গে মধ্যবিত্তের শ্রেণিগত দূরত্বকে আরও গভীর করার লক্ষ্যেই মধ্যবিত্তকে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গড়তে উৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে শ্রেণিবিভাজনের চেয়েও বেশি ভরসা ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ওপর। কেননা ধর্মীয় উন্মাদনা অন্য চেতনাকে কমিয়ে রাখার ক্ষমতা রাখে, এবং ওই উন্মাদনা পারে না এমন কাজ নেই। ধর্মীয় বিভাজনকে উসকে দিয়ে ভাগ করো ও শাসন করো নীতির বাস্তবায়নের চেষ্টা চতুর ইংরেজ শুরু থেকেই করে এসেছে। সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রক্রিয়ায় তারা প্রথমে কংগ্রেসের এবং পরে মুসলিম লীগ গঠনের উৎসাহ জোগাল। সেন্সাস রিপোর্টে হিন্দু-মুসলমানকে আলাদা করে দেখানোটা আগেই শুরু করেছিল, পরে আনল পৃথক নির্বাচন। হিন্দুরা ছিল প্রতিষ্ঠিত, মুসলমানরা ছিল উঠতি—এই দুইয়ের বৈষয়িক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সাম্প্রদায়িক রূপদানে ইংরেজের তৎপরতা বাড়তেই থাকল। উল্লেখ্য, ইংরেজাগমনের আগে ভারতবর্ষে সাম্প্রদায়িক পার্থক্য ছিল বটে, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতা ছিল না। সাম্প্রদায়িকতা তৈরি হয়েছে ইংরেজাগমনের পরে এবং তাদের প্রত্যক্ষ-অপ্রত্যক্ষ উসকানিতে। সাম্প্রদায়িকতার এই ব্যাপারটা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক। ধর্মকে কংগ্রেস ও লীগ উভয়েই ব্যবহার করেছে, এবং ইংরেজ তাতে হাওয়া দিয়েছে। সাম্প্রদায়িকতা শেষ পর্যন্ত রূপ নিয়েছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার, এবং সিদ্ধান্ত দাঁড়িয়েছে—দেশভাগ ছাড়া গত্যন্তর নেই।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের চার কুশীলব (বাঁ থেকে) জওহরলাল নেহরু, সিরিল র‍্যাডক্লিফ, লর্ড মাউন্টব্যাটেন ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। ছবি: সংগৃহীত

প্রশ্ন ওঠে, এর দায়-দায়িত্ব কার কতটা? দৃশ্যমান দায়িত্ব কংগ্রেস ও লীগের। কংগ্রেসেরই অধিক, কারণ তাদের এক জাতিতত্ত্বের কারণেই দ্বিজাতিতত্ত্বের উদ্ভব সম্ভব হয়েছে; কংগ্রেস অবশ্য বলবে যে স্বতন্ত্র বাসভূমির দাবি লীগই তুলেছিল। আসলে লীগের দাবিটা ক্রিয়া নয়, প্রতিক্রিয়া বটে। তবে কাজের আসল কাজি কংগ্রেস নয়, লীগও নয়; সে হচ্ছে ইংরেজ শাসক। ওই শাসকই সাম্প্রদায়িকতার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে এবং মীরজাফর ও উমিচাঁদের রাজনৈতিক বংশধরদের উৎসাহিত করেছে নিজেদের স্বার্থে দেশবাসীকে সাম্প্রদায়িকভাবে ভাগ করে ফেলতে।
ভাগ তো হলো, কিন্তু তাতে জাতি সমস্যার সমাধান হলো কি? হলো না। পাকিস্তানে তো হওয়ার কথাই নয়, কারণ পাকিস্তানি জাতি বলতে কোনো জিনিসের অস্তিত্বই ছিল না; ছিল বাঙালি, পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠান—এই পাঁচ জাতি। ঐতিহাসিক কারণে পাঞ্জাবিরা আধিপত্য করেছে। পাকিস্তানি জাতীয়তা গড়ে তোলার জন্য জিন্নাহ সাহেব উর্দু ভাষায় সাহায্য নেবেন ভেবেছিলেন; সুবিধা হচ্ছে না দেখে ফেরত গিয়েছিলেন ধর্মের কাছেই। ভারতে এখন ২২টি স্বীকৃত ভাষাভিত্তিক জাতি আছে, মতাদর্শিকভাবে তাদের এক রাখার উপায় কী? অন্য উপায় না পেয়ে ভারতীয় শাসকেরাও ধর্মের কাছেই ফিরে গেছেন। কথা ছিল ভারত হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র, কিন্তু হিন্দুত্ববাদের বর্তমান তৎপরতা ধর্মনিরপেক্ষতাকে একেবারে কোণঠাসা করে ফেলেছে। পাকিস্তান তো এখনো ধর্মের দোহাই পাড়ছে।
এমনকি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, সেখানেও ধর্মনিরপেক্ষতাকে আপস করতে হয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের সঙ্গে। কারণ কী? কারণটা পুরোনো। শ্রেণিচেতনাকে বিকশিত হতে না দেওয়ার বাসনা। রাশিয়ায় বিপ্লব হয়েছে, চীনে বিপ্লব হয়েছে, ভারতবর্ষে কেন হলো না? তার একটা কারণ রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। ওই ব্যবহারে দেশভাগ সম্ভব হয়েছে। এবং একই পদ্ধতিতে এখনো চেষ্টা চলছে সমাজ বিপ্লবকে প্রতিহত করার। জাতি সমস্যার সমাধান করতে না পারার দরুন পাকিস্তানও টিকবে না, এবং ভারত যে ধর্মীয় গোঁড়ামিকে প্রশ্রয় দিয়ে জাতি সমস্যা ও শ্রেণি সমস্যা উভয়কেই বিলুপ্ত করে দেবে বলে আশা করছে, তা-ও করা সম্ভব হবে না।
বলছিলাম দেশভাগটা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। সিরিল র্যাডক্লিফের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল বাংলা ও পাঞ্জাবকে ভাগ করে দেওয়ার। কাজটা তিনি করেছেন ম্যাপের ওপর পেনসিল দিয়ে দাগ কেটে। যদি অকুস্থলে যেতেন তবে পারতেন না, কারণ যথার্থ অর্থে ভাগ করা ছিল অসম্ভব কাজ। ১৩ আগস্ট গোঁজামিল দিয়ে কাজটা শেষ করে তিনি আর বিলম্ব করেননি। পারিশ্রমিকের জন্যও অপেক্ষা করার সময় হয়নি তাঁর, দ্রুত চলে গেছেন। অনুমান করেছিলেন প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ, কিন্তু সেটা কোন মাত্রায় গিয়ে পৌঁছাবে, তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি।
বাংলায় তো গৃহস্থের রান্নাঘর চলে গেছে হিন্দুস্থানে, শোয়ার ঘর পড়েছে পাকিস্তানে। বাংলা হচ্ছে নদীর দেশ। প্রায় সব নদী ওপর থেকে নিচে নেমেছে। নদীকে তো কাটা যায় না, তবু কাটা হয়েছে, এবং তাতেই বোঝা গেছে কেমন অবাস্তব ছিল ঘটনাটা। ভাটি তো শুকিয়ে মরে উজানকে না পেলে, উজান তো প্লাবিত হবে ভাটিতে নামতে না পারলে; দশা হয়েছে সেই রকম। ভাটিরই কষ্ট বেশি, কারণ উজান পানি ছেড়ে দেয়, প্লাবনের কালে।
শ্রেণি সমস্যার সমাধান তো হলোই না, জাতি সমস্যারও নয়। সমাধান হতে পারত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইটার নেতৃত্ব যদি সমাজতন্ত্রীদের হাতে থাকত। সেটা ঘটেনি। অবিশ্বাস্য দেশভাগে লাভ যে হয়নি, তা নয়। হয়েছে। তবে সেটা সুবিধাভোগীদের, মেহনতিদের ভাগ্যে বাঞ্চনাই সত্য হয়ে রয়েছে। এপারে যেমন, ওপারেও তেমনই।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here