অপেক্ষায় আরও ১০ হাজার | বাংলাদেশে এসেছে সাড়ে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা

0
29

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য থেকে প্রাণ বাঁচাতে এ পর্যন্ত সাড়ে ১৮ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মুখপাত্র ক্রিস লম গতকাল বুধবার সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় এ তথ্য জানান।

আরও প্রায় ১০ হাজার রোহিঙ্গা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার চাকঢালা ও আশারতলি সীমান্তে শূন্যরেখার কাছে অবস্থান করছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) নাইক্ষ্যংছড়ির ৩১ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক ও কক্সবাজারের ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডার লে. কর্নেল আনোয়ারুল আজিম অপেক্ষমাণ রোহিঙ্গাদের এ সংখ্যার কথা জানান। নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত গতকাল বিশেষ আইনশৃঙ্খলা সভায় তিনি বলেন, ওই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের ছয়টি স্থানে অবস্থান করছে।

এদিকে রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধানের ক্ষেত্রে আনান কমিশনের সুপারিশ সহায়ক হবে বলে মনে করে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চায় জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিবের নেতৃত্বাধীন কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন হোক। আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমারকে রাজি করাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। এ ছাড়া রাখাইনের চলমান সংঘাত থেকে নিরপরাধ বেসামরিক লোকজনকে বাঁচাতে মিয়ানমারে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে বাংলাদেশ। গত দুই দিনে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয় দুটিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর তল্লাশিচৌকিতে হামলার পর থেকে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের লোকজন প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্বের নানা প্রান্তের দেশ ও জোটের সঙ্গে আলোচনা চলছে।

মিয়ানমারের দীর্ঘদিনের রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাজ্য ও ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি)। জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের স্থায়ী প্রতিনিধি ম্যাথু রাইক্রফট এবং ওআইসি গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে এই আহ্বান জানিয়েছে।

এদিকে কক্সবাজারে আইওএমের স্থানীয় দপ্তরের প্রধান সংযুক্তা সাহানি গতকাল সকালে সংবাদ সম্মেলন করে সুনির্দিষ্টভাবে বলেছেন, ২৪ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১৮ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশ আশ্রয় নিয়েছে। তিনি বলেন, গত ছয় দিনে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রবেশের এই সংখ্যা অনুমাননির্ভর ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তৈরি। এ নিয়ে কোনো জরিপ করা হয়নি। বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই নারী, শিশু ও বয়স্ক। যুবকদের সংখ্যা কম।

আমাদের টেকনাফ প্রতিনিধি জানান, কক্সবাজারের টেকনাফের নাফ নদীতে গতকাল ভোরে এবং রাত সাড়ে ১০টায় সাগরে রোহিঙ্গাবাহী পৃথক দুটি নৌকা ডুবে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজন নারী। বাকিরা শিশু। ভোরে নৌকাডুবির পর সকাল আটটার দিকে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মাঝেরপাড়া এবং দক্ষিণপাড়া সমুদ্রসৈকত এলাকায় চারটি লাশ ভেসে থাকতে দেখেন স্থানীয় লোকজন।

শাহপরীর দ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুরুল আমিন প্রথম আলোকে বলেন, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোকজন ওঠায় প্রচণ্ড ঢেউয়ের ধাক্কায় ভোরে একটি নৌকা ডুবে যায়। এ ছাড়া রাত সাড়ে ১০টার দিকে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া সংলগ্ন সাগরে রোহিঙ্গাবাহী আরেকটি নৌকা ডুবে যায়। এই নৌকাটি নাফ নদী অতিক্রম করে বঙ্গোপসাগর হয়ে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া সৈকতের দিকে আসছিল। কিন্তু সাগর উত্তাল থাকায় তীরের কিছু দূর আগে প্রচণ্ড ঢেউয়ের কবলে পড়ে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় কয়েকজন সাঁতরে তীরে উঠলেও অনেকে নিখোঁজ রয়েছেন।

গতকাল সকালে উদ্ধার করা চারটি লাশ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছে বলে জানান টেকনাফ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) শেখ আশরাফুজ্জামান।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে উগ্রপন্থীদের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত ১১০ জন প্রাণ হারিয়েছে। এদের মধ্যে বেসামরিক লোকজন, উগ্রপন্থী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য রয়েছে। রাখাইনের সবচেয়ে বড় শহর মংডু গতকাল সান্ধ্য আইন জারির সময় কার্যত মানবশূন্য ছিল বলে জানাচ্ছে ফরাসি বার্তা সংস্থাটি। এ সময় পোড়া ঘরবাড়ি থেকে টিম টিম করে আগুন জ্বলছিল আর কানে আসছিল থেমে থেমে গুলির শব্দ।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কক্সবাজার এবং টেকনাফ ও বান্দরবান প্রতিনিধি)

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here