ঈদ ও রোহিঙ্গা সংবাদ

0
37

৩০ আগস্ট বুধবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ করে ফোন পেলাম কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ থেকে। ফোনটি করেছিলেন শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা জসিম মাহমুদ। ফোন বেজে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধরলাম। অপর প্রান্ত থেকে জসিম বললেন, নৌকায় করে শাহপরীর দ্বীপে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। নৌকাডুবির ঘটনাও ঘটেছে।

খবরটি পাওয়ার পর রাতেই প্রথম আলো ঢাকা অফিসের চট্টগ্রাম সংস্করণের সহসম্পাদক সাঈদ ইমামকে জানাই। নৌকাডুবির সর্বশেষ সংবাদটি পরের দিন কাগজে ছাপা হয়। কারণ এর আগের দিন একটি নৌকাডুবির ঘটনায় ৪ জন এবং সেদিন রাতে আরও ২ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল।

রোহিঙ্গা মানুষবোঝাই একের পর এক নৌকাডুবির খবর পেয়ে রাতে আমার চোখে আর ঘুম আসে না। মনস্থির করলাম, খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে শাহপরীর দ্বীপে রওনা হব।

৩১ আগস্ট ২০১৭, বৃহস্পতিবার

নির্ঘুম রাত কাটানোর পর ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বাসা থেকে বেরিয়ে একটি অটোরিকশা নিয়ে শাহপরীর দ্বীপের উদ্দেশে বের হলাম। হারিয়াখালী এলাকায় গিয়ে অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে একটি স্পিডবোট ভাড়া করে শাহপরীর দ্বীপের উত্তরপাড়ায় পৌঁছাই। সেখান থেকে আবার একটি অটোরিকশায় উঠে শাহপরীর দ্বীপের পশ্চিমপাড়া সৈকতে পৌঁছানোর পর দেখা গেল রোহিঙ্গা শিশু-নারী-পুরুষ গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজছেন। ভেজা শরীর নিয়ে বিলাপ করছেন তাঁরা। কেউ হারিয়েছেন মা, কেউ হারিয়েছেন বাবা, আবার কেউ হারিয়েছেন স্বামী ও সন্তানকে। তখন সকাল ছয়টা।

তীরে ভেড়ানোর আগে সাগরের উত্তাল ঢেউয়ের কবলে পড়তে দেখলাম রোহিঙ্গা মানুষবোঝাই নৌকা। চোখের সামনে মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি ডুবে গেল। সৈকতে থাকা স্থানীয় কয়েকজন জেলে সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে নৌকার যাত্রীদের উদ্ধারের চেষ্টা করেন। অনেককে উদ্ধারও করলেন। এভাবে চলতে থাকে স্থানীয় মানুষের উদ্ধার তৎপরতা। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখা গেল সৈকতের বালুতে জড়ো হওয়া নয়জনের নিথর দেহ। এর মধ্যে শিশু, নারী ও পুরুষ রয়েছেন। সারি করে রাখা হয়েছে বালুর সৈকতে।

৬টা ৪৩ মিনিটে দুজনকে দেখলাম সাগর থেকে দুটি শিশুকে মাথার ওপরে তুলে সৈকতের দিকে আসছেন। শিশু দুটি জীবিত না মৃত বোঝা যায় না। আরেকবার নজরে পড়তেই ক্যামেরা তাক করলাম। তখনো আমি বুঝতে পারিনি তাঁরা শিশু দুটির মরদেহ বয়ে আনছেন। সৈকতে আসার পর বোঝা গেল শিশু দুটি মৃত। চোখের সামনে ঘটা সকালের নৌকাডুবিতে এ দুই শিশু পানিতে ডুবে প্রাণ হারিয়েছে। তাদের একজনের মা তাঁর সন্তানকে চিনতে পারলেন। কিন্তু অপর শিশুর মা নিজেই নিখোঁজ।

সকাল সাড়ে ৮টা। এতক্ষণে সৈকতে সমুদ্রের হাওয়া ভারী হয়ে উঠেছে নিখোঁজ মানুষের আত্মীয়দের আহাজারিতে। সেখান থেকেই প্রথম আলো অনলাইনে নৌকাডুবির সংবাদটি পাঠালাম। ধীরগতির ইন্টারনেটের কারণে ছবি ভালোভাবে পাঠানো যাচ্ছিল না। কোনোমতে একটি ছবি পাঠানো সম্ভব হয়েছিল। ওই ছবি দিয়ে প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছিল নৌকাডুবির ঘটনা। তখনো আমি ছাড়া অন্য কোনো সাংবাদকর্মী সেখানে যাননি। পরের দিন প্রথম আলোয় ছাপা হয় নিথর দুই শিশুকে বয়ে আনার ছবি। আরও দু-একটা পত্রিকায় সেই ছবি দেখা যায়, হয়তো তারা প্রথম আলোর ওয়েবসাইট থেকে কপি করে ব্যবহার করেছে।

টেকনাফে ফেরার জন্য শাহপরীর দ্বীপ উত্তরপাড়ার ভাঙ্গায় এলে দেখা গেল অন্য সমস্যা। খালে পানি কম, কাদার মধ্য দিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে গিয়ে নৌকায় উঠতে হয়। কষ্ট করে যেকোনো উপায়ে টেকনাফে পৌঁছানোর জন্য চেষ্টা করছিলাম। পরে সেখান থেকে একটি অটোরিকশা ভাড়া করে টেকনাফে চলে আসি। এসে দেখি বিদ্যুৎ নেই। ল্যাপটপেও চার্জ ফুরিয়ে গেছে। ভরসা তখন মুঠোফোন। ফেসবুক মেসেঞ্জারে লিখতে বসলাম নৌকাডুবির ঘটনা। লিখতে লিখতে মুঠোফোনও বন্ধ হয়ে যায়। আমার দুশ্চিন্তা বাড়ছিল। দ্রুত সংবাদ পাঠাতে হবে ঢাকা অফিসে। ততক্ষণে তিন-চারবার ফোন এসে গেছে অফিস থেকে। ফোন দেন সাঈদ ভাই, ‘গিয়াস নিউজ কই?’ আমি সময় নিচ্ছিলাম একটু একটু করে। পরে বিদ্যুৎ এলে ল্যাপটপ খুলে সংবাদ লিখে পাঠানোর আগ পর্যন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে ১৯ জনের।

১ সেপ্টেম্বর ২০১৭, শুক্রবার

এর পরের দিন, ১ সেপ্টেম্বর আবারও রোহিঙ্গা মানুষবাহী নৌকাডুবির ঘটনা। আবার যাই শাহপরীর দ্বীপে। একই স্থানে একইভাবে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে রোহিঙ্গারা। তারা কোনো বাধা ছাড়াই সাগর উপকূলের পথ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরে অনেকের ছবি ও তথ্য নিয়ে আবার চলে এলাম টেকনাফে, স্পিডবোটে করে। পরদিন ঈদুল আজহা—কোরবানির ঈদ।

ঈদের আগের রাত সাড়ে ৮টায় খবর পেলাম হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উনছিপ্রাং সীমান্ত দিয়ে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ ও শিশু অনুপ্রবেশ করছে। রাতেই আমরা টেকনাফের তিন সাংবাদিক (আমি, আব্দুর রহমান ও আবুল আলী) চলে যাই ঘটনাস্থলে। পরদিন পত্রিকা বন্ধ। রাতের আঁধারে দেখা গেল রোহিঙ্গারা বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থান করছে। প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে টেকনাফে ফিরে আসি।

২ সেপ্টম্বর ২০১৭, শনিবার

ঈদের দিন। তাই ছাপা পত্রিকায় সংবাদ পাঠানোর কোনো তাগিদ ছিল না। ভেবেছিলাম চাপমুক্ত হয়ে ঈদ উদ্‌যাপন করতে পারব। কিন্তু বাস্তবে তা আর হলো না।

ঈদের নামাজ সেরে যখন গরু কোরবানির প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখনই আবার বেজে উঠল মুঠোফোন। ঢাকা অফিসের নম্বর। এবার প্রথম আলো অনলাইন থেকে বলা হলো, ‘রোহিঙ্গাদের নৌকাডুবি হয়েছে। খবর পাঠান।’

কোরবানির পর্ব শেষ হতেই ছুট লাগালাম শাহপরীর দ্বীপে। এদিকে আমার চার সন্তানের মধ্যে তিনজন তাপসী, মাসফি ও আট মাস বয়সের ইয়াস প্রচণ্ড জ্বর ও কাশিতে আক্রান্ত। তাদের নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার সময়ও হাতে নেই। ঈদের দিন তো বটেই, রোহিঙ্গাদের নিয়ে সংবাদ তৈরিতে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে প্রতিদিন। সাংবাদিকের জীবন তো এমনই, খবর পেলেই ছুটে যেতে হয়।

২৯ আগস্ট থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাফ নদী ও সাগর উপকূলে রোহিঙ্গাবোঝাই ১৯টি নৌকাডুবিতে ৯৪ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এরপর আরও চারটি নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। গতকাল ১৫ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ১১০ জনের মৃতদেহ। তাদের মধ্য শিশু ৫৭ জন, নারী ৩০ জন ও পুরুষ ২৩ জন।

আরও সংবাদ

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here