জঙ্গি আস্তানায় আরও বোমা ছেলের খোঁজে বাবা-মা

0
153

রাজধানীর দারুস সালাম থানার ‘কমল প্রভা’ নামের বাড়িটি ঘিরে এখনো উত্সুক মানুষের ভিড়। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে বাড়িটিতে তল্লাশি শুরু করে র‍্যাব।
সারা দিন তল্লাশি শেষে সন্ধ্যায় অভিযান স্থগিত করা হয়। আজ শুক্রবার সকাল থেকে পুনরায় তল্লাশি অভিযান শুরু করবে র‍্যাব। এদিকে কমল প্রভা বাড়ির আশপাশের বাসিন্দারা বাসায় ফিরতে শুরু করেছেন। খুলে দেওয়া হয়েছে সব রাস্তা। খুলেছে দোকান। স্বাভাবিকতা ফিরতে শুরু করেছে কমল প্রভা জঙ্গি আস্তানার বর্ধনবাড়ী এলাকায়।

এদিকে কমল প্রভা জঙ্গি আস্তানা থেকে বহুতল ভবন উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা একটি নকশা উদ্ধার করেছে র‍্যাব। নকশাটি পর্যবেক্ষণ করে র‍্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, ‘১৫ তলা ভবনটির নকশায় কোথায় কীভাবে বোমা রাখা হবে সেটিও নির্দেশ করা হয়েছে। রাজধানীর কোন ১৫ তলা ভবন ঘিরে এ পরিকল্পনা করা হয়েছে, তা আমরা তদন্ত করছি। ’

র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানান, পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে (জঙ্গি আস্তানা) আরও বিস্ফোরক থাকতে পারে। গতকালও বিভিন্ন কার্টনের মধ্যে লুকানো অবস্থায় বেশ কিছু আইইডি (অত্যাধুনিক বিস্ফোরক) ও দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। ওই ফ্ল্যাটের বিভিন্ন কক্ষে কার্টনের মধ্যে কবুতরের খাবার ও ডিভাইস সামগ্রী থাকায় তল্লাশির সময় সাবধানতা অবলম্বন করা হচ্ছে। গতকালও কমল প্রভায় তল্লাশির কাজ শেষ করতে পারেনি র‍্যাব। এদিকে জঙ্গি আস্তানা কমল প্রভা বাড়ির মালিক হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদ ও নৈশপ্রহরী সিরাজুল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। গতকাল দুপুরে তাদের আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। আস্তানাটিতে সাতজনের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় দারুস সালাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) মর্গে জঙ্গি আস্তানায় নিহত সাতজনের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানান, সাতজনেরই মৃত্যু হয়েছে আগুনে পুড়ে। বোমা বিস্ফোরণ থেকে এ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে সকালে এক দম্পতি ওই বাড়ির সামনে হাজির হন তাদের ছেলে কামাল হোসেনের খোঁজে, যিনি আবদুল্লাহর কবুতরের খামারে কাজ করতেন। বাড়িটির মালিক আজাদের সন্তান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কো-পাইলট (ফার্স্ট অফিসার) সাব্বির আহমেদকে সব ধরনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। বিমানের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিমানের নিরাপত্তার কথা ভেবে সাব্বির আহমেদকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে বিরত রাখা হয়েছে। বুধবার থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। র‍্যাব-৪ অধিনায়ক (সিও) অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার লুত্ফুল কবির জানান, বাড়িওয়ালা হাবিবুল্লাহ বাহার আজাদ ও নৈশপ্রহরী সিরাজুল ইসলাম জঙ্গিদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। প্রাথমিকভাবে এর সত্যতা পাওয়া গেছে। ২৭ এপ্রিল সাভার থেকে জেএমবির তামিম চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ সহযোগী তামীমদ্বারীকে গ্রেফতার করা হয়। সাভার থানায় করা ওই মামলায় বাড়িওয়ালা আজাদ ও নৈশপ্রহরী সিরাজকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। র‍্যাবের মুখপাত্র মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বুধবার রাতে সাময়িক বিরতি দিয়ে গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে র?্যাব, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স এবং বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের সদস্যরা ভবনে প্রবেশ করে তল্লাশি শুরু করেন। এ সময় কার্টনে রাখা আইইডি ছাড়াও বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস পাওয়া গেছে। তবে অভিযান এখনো শেষ হয়নি। আরও সময় লাগবে। ভবনটিতে এখনো প্রচুর আইইডি ও বোমা অবিস্ফোরিত অবস্থায় রয়েছে। নিহত জঙ্গি আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী ও দুই সন্তানের লাশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন আবদুল্লাহর পরিবার। দারুস সালাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ফারুকুল আলম বলেন, আবদুল্লাহর ভাই মীর আখলাক খোকার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি কারও লাশ গ্রহণ করবেন না বলে জানিয়েছেন। পরিবার লাশ গ্রহণ না করলে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফনের জন্য দিয়ে দেওয়া হবে।

এদিকে নিখোঁজ কামালের বাবা আবদুল মালেক ও মা নূরজাহান বেগম বলেন, পাঁচ সন্তানের মধ্যে কামাল দ্বিতীয়। গত বছর নভেম্বরে বিয়ে করেছেন তিনি। বউ গ্রামের বাড়িতে থাকেন। আর আবদুল্লাহর বাড়িতে কবুতর দেখাশোনার কাজ করতেন কামাল। থাকা-খাওয়া বাদে প্রতি মাসে তাকে ছয় হাজার টাকা দেওয়া হতো। এবার ঈদে বাড়ি যাননি কামাল। ঈদের পর বাড়ি যাওয়ার কথা ছিল। ঈদের পরদিন থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। টেলিভিশনে আবদুল্লাহর বাসার খবর শুনে কামালের বাবা-মা ঢাকায় আসেন। কামালের বয়স ২২ বছর। তিনি পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। আবদুল্লাহর বাসায় বিস্ফোরণে তাদের ছেলে মারা গেছেন বলে তারা ধারণা করছেন। তবে র‍্যাবের পক্ষ থেকে এখনো কামালের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি। গতকাল সরেজমিন কমল প্রভা জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে দেখা গেছে, এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো ভবন। সিঁড়িতে ভাঙা কাচের টুকরো। পঞ্চম তলায় উঠতেই নাকে আসে বারুদের গন্ধ। তাপমাত্রাও অনেক বেশি। ফ্ল্যাটের ভিতর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ধ্বংসস্তূপ। সবই পুড়ে কয়লা হয়েছে। কয়েকটি টিনের টুকরো ছাড়া আর কিছুই চেনা যায় না। দেয়াল খসে পড়েছে কোনো কোনো জায়গায়। ড্রয়িং রুমের পাশের রুমে বিস্ফোরণের কারণে চার ফুটের মতো গর্ত হয়েছে। এ গর্ত দিয়েই নিচের ফ্ল্যাটেও ছড়িয়ে পড়ে বিস্ফোরণের তাণ্ডবলীলা। কক্ষটির এখানে-সেখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে বিস্ফোরকের নানা উপকরণ। বারান্দায় টবে লাগানো গাছটি পুড়ে অঙ্গার। ভবনের ধ্বংসযজ্ঞের ভয়াবহতা দেখে যে-কারও মনে হতে পারে এ যেন যুদ্ধবিধ্বস্ত কোনো ভবন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল জঙ্গি আবদুল্লাহসহ সাতজনের অঙ্গ-প্রতঙ্গ। প্রসঙ্গত, সোমবার রাত ১১টার দিকে রাজধানীর দারুস সালামের বর্ধনবাড়ীর ২/৩-বি নম্বর কমল প্রভা বাড়িটি জঙ্গি আস্তানা সন্দেহে ঘেরাও করে র‍্যাব। বাড়ির পঞ্চম তলার একটি ফ্ল্যাটে জঙ্গিদের অবস্থান চিহ্নিত করা হয়। জঙ্গি আস্তানাটি ঘিরে রাখার প্রায় ২৩ ঘণ্টার মাথায় মঙ্গলবার রাত পৌনে ১০টার দিকে পরপর চার-পাঁচটি বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটলে আগুন ধরে যায়। বুধবার সকাল থেকে সারা দিন তল্লাশি চালিয়ে বিকালে পঞ্চম তলার ওই বাসা থেকে সাতজনের খুলি ও পোড়া অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাওয়া যায়। র‍্যাব মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ বলেন, জঙ্গি আবদুল্লাহ নিজেই বিস্ফোরণ ঘটিয়েছেন এবং এতে সাতজনই নিহত হয়েছেন। বুধবার সকাল থেকে ওই ভবনে চলা তল্লাশি অভিযান গতকালও চলে। আজ শুক্রবারও তল্লাশি অভিযান চালানো হবে বলে জানিয়েছে র‍্যাব। ওই বাড়িতে যে সাতজনের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তারা হলেন—সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য আবদুল্লাহ, তার দুই স্ত্রী নাসরিন ও ফাতেমা, ৩ থেকে ৯ বছর বয়সী দুই ছেলে ওমর ও ওসামা এবং আবদুল্লাহর দুই কর্মচারী, যাদের নাম র‍্যাব জানাতে পারেনি। তবে দুই কর্মচারীর একজন কামাল বলে দাবি করছেন তার বাবা-মা। গতকাল সন্ধ্যায় মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ৩০টি কেমিক্যাল বোমাসহ মোট ৪০টি বোমা এবং ৫০টি দেশীয় অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। এ ছাড়া একটি কক্ষে ২৩টি ফ্রিজ পাওয়া গেছে। আবদুল্লাহর কারখানায় পাঁচ-ছয়জন কাজ করতেন। তাদেরও খুঁজছে র‍্যাব।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here