তথ্য পেতে পদে পদে ভোগান্তি

0
26

২০০৯ সালের তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, ২০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দেওয়ার বিধান অনেক ক্ষেত্রেই মানা হচ্ছে না। আপিল কর্তৃপক্ষ হয়ে তথ্য কমিশনে অভিযোগ জানিয়েও অনেকে তথ্য পাচ্ছেন না। দীর্ঘ পথপরিক্রমায় তথ্য পেতে জনগণকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। এ ভোগান্তির জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পাশাপাশি কমিশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

কর্মসংস্থান ব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোহেলী পারভীন ২০১৫ সাল থেকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় তথ্য চেয়েও পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাননি। তিনি বলেন, ‘শুধু আমি জানি, এই তথ্য পেতে আমাকে কী পরিমাণ ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সর্বশেষ ৯ সেপ্টেম্বর কমিশনের সিদ্ধান্ত শুনে মনে হয়েছে, আমি ন্যায়বিচার পাইনি। কমিশনের চূড়ান্ত রায় হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’

২০০১ সাল থেকে সোহেলী পারভীন কর্মসংস্থান ব্যাংকে কর্মরত আছেন। ২০১২ সালে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনে ব্যবস্থাপক (হিসাব) পদে আবেদন করেন তিনি। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে কর্মকর্তা হিসেবে ১০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং অভিজ্ঞতা সনদ (যদি থাকে) দেওয়ার কথা উল্লেখ ছিল। সোহেলী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তাঁর ক্রমিক নম্বর ৬ হলেও যিনি ৯ নম্বরে ছিলেন তাঁকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ‘অভিজ্ঞতা সনদ’ নেই এ অজুহাতে সোহেলীর চাকরি হয়নি। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় ব্যবস্থাপক পদে অংশগ্রহণকারীদের অভিজ্ঞতা-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য এবং অভিজ্ঞতা সনদের কপিসহ বিভিন্ন তথ্য চেয়েছিলেন সোহেলী। বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশন আংশিক তথ্য সরবরাহ করে।

তথ্য কমিশনার নেপাল চন্দ্র সরকার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কমিশন সিদ্ধান্ত দেওয়ার পরও তথ্য না পেলে কমিশনের আর কিছু করার নেই। অভিযোগকারীকে আবার অভিযোগ করতে হবে, শুনানি হবে। আমাদের পক্ষ থেকে জেল দেওয়ার বিধান নেই।’

কমিশনের গত বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, গত বছর আইনের আওতায় তথ্য চেয়ে ৬ হাজার ৩৬৯টি আবেদন করা হয়েছিল। প্রায় ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে তথ্য সরবরাহ করা হয়েছে। অন্যদিকে তথ্য না দেওয়ার সিদ্ধান্তের সংখ্যা ছিল ২৫৩টি। এর মধ্যে ২০১টি আপিল করা হয়।

রাজধানীর ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন আল মাছুম। ২০১৫ সাল থেকে ভাটারা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল মোত্তাকিনের কাছে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় একাধিকবার তথ্য চেয়ে আবেদন করেও তথ্য পাননি। কমিশন তিনবার শুনানিতে অংশ নেওয়ার জন্য সমন জারি করলেও তিনবারই অনুপস্থিত থাকেন ওসি। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, শুনানিতে হাজির না হয়ে বা অভিযোগের জবাব না দিয়ে ওসি অসদাচরণ করেছেন এবং বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহযোগ্য তথ্য সরবরাহ না করে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন। অভিযোগকারীকে ১০ দিনের মধ্যে তথ্য সরবরাহ করার পাশাপাশি ওসিকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেওয়া হয়। তবে এ আদেশের বিরুদ্ধে নুরুল মোত্তাকিন হাইকোর্টে রিট করায় বিষয়টি স্থগিত আছে।

নিজ নামে থাকা ৯ একর জায়গাকে কেন্দ্র করে তথ্য অধিকার আইনে আবেদনগুলো করেছিলেন আলাউদ্দিন আল মাছুম।তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘তথ্য কমিশনের রায় আমার পক্ষে গেছে। এতে প্রমাণিত হয়েছে, আমার অভিযোগের সত্যতা আছে। কিন্তু আমি আমার তথ্য তো পেলাম না। তথ্য না পেলে এত দূর এসে আমার লাভ কী হলো?’

তথ্য অধিকার আইন অনুযায়ী, নির্ধারিত ফরমে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বরাবর তথ্য চেয়ে আবেদন করতে হবে। একটিমাত্র তথ্য প্রদানকারী ইউনিট হলে অনধিক ২০ কার্যদিবস এবং একাধিক ইউনিট জড়িত থাকলে অনধিক ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে তথ্য দিতে হবে। ব্যক্তির জীবন, মৃত্যু, গ্রেপ্তার বা কারাগার থেকে মুক্তি-সম্পর্কিত হলে অনুরোধ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রাথমিক তথ্য সরবরাহ করবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে তা ১০ কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনকারীকে জানিয়ে দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে তথ্য না পেলে বা সন্তুষ্ট না হলে পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করেও তথ্য না পেলে নির্ধারিত সময়সীমার পর পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে প্রধান তথ্য কমিশনার বরাবর অভিযোগ জানাতে হবে।

প্রধান তথ্য কমিশনার অধ্যাপক মো. গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনের কারণে সমাজে তথ্য গোপনের একটি অশুভ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। কিন্তু বর্তমানে এ সংস্কৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। তথ্য পেতে আইনের আওতায় দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় জনগণের কিছুটা ভোগান্তি হলেও এটাও ঠিক যে জনগণ হাল ছেড়ে দিচ্ছে না।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here