পীরগঞ্জে ভয়াবহ বন্যায় নিহত -লাশ দাফনের জায়গা নেই!

0
131

‘বাবা, কয়দিন ধরি হামরা পানির কারাগারোত বন্দী হয়া আছি। কেউ হামাক দ্যাখপ্যাও আইসে না, খাবারও পাইনা। এই বুড়া বয়সে দিনেরাতে ১ বার খায়া কি থাকা যায়? প্যাটের কষ্ট কি সহ্য করা যায়! চারিদিকে পানি আর পানি। ককন যে পানিত পড়ি মরি যাও বাবা। তোরা এ্যানা বাঁচাও বাবা।’

 

এভাবেই খুব অসহায় আর কান্নাজড়িত ক্ষীণ কন্ঠে কথাগুলো বলছিলেন শতবর্ষী সুকী মাই বেওয়া। তিনি চতরা ইউনিয়নের সোনাতলার বাসিন্দা। তার বাড়ির চারপাশে গলা পরিমান বন্যার পানি। বর্তমানে তিনি ও তার পরিবার বাড়ির টিনের চালার উপরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।

খাবারের পাশাপাশি পানীয় জলের তীব্র সংকটে ভুগছে সুকী মাই বেওয়া। সুকী মাইয়ের মতো ইউনিয়নটির কাঁটাদুয়ার গ্রামের শতবর্ষী মৌলভী তোফাজ্জল হোসেন, সোনাতলার (ঝাকাপাড়া) লাল মিয়া, কুয়েতপুর মাঝিপাড়ার গনেশ চৌধুরী, গৌর চন্দ্র এবং অবিনাশ, বদনারপাড়ার সাহেব আলী, কুয়েতপুরের জোহরা বেগম, নছিরামসহ হাজারো পানিবন্দী মানুষ খাবার না পেয়ে কাঁদছেন।

বন্যার শুরু থেকে ৮ দিনে কারো কাছে সরকারি সাহায্য পৌঁছেছে হয়তো একবার। আবার কারো কাছে এখনো পৌঁছেনি।

গত শনিবার বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, উপজেলার সর্ব দক্ষিণে চতরা ইউনিয়নটি করতোয়া নদীঘেষা। ইউনিয়নটির ২৪টি মৌজার মধ্যে ১৯টিতেই ৮ দিন ধরে বন্যার পানি ঢুকে আছে। কোথাও গলা পরিমান আবার কোথাও কোমর পর্যন্ত পানি। ধানসহ রবি শষ্যের ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। টিউবওয়েলগুলোর কোনোটা থেকেই খাবার পানি নেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

চতরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এনামুল হক শাহীন প্রধান বলেন, আমার ইউনিয়নের ২৪টি মৌজায় ৯ হাজার পরিবারের মধ্যে ১৯ মৌজার প্রায় ৬ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে আছে। কুয়েতপুর এবং কুমারপুর গ্রাম সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ নৌকা নিয়ে বন্যা এলাকায় গেলেই মানুষজন খাবারের জন্য গলা পানি ভেঙে ছুটে আসছে। পর্যাপ্ত ত্রাণ না নিয়ে যাওয়ায় অনেক সময় আমরা বুভুক্ষু মানুষের কাছ থেকে পালিয়ে আসছি।

তিনি আরও বলেন, আমার ইউনিয়নের গৌরেশ্বরপুরে ২টি, কাঁঠালপাড়া, কাঙ্গুরপাড়া, যাদবপুর এবং অনন্তপুর গ্রামে ১টি করে মোট ৬টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র থাকলেও শুধু অনন্তপুর আশ্রয় কেন্দ্রে কয়েকটি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে বন্যার্তরা এলে সাহায্য দিতে আমাদের কষ্ট কম হতো।

তিনি আরও জানান, করতোয়া নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের ম্যাছনার গড়, বদনারপাড়া ও কুয়েতপুর বিল নামকস্থানে ভেঙে যাওয়ায় চতরা ইউনিয়নে পানি ঢুকেছে। ফলে উঁচু স্থান নেই। মানুষ মারা গেলে নিজ জমিতে কবর দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

এবারের বন্যায় করতোয়ার পানি উপচে এবং বাঁধ ভেঙে টুকুরিয়া, চৈত্রকোল, বড়আলমপুর, চতরা ও কাবিলপুর ইউনিয়নের অসংখ্য গ্রাম পানিতে তলিয়ে আছে। গ্রামগুলোর মধ্যে রয়েছে- জলাইডাঙ্গা, বাসুদেবপুর, রামকানুপুর, ভাদুরিয়া, গোবিন্দপুর, খালিশা, চকভেকা, গ্রামতলা, কুয়েতপুর, হামিদপুর, কুমারপুর, বদনাপাড়া, ঘাসিপুর, কুলানন্দপুর, সোন্দলপুর, সুরানন্দপুর, কাটাদুয়ার, চণ্ডিদুয়ার, নিশ্চিন্তবাটি, বাটিকামারী, জামদানী, শায়েস্তাপুর, বিছনা, দক্ষিণ দুর্গাপুর, টিওরমারী, বোয়ালমারী, মেরীপাড়া, পারবোয়ালমারী, তরফমৌজা, সুজারকুঠি, জয়ন্তীপুর, গোপীনাথপুর, কাশিপুর, দুধিয়াবাড়ি, ছাতুয়া, কোমরসই, হরিনা, পার হরিনা, কোমরসই, আটিয়াবাড়ি, হরনাথপুর, মাধবপুর, গন্ধর্বপুর, ধর্মদাশপুর, ওমরপুর, রামনাথপুর, বাঁশপুকুরিয়া, শিমুলবাড়ি, ফরিদপুর, গাংজোয়ার, হলদিবাড়ি, চকরাঙ্গামাটি, ইসলামপুর, জুনিদপুর, শেরপুর, জাহিদপুর, নীচকাবিলপুর, টুকনিপাড়াসহ দু’শ গ্রাম।

উজান থেকে নেমে আসা পানিতে পীরগঞ্জের করতোয়া নদীপাড়সহ উপজেলার ৩’শ ৩১টি গ্রামের মধ্যে প্রায় দু’শ গ্রামে বন্যা এবং জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে করতোয়া, আখিরা, যমুনেশ্বরী ও নলেয়া নদী ঘেঁষা ৯ ইউনয়নের ৮২ টি গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। গত ৩ দিনে পানিতে ডুবে ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

কিন্তু পীরগঞ্জকে এখনো বন্যা দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হয়নি।

এদিকে সরকারি সাহায্যের অপ্রতুলতার মধ্যে স্থানীয় অনেকেই বন্যার্তদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছেন। চতরা বিজ্ঞান ও কারিগারি কলেজের পক্ষ থেকে বন্যার শুরু থেকেই বন্যার্তদের রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে।

ওই কলেজের অধ্যক্ষ আব্দুর রব প্রধান জানান, বন্যায় আমরা এলাকা দেখছি না। করতোয়া নদীর ত্রি-সীমানা রংপুর, গাইবান্ধা এবং দিনাজপুরের বন্যা কবলিত বিভিন্ন গ্রামে আমরা কলেজের পক্ষ থেকে রান্না করা খাবার সরবরাহ এবং মেডিকেল টিমের মাধ্যমে ওষুধও দিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, চতরা ইউনিয়নের বাসিন্দা দুবাই প্রবাসী ব্যবসায়ী আলতাব হোসেনের দেয়া ১ লাখ টাকা এবং নিজেদের সংগ্রহের মাধ্যমে আমরা বন্যার্তদের সহায়তায় কাজ করছি। এছাড়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সম্পাদক শাওন মিয়া, আ’লীগ নেতা মাসুদ মিয়া, চতরা ডিগ্রি কলেজসহ বিভিন্ন সংগঠন ত্রাণ দিচ্ছে।

আগামী ২৮ আগস্ট স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী বানভাসীদের দুর্দশা দেখতে পীরগঞ্জে আসবেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান জানান, এ পর্যন্ত ৫ হাজার ৫২৫ টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউএনও কমল কুমার ঘোষ জানান, টুকুরিয়া ইউনিয়নে ৫ মেট্রিকটন, চতরায় ৪ মে. টন এবং কাবিলপুরে ৩ মে. টনসহ বন্যার্তদের জন্য সরকারিভাবে ২০ মে. টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সরকারি সাহায্য আরও বাড়ানোর জন্য ইউপি চেয়ারম্যানরা জোর দাবি জানিয়েছে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here