ধর্ষণে অন্তঃসত্ত্বা : দুজনকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা

0
120

মেহেরপুরের একটি গ্রামে ধর্ষণের পর এক নারী অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুজনকে সালিসে ছয় লাখ টাকা জরিমানা ও একজনকে ওই নারীকে বিয়ে করতে আদেশ দিয়েছেন স্থানীয় মাতবররা। ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে (সাদা) অভিযুক্তদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছে। বিধবা ওই নারী ‘সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা’।

গত শনিবার বিকেলে সদর উপজেলার কুতুবপুর ইউনিয়নের শোলমারী গ্রামের বাজারে এ সালিসের ঘটনা ঘটে। সালিসে শোলমারী গ্রামের হাশেম আলীকে তিন লাখ ৫০ হাজার, বাবুল সরদারকে দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং জরিমানার টাকা দিতে পারবেন না বলে ইমাদুলকে ওই নারীকে বিয়ে করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। সালিসের দিন থেকে ২৫ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ ও বিয়ে করতে বলা হয়েছে। আর দণ্ডপ্রাপ্তরা সাংবাদিকদের কাছে নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছেন।

এই সালিস করে এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছেন কুতুবপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সদস্য আখতার হোসেন, সাবেক সদস্য মোতালেব হোসেন, ফকির মহাম্মদ, সাবেক সদস্য ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম মোস্তফা, সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান কালু, ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি আরিফুর রহমান, সুবেহ সাদিক বিশ্বাস, সেলিম রেজা, মন্টু, সোহেলসহ ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন নেতাকর্মী।

গতকাল বুধবার শোলমারী গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ঘটনাটি অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। গ্রামবাসী এ ধরনের সালিসের বিরোধিতাসহ ওই মাতবরদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে ওই নারীর সঙ্গে কথা বললে তিনি কখনো তাঁর বয়স ৭০, কখনো ৬০ বছর বলেন। কিন্তু তাঁর বয়স ৩০ বছরের মতো হবে। অভিযুক্ত তিনজনের মধ্যে কার সন্তান তাঁর পেটে তা স্পষ্ট করে বলতে পারেননি তিনি। প্রভাবশালীদের চাপে তিনি ওই তিনজনকেই দায়ী করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসী বলছে, মেডিক্যাল পরীক্ষা করলেই জানা যাবে ওই সন্তান কার।

সালিস প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ওই নারীর এক ভাইয়ের মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে স্থানীয় মাতবররা শোলমারী বাজারে সালিস করেন। এ সময় ওই নারী তিনজনকে অভিযুক্ত করেন। তিনি বলেন, গত রমজানে তিনি হাশেম আলীর কাছে ফিতরা চাইতে গেলে তাঁকে ধর্ষণ করেন হাশেম। তখন একজন বলেন, ‘রোজা (রমজান) হলো তিন মাস আগে। তাহলে তোমার পেটের সন্তানের বয়স সাত মাস কিভাবে সম্ভব?’ তখন তিনি (নারী) আরো দুজনকে অভিযুক্ত করেন।

এর ভিত্তিতে মাতবররা তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁরা হাশেম আলী ও বাবলু সরদারকে আর্থিক জরিমানা এবং ইমাদুলের সঙ্গে ওই নারীর বিয়ের সিদ্ধান্ত দিয়ে ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে (সাদা) অভিযুক্তদের স্বাক্ষর নেন। মাতবররা সবাই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী হওয়ায় দণ্ডিতরা সালিসে কিছু বলার সাহস পাননি বলে স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ।

হাশেম আলী বলেন, “মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ায় কয়েক দিন ধরে কানাঘুষা চলছে বাবলু সরদারকে জড়িয়ে। তারা গর্ভপাত করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। তখন আমি বলেছিলাম, ‘মেয়েটা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ায়, তারও দোষ আছে। ’ এ কথা বলাই আমার কাল হয়েছে। সেদিন থেকেই তারা আমার নাম জড়িয়ে দেয়। বিচারের দিন শুনেছি, মেয়েটা আমার নামও বলেছে এবং শনিবার বিকেলে সালিসে থাকতে হবে। তারা একতরফা বিচার করে আমাকে জরিমানা করল। প্রথমে বলেছিল দুই বিঘা জমি লিখে দিতে হবে। পরে সাড়ে তিন লাখ টাকা জরিমানা করে। হুমকির মুখে আমি মুখ বুজে তাদের বিচার মেনে নিয়েছি। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। ”

বাবুল সরদার বলেন, ‘আমি দোষী নই। ক্ষমতাসীনদের ভয়ে বিচার মেনে নিতে হয়েছে। এখন বসতবাড়ি বেচে সালিসের টাকা পরিশোধ করে ভাড়া বাড়িতে থাকতে হবে। সুষ্ঠু বিচার হলে আমি নির্দোষ প্রমাণিত হব। ’ ‘বাজার করতে যাওয়ায়’ আরেক অভিযুক্ত ইমাদুলকে পাওয়া যায়নি। তাঁর স্ত্রী তরজিনা বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব। পরের জমিতে বাস করি। নগদ টাকা দেওয়ার ক্ষমতা নাই। তাই আমার স্বামীকে ওই নারীকে বিয়ে করতে হবে বলে বিচার করেছে মাতবররা। ’

মাতবর ও সাবেক ইউপি সদস্য মোতালেব হোসেন বলেন, নির্যাতিতা নারীর ভাই আদালতে মামলা করতে গিয়েছিলেন। পরে তিনি মামলা না করে মাতবরদের কাছে বিচার দেন। তাই গ্রামের কয়েক শ লোক বসে অভিযুক্তদের বিচার করেছে। তিনি বলেন, ‘এটা কি অন্যায় হয়েছে? ওই নারীর পেটে থাকা সন্তানকে তো সমাজে পরিচয় দিয়ে মানুষ হতে হবে। ’

আইনিভাবে না গিয়ে নিজেরা কেন বিচার করলেন-এ প্রশ্নে মোতালেব বলেন, ‘ওই নারী গরিব। মামলা চালানোর খরচ তাঁর নাই। তাই সামাজিকভাবে বিচার করা হয়েছে। ’ আরেক মাতবর ও কুতুবপুর ইউপির ২ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘আসামি ও নির্যাতিতা নারী উভয় পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে সালিসে বিচার করা হয়েছে। ’

সাবেক এক ইউপি সদস্য অভিযোগ করেন, হাশেম আলীরা বিএনপিকর্মী বলে রাজনৈতিক হয়রানির শিকার হয়েছেন। মেহেরপুর সদর থানার ওসি রবিউল ইসলাম বলেন, ঘটনাটি তাঁদের জানা নেই। তবে মাতবররা এ ধরনের বিচার করতে পারেন না। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here