আতঙ্ক কমলেও সোনা নীতিমালার খবর নেই

0
51

অবৈধ সম্পদের খোঁজে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে প্রায় ১৫ মণ সোনা ও ডায়মন্ড আটক করে শুল্ক গোয়েন্দারা। গত মে মাসে এ ঘটনার পর সোনা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়ায়। জুয়েলার্সে বিক্রিবাট্টাও কমে যায়। পরে হয়রানি বন্ধে দুই দফা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের আন্দোলনের হুমকি দেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের প্রতিবাদের মুখে নতুন কোনো জুয়েলার্সে অভিযান চালায়নি গোয়েন্দারা। ফলে সোনার ব্যবসায় কিছুটা স্বস্তি ফেরে।

এদিকে আপন জুয়েলার্সে অভিযানের পর সোনার ব্যবসাকে স্বচ্ছ করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ‘স্বর্ণ নীতিমালা’ করার আশ্বাস দেওয়া হয়। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবারের বাজেট বক্তব্যেও চলতি বছরের মধ্যে সোনা আমদানি ও জুয়েলারি শিল্পের জন্য যুগোপযোগী নীতিমালা করার ঘোষণা দেন। তবে এখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতি নেই। নীতিমালা প্রণয়নের জন্য কমিটি কিংবা আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক হয়নি।

জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির কয়েকজন নেতা বলেন, আপন জুয়েলার্সে শুল্ক গোয়েন্দাদের অভিযানের কারণে রোজার সময় ব্যবসা মন্দা গেছে। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের আতঙ্ক অনেকটাই কমেছে। তবে সরকারের উচ্চ মহলের আশ্বাসের পরও নীতিমালার বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়াটা রহস্যজনক।

নীতিমালার বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় এনবিআর চেয়ারম্যানকে ৬ আগস্ট চিঠি দেন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির সভাপতি গঙ্গা চরণ মালাকার। এতে তিনি বলেন, সোনা নীতিমালার বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় জুয়েলারি ব্যবসায়ীরা উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত।

দেশে সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াটি দীর্ঘদিন ধরেই অস্বচ্ছভাবে চলে আসছে। ব্যবসায়ীদের কারও কাছেই অলংকার তৈরিতে ব্যবহৃত সোনার বৈধ কাগজপত্র নেই। ঋণপত্র খুলে বিদেশ থেকে বৈধভাবে সোনা আমদানির সুযোগ থাকলেও কোনো ব্যবসায়ীই সেটি করেন না। এই মূল্যবান ধাতুর জোগানের বড় উৎস বর্তমানে ব্যাগেজ আইন ও চোরাচালানের মাধ্যমে আসা সোনার অলংকার কিংবা বার। সোনা ক্রয়-বিক্রয়ের বড় বাজার পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা। সেখানকার ‘পোদ্দার’ ব্যবসায়ীরাই এটি নিয়ন্ত্রণ করেন। তাঁদের কাছ থেকে কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই সোনা কেনেন জুয়েলার্স মালিকেরা।

শুল্ক গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬ আগস্ট হজরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে ২৫ কেজি ওজনের ২৫০টি সোনার বার এবং গত শনিবার বায়তুল মোকাররম মার্কেট থেকে ১৬ দশমিক ২৪০ কেজির ১৪০টি সোনার বারসহ এক ব্যক্তিকে আটক করে গোয়েন্দারা। সব মিলিয়ে চলতি মাসের প্রথম ১৩ দিনে চোরাচালানের মাধ্যমে আসা ৪৩ কেজি ৯৭৯ গ্রাম সোনা আটক করেছে তারা। এসব সোনার মূল্য প্রায় ২১ কোটি টাকা।

বনানীর রেইনট্রি হোটেলে দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় প্রধান আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদের ছেলে শাফাত আহমেদ। দিলদার আহমেদের অবৈধ সম্পদ খুঁজতে গত ১৪ ও ১৫ মে আপন জুয়েলার্সের পাঁচটি বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালায় শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। এ সময় প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় প্রায় ১৫ মণ সোনার অলংকার ও ৪২৭ গ্রাম ডায়মন্ড জব্দ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের জিম্মায় দেয় গোয়েন্দারা। পরে দুই দফায় আপন জুয়েলার্সের তিন মালিকের বিরুদ্ধে ১০টি মামলা হয়।

যে অভিযোগে আপন জুয়েলার্সের বিক্রয়কেন্দ্র সিলগালা করা হয়েছে, সেই দোষে সব জুয়েলার্সই দোষী। এই দাবি করে আপন জুয়েলার্সের সোনা জব্দের ঘটনার প্রতিবাদ করে এবং অনির্দিষ্টকালের জন্য সোনার দোকান বন্ধের হুমকি দেয় জুয়েলার্স সমিতি। পরে ২০ ও ২২ মে জুয়েলার্স সমিতির নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে শুল্ক গোয়েন্দা কর্তৃপক্ষ। এতে সিদ্ধান্ত হয়, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া ঢালাওভাবে অভিযান চালাবে না শুল্ক গোয়েন্দা।

পরে গত ৭ জুন সংবাদ সম্মেলন করে জুয়েলার্স সমিতি তিন দিনের মধ্যে সোনা নীতিমালার বিষয়ে সুস্পষ্ট ঘোষণা ও কমিটি গঠন করার দাবি জানায়। অন্যথায় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ রাখার হুমকি দেয় তারা। পরে ফেডারেশন ভবনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক আবুল কালাম আজাদ সোনা ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে নীতিমালার বিষয়ে শিগগিরই ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।

জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সহসভাপতি এনামুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, এটি খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে স্বর্ণ নীতিমালার জন্য সরকারের উচ্চ মহল থেকে আশ্বাস দেওয়ার পরও এখন পর্যন্ত অগ্রগতি শূন্য। তিনি বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, একটি প্রভাবশালী অংশ চায় না দেশে কোনো স্বর্ণ নীতিমালা হোক। এটি হলে হাজার হাজার কোটি টাকার অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে যাবে।’ তিনি বলেন, সমস্যাটির যে স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন, সেটি কেউই বুঝতে চাইছে না।

জানতে চাইলে জুয়েলার্স সমিতির সাধারণ সম্পাদক দিলীপ কুমার আগরওয়ালা গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন ফোরামে আমরা শিগগিরই সোনা নীতিমালা করার জন্য অনুরোধ করেছি। তবে এখনো কোনো অগ্রগতি হয়নি। অবশ্য এফবিসিসিআই সভাপতির পরামর্শে আমরা একটি খসড়া নীতিমালা করছি। এটি শিগগিরই চূড়ান্ত  করে সরকারকে দেওয়া হবে।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here