জালানীখাত আমদানীতে ঝুঁকিপূর্ণ নির্ভরতা

0
32

দেশের জ্বালানি খাত আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার জ্বালানি আমদানির ব্যাপক পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। এ পরিকল্পনায় জ্বালানি তেলের আমদানি যেমন বাড়ছে, তেমনি আমদানির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে বিপুল পরিমাণ গ্যাস (এলপি গ্যাস ও এলএনজি) ও কয়লা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি আমদানির জন্য অবকাঠামো নির্মাণ যেমন বিপুল ব্যয় ও সময়সাপেক্ষ, তেমনি আমদানি করা জ্বালানির দামও বেশি। তাই ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার জন্য উন্নয়নের যে লক্ষ্য সরকার নির্ধারণ করেছে, বিপুল পরিমাণে আমদানি করা জ্বালানির ব্যবহার সেই পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, আমদানির চেয়ে সরকারের অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত দেশের জ্বালানি সম্পদের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টির প্রতি। স্থলভাগে ও সমুদ্রবক্ষে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। দেশের কয়লা উত্তোলনেও সরকার একটি রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাংলাদেশ তরল জ্বালানিতে (পেট্রল, অকটেন, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, জেট ফুয়েল ইত্যাদি) সব সময়ই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। তবে সরকার একের পর এক তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পদক্ষেপ নেওয়ায় তরল জ্বালানির আমদানি ক্রমাগত বাড়ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত মাসে সরকার পুনরায় ১ হাজার ৭৬৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১০টি তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন অনুমোদন করায় আগামী বছর থেকে জ্বালানি তেলের আমদানি বেড়ে যাবে। এ বছর পর্যন্ত দেশে তরল জ্বালানি আমদানির মোট পরিমাণ প্রায় ৫৪ লাখ মেট্রিক টন। আগামী বছর তা ৬৫ লাখ টনে উন্নীত হতে পারে। এ বছরই সরকার আরও কিছু তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেবে।
বিশিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম কয়েক বছর ধরে কম আছে বলে সরকারের এই পদক্ষেপের বিরূপ প্রভাব দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু তেলের দাম একটু বেশি বাড়লেই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হবে কি না, নিশ্চিত নয়। ফলে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

* বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কারণে জ্বালানি তেল ও কয়লার আমদানি বাড়ছে
* আগামী বছর থেকে শুরু হবে বিপুল পরিমাণ এলএনজি আমদানি
* দেশে গ্যাসের মজুত কমে এসেছে

বাংলাদেশ প্রধান বাণিজ্যিক জ্বালানি হিসেবে প্রাকৃতিক গ্যাসে এত দিন স্বনির্ভর ছিল। কিন্তু নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উত্তোলন বাড়ানোর কাজে গতি না থাকায় গ্যাসের মজুত কমে এসেছে। ফলে ২০১০ সাল থেকে নতুন সংযোগ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইতিমধ্যে আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে আমদানি করা এলপি গ্যাসের ব্যবহার বেড়ে বছরে প্রায় ছয় লাখ টনে উন্নীত হয়েছে।
সরকার অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি দামের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি শুরু করছে। আগামী বছরের মধ্যভাগে প্রতিদিন ৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সমপরিমাণ এলএনজি আমদানি শুরু হবে। বছরের শেষ নাগাদ আরও ৫০ কোটি ঘনফুটের সমপরিমাণ এলএনজি আমদানি শুরু হবে। ফলে বর্তমানে প্রতি ইউনিট (এক হাজার ঘনফুট) গ্যাসের দাম ১৮০ টাকা (২ দশমিক ১৯ ডলার) থেকে বেড়ে ৪৫০ টাকার বেশি হবে (প্রতি ইউনিট এলএনজি ১০ ডলার হিসাবে)।
সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে, ২০১৯ সালে প্রতিদিন আরও ৫০ কোটি ঘনফুটের সমপরিমাণ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে আরও ২০০ কোটি ঘনফুটের সমপরিমাণ এলএনজি আমদানি করা। এ ছাড়া এলএনজি আমদানির আরও কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয় সরকারের বিবেচনাধীন।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক বদরূল ইমাম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের পরিকল্পনা ধরে এক হিসাবে দেখা যায়, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশে ব্যবহৃত প্রাথমিক জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশই হবে আমদানিনির্ভর। অর্থনীতি ও জনজীবনে এর প্রভাব হবে ব্যাপক।
বাপেক্সের মাধ্যমে পাঁচ বছরে ১০৮টি গ্যাসকূপ খননের একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল গত বছর। পরে তা কাটছাঁট করে ২০১৮ সালের মধ্যে ২৮টি কূপ খননে সীমিত করা হয়। কিন্তু এর মধ্যে গত ৬ আগস্ট ভোলার শাহবাজপুর ক্ষেত্রে দুটি অনুসন্ধান কূপ খননের কাজ শুরু করা হয়েছে। এই খননের কাজ করছে রাশিয়ার কোম্পানি গাজপ্রম। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ মীমাংসা হয়েছে কয়েক বছর আগে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সমুদ্রে উল্লেখযোগ্য কোনো অনুসন্ধান শুরু করা যায়নি।
অধ্যাপক বদরূল ইমাম বলেন, দেশের স্থলভাগে ও সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হলে আমদানিনির্ভরতা এ পর্যায়ে যেত না। মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর উদ্যোগ নেওয়া হলেও ২০২০ সালের মধ্যে গভীর সমুদ্র থেকে তেল-গ্যাস পাওয়া যেত। এমনকি দু-তিনটি খনি থেকে সুড়ঙ্গ পদ্ধতিতে কয়লা তোলাও শুরু করা যেত। কিন্তু এর কোনো কিছুই করা হয়নি।
এলএনজির পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ কয়লা আমদানির প্রক্রিয়াও শুরু করা হয়েছে। সরকার মোট ১৮টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে তিনটি বড় কেন্দ্র-পায়রা ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট, রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ও মাতারবাড়ী ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চালু হবে। এই তিনটি কেন্দ্রের জন্য প্রতিদিন কয়লা লাগবে প্রায় ৩০ হাজার টন। পুরোটাই আমদানি করা হবে। কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৮ সাল নাগাদ প্রতিবছর প্রায় ছয় কোটি টন কয়লা আমদানি করতে হবে। এরপর তা আরও বাড়বে।
এই অবস্থায় জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ কী, জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, দেশের জ্বালানি সম্পদের উন্নয়নেও পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে তা দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। আমদানি করা জ্বালানি ব্যবহার করেও যাতে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যায়, সে জন্য জ্বালানি সাশ্রয়, সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার ও দক্ষতা বৃদ্ধির দিকে নজর দিতে হবে। দামের বিষয়টিও অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে। তবে সরকারের প্রথম লক্ষ্য বিদ্যুতের উৎপাদন ও জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here