বদলে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি

0
47
বদলে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি

বদলে যাচ্ছে জাতীয় পার্টি। ভোটের রাজনীতিতে সফল হতে এই পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে দলটিতে। ‘শান্তির জন্য পরিবর্তন, পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পার্টি’- স্লোগানকে সামনে রেখে আগামী নির্বাচনে জনসমর্থন আদায়ে মাঠে নামছেন নেতারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয় নিশ্চিত করতে সাত পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি। আগ্রহী প্রার্থীর অবস্থান জানতে চলছে আসনভিত্তিক জরিপ। চলছে নির্বাচনের ইশতেহার প্রণয়নের কাজ। জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এ তিন দলের শাসনামলে দেশের উন্নয়নের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হবে ভোটারদের সামনে। ’৯০-র পরের ভোটারদের কাছে জাতীয় পার্টির শাসনামলের উন্নয়নের বার্তা পৌঁছে দেয়ার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চলছে নবীন-প্রবীণের সমন্বয়ে কমিটি গঠন, নিষ্ক্রিয় নেতাকর্মীদের সক্রিয় করার উদ্যোগ। এছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে পার্টিকে ঢেলে সাজানোসহ সাংগঠনিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী এবং সুসংহত করার কাজও সমান তালে চলছে। জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, নব্বইয়ের পর গত ২৭ বছরে বিপুল জনগোষ্ঠী ভোটার হয়েছে, তাদের সমর্থন আদায়ে উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় পার্টি। দলটির নেতাদের মতে, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ দীর্ঘ নয় বছর দেশ শাসন করেছেন। এই সময়ে রাস্তা-ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণের মধ্য দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটেছে। উপজেলা ব্যবস্থার প্রবর্তন, পথকলি ট্রাস্ট, ভূমি সংস্কার বোর্ড গঠনসহ সারা দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে জাতীয় পার্টির নয় বছরের শাসনামলেই। এ সময়ে সর্বস্তরে মাতৃভাষার প্রচলনসহ অসংখ্য জনবান্ধব কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, টেলিযোগাযোগ, ব্যাংক-বীমা, পোশাক শিল্প, ওষুধ শিল্প- এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের হাতের ছোঁয়া লাগেনি। যার সুফল এখন দেশের মানুষ ভোগ করছেন। কিন্তু নতুন প্রজন্মের কাছে এসব বিষয় সেভাবে তুলে ধরা হয়নি। আগামী নির্বাচনে নতুন প্রজন্মকে এসব তথ্য জানানোর উদ্যোগ নেয়া হবে। এজন্য বিশেষ পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। সচিত্র তথ্য-উপাত্তসহ তিন সরকারের (জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও আওয়ামী লীগ) আমলের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরা হবে। নতুন প্রজন্মের সামনে প্রমাণ তুলে ধরা হবে জাতীয় পার্টির ৯ বছরই মানুষ ভালো ছিল। দেশের যা উন্নয়ন তা শুরু হয় ওই সময়ই।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের এবারের স্লোগান হচ্ছে শান্তির জন্য পরিবর্তন- পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পার্টি। এই স্লোগান সামনে রেখে সারা দেশে জনমত গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘মানুষ জাতীয় পার্টির নয় বছরের শামনামল দেখেছে। নব্বইয়ের পরে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির শাসনামলও দেখেছে। দেশের মানুষ বিশ্বাস করে জাতীয় পার্টির শাসনামলেই তারা ভালো ছিল। সুখে-শান্তিতে-নিরাপদে ছিল। এজন্য তারা আবার জাতীয় পার্টিকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়।’ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘নব্বইয়ের পরে দেশের একটি বড় অংশ ভোটার হয়েছে। তারা জাতীয় পার্টির শাসনামল সেভাবে দেখেনি। তাদের কাছে জাতীয় পার্টির শাসনামলের উন্নয়ন ও অগ্রগতির চিত্র পৌঁছে দিতে হবে। এজন্য আমরা বিশেষভাবে উদ্যোগ নিয়েছি। নির্বাচনের আগেই নতুন প্রজন্মের মাঝে জাতীয় পার্টির উন্নয়নের বার্তা আমরা পৌঁছে দিতে চাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির নয় বছরের উন্নয়ন নিয়ে ইতিমধ্যে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করা হয়েছে। ‘কি করেছি, কি করতে চাই’- এই শিরোনামে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক ৬শ’ কর্মকাণ্ডের যেমন ফিরিস্তি দেয়া আছে, তেমনি আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে কি করবে জাতীয় পার্টি- তারও বর্ণনা দেয়া আছে। পুস্তিকাটি নির্বাচনের সময় সারা দেশে ভোটারদের মাঝে বিলি করা হবে। এছাড়া হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নয় বছরের উন্নয়ন নিয়ে একাধিক প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কাজ চলছে। নির্বাচনের সময় জনমত গড়ে তুলতে পাড়ায়-মহল্লায়, গ্রামগঞ্জে, হাটবাজারে এই প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হবে। ‘জাতীয় পার্টির শাসনামলে কেমন ছিল বাংলাদেশ, এখন কেমন আছে বাংলাদেশ’- এই শিরোনামে আরও একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ এবং একটি আলাদা পুস্তিকা প্রকাশের উদ্যোগ চলছে। এতে নব্বই-পরবর্তী সরকারের শাসনামলের খুন-গুম-অপহরণ, দ্রব্যমূল্য, অর্থনীতি, সামাজিক অবস্থাসহ উল্লেখযোগ্য নানা দিক তুলে ধরা হবে।

জাতীয় পার্টির নীতিনির্ধারকরা জানান, প্রচার-প্রকাশনার মধ্য দিয়ে জনমত গড়ে তোলার পাশাপাশি শিগগিরই নতুন সদস্য সংগ্রহ অভিযান শুরু করবে জাতীয় পার্টি। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আগামী ২৪ মার্চের মহাসমাবেশের পরপরই সদস্য সংগ্রহের কাজে নামবে দলটি। নতুন সদস্যদের জাতীয় পার্টিতে টানার জন্য ইতিমধ্যে ‘কেন জাতীয় পার্টি করবেন?’- শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করা হয়েছে। পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য সাহিদুর রহমান টেপার লেখা বইটি সারা দেশে বিলি করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এছাড়া জাতীয় পার্টির নেতাকর্মী, সদস্য, সমর্থক এবং শুভানুধ্যায়ীদের এক প্ল্যাটফর্মে আনতে কেন্দ্রীয়ভাবে ডাটাবেজ তৈরির একটি মেগা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে ‘জাতীয় পার্টির সমর্থক গোষ্ঠী’- নামে একাধিক ফেসবুক পেজ খোলা হয়েছে। এসব পেজ থেকে পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদারের বক্তব্য, বিবৃতি প্রচার করা হচ্ছে।

সূত্র জানায়, এসব উদ্যোগের পাশাপাশি ৩শ’ আসনে দলের আগ্রহী প্রার্থীদের কার কি অবস্থান তা যাচাই-বাছাই করার জন্য জরিপ চালাচ্ছে জাতীয় পার্টি। এজন্য একাধিক উচ্চ পর্যায়ের টিম গঠন করা হয়েছে। এই টিমের সদস্যরা পার্টির চেয়ারম্যান এবং মহাসচিবের কাছে মাঠ পর্যায়ের প্রার্থীদের অবস্থান, জনপ্রিয়তা এবং সাংগঠনিক ভিত্তির তথ্য তুলে ধরছেন। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে জরিপের কাজটি চলছে বলে জানা গেছে। জরিপ অনুযায়ী প্রায় দেড়শ’ প্রার্থীর একটি প্রাথমিক তালিকাও চূড়ান্ত করেছেন জাতীয় পার্টির দুই শীর্ষ নেতা। চলছে নির্বাচনী ইশতেহার প্রণয়নের কাজ। সরকার গঠন করতে পারলে প্রাদেশিক ব্যবস্থা চালুসহ বেশ কিছু পরিকল্পনার কথা থাকবে এতে। এছাড়া বিভিন্ন অঙ্গ এবং সহযোগী সংগঠনের প্রায় ২০ হাজার তরুণ নেতাকর্মীকে নির্বাচনের আগে প্রশিক্ষণ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জাতীয় পার্টি। ভোটের দিন বিভিন্ন কেন্দ্রে এরা দায়িত্ব পালন করবে। ইতিমধ্যে জাতীয় যুব সংহতির উদ্যোগে কক্সবাজারে একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচি শেষ হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও একাধিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চলবে বলে জানিয়েছেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আহসান শাহজাদা।

জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে জাতীয় পার্টির মহাসচিব সাবেক মন্ত্রী এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার যুগান্তরকে বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে জয়ী হতে যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার আমরা তা নিচ্ছি। কোথাও কোনো ঘাটতি থাকুক আমরা তা চাই না। এজন্য ইতিমধ্যে একটি নির্বাচনী রোডম্যাপও আমরা তৈরি করেছি। সে অনুযায়ী এগিয়ে চলছি। এই রোডম্যাপের অংশ হিসেবেই আগামী ২৪ মার্চ ঢাকায় মহাসমাবেশ করব। এই সমাবেশে জাতীয় পার্টির শক্তি এবং সামর্থ্যরে বিষয়টি জানান দেয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভোটের মাঠে সফল হতে জনমত গড়ে তোলা প্রয়োজন। আমরা এই কাজটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে করছি। জনমত গড়ে তুলতে জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নয় বছরের শাসনামলের উন্নয়নের চিত্র যেমন দেশবাসীর সামনে তুলে ধরা হবে, তেমনি নির্বাচনে জয়ী হলে কি করব- সেই বার্তাও জনগণকে দেয়া হবে। এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের সামনে এখন একটাই লক্ষ্য- তা হচ্ছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভালো ফলাফল অর্জনের মাধ্যমে জাতীয় পার্টিকে ক্ষমতায় নেয়া।’

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here