জাতীয় শোক দিবস পালিত | ভালোবাসা, শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ

0
13
বাবার কবরে ফুল দেওয়ার পর ছোট বোন শেখ রেহানার হাত ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তাঁরা l ছবি: ফোকাস বাংলা

রাজধানীর পথে পথে কালো পতাকা। মাইকে বজ্রনির্ঘোষ কণ্ঠে সেই অবিস্মরণীয় ভাষণ, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। এর সঙ্গে দেশাত্মবোধক গান বেজেছে সারা দিন। শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ঢেকে দিয়েছে অগণিত মানুষ। তিনি না থেকেও দেশজুড়ে কাল তিনিই ছিলেন গণমানুষের মধ্যমণি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন ছিলেন তাঁর জীবদ্দশায়।

গভীর শোক, বিনম্র শ্রদ্ধা আর হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসায় জাতি গতকাল মঙ্গলবার স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেছে। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি এবং গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ঢেকে যায়।

ঢাকাসহ সারা দেশেই পাড়া-মহল্লায়, পথের মোড়ে মোড়ে শামিয়ানা টানিয়ে করা হয়েছিল গরিব-দুঃখীদের মধ্যে খাদ্য বিতরণের ব্যবস্থা। আরও ছিল স্বেচ্ছায় রক্তদান, শোক মিছিল, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা সভা, কোরআনখানি, মিলাদ মাহফিল, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনাসহ নানা কর্মসূচি।

গতকাল ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে সব সরকারি, বেসরকারি, আধা সরকারি ভবন, বিচারালয়সহ বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও কূটনৈতিক মিশনগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হয়। দিনটি ছিল সরকারি ছুটি।

সকাল সাড়ে ছয়টায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদনের মাধ্যমে জাতীয় শোক দিবসের কর্মসূচির সূচনা হয়। সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে একসঙ্গে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। তাঁরা সেখানে কিছু সময় নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন। সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়। এ সময় বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। পরে তাঁরা মোনাজাতে অংশ নেন।

রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী ও প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা শ্রদ্ধা জানান। পুনরায় প্রধানমন্ত্রী দলীয় নেতাদের নিয়ে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দল এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত, আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ, মতিয়া চৌধুরী, মোহাম্মদ নাসিম, সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, ওবায়দুল কাদের, নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রমুখ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের মধ্যে ছিলেন আবদুর রাজ্জাক, মাহবুব উল আলম হানিফ, আহমদ হোসেন, হাছান মাহমুদ, আবদুস সোবহান প্রমুখ।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত বাড়ির ভেতরে যান। সেখানে তাঁর বাবার স্মৃতিচিহ্ন পরিদর্শন করেন এবং প্রায় আধা ঘণ্টা সময় কাটান। যে সিঁড়িতে বঙ্গবন্ধুর মরদেহ পড়ে ছিল, সেখানে তিনি গোলাপের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন। পরে ওই ভবনের একটি কক্ষে বসে কিছু সময় পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করেন শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর ছোট বোন শেখ রেহানা উপস্থিত ছিলেন।

এরপর প্রধানমন্ত্রী বনানী কবরস্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রওনা হন। সকাল সাড়ে সাতটার দিকে বনানী কবরস্থানে প্রধানমন্ত্রী ১৫ আগস্টের শহীদদের কবরে পুষ্পমাল্য অর্পণ করেন। তিনি ও শেখ রেহানা কবরে ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে দেন। এরপর পবিত্র ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রিসভার সদস্য ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এসব কর্মসূচি শেষে হেলিকপ্টারে করে টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যান প্রধানমন্ত্রী। সেখানে আগের দিন থেকেই আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি দল অবস্থান করছিল। টুঙ্গিপাড়ায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী মেজবানের আয়োজন করেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা নিবেদনের পরই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর এলাকা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। হাতে কালো ব্যানার ও বুকে কালো ব্যাজ পরে নারী-পুরুষ, স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রী, শিশু-কিশোরসহ সর্বস্তরের মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে আসে। মিরপুর বাঙলা কলেজের শিক্ষার্থী আতিকুর রহমান বলেন, বঙ্গবন্ধু দলমত–নির্বিশেষে সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তাঁকে সম্মান জানানোর অর্থ নিজেদের সম্মানিত করা। কারণ, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।

দুপুরে বঙ্গবন্ধুর শাহাদতবার্ষিকী ও জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গভবনে মিলাদ ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ অংশ নেন। বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে বিশেষ মোনাজাত করা হয়। সুপ্রিম কোর্ট রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করে। কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা।

শোক দিবস উপলক্ষে সংবাদপত্রে বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার এবং বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করে বিশেষ অনুষ্ঠান।

আরও যাঁরা শ্রদ্ধা জানান

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাজধানীর যে পথ দিয়ে সেনাবাহিনীর ট্রাক ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে গিয়েছিল, সোমবার রাতে সে রাস্তায় মশাল মিছিল করে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান নামে একটি সংগঠন। ৪২টি মশাল নিয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর টিঅ্যান্ডটি মাঠ থেকে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়ক পর্যন্ত এই মিছিল করা হয়।

শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা জানানো প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় প্রেসক্লাব, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ পরিবার, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর, নজরুল ইনস্টিটিউট, শিশু একাডেমী ও খেলাঘর।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here