সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী…’। এ গান গাইতে যেমন মজা, শুনতেও দারুণ

0
7
সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী...’। এ গান গাইতে যেমন মজা, শুনতেও দারুণ

গ্রামবাংলার অসম্ভব জনপ্রিয় এক গান—‘সাধের লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী…’। এ গান গাইতে যেমন মজা, শুনতেও দারুণ, কিন্তু গানের মর্ম কোনো দিন বুঝিনি। লাউয়ের আগা খাইলাম, ডগা খাইলাম—ভালো কথা, কিন্তু বৈরাগ্য কেন?

হ্যাঁ, শুকনো খটখটে লাউয়ের খোল দিয়ে বাউলের একতারা হয় বটে, কিন্তু এখানে তো বলা হয়েছে ডুগডুগির কথা। ছোটবেলায় ডুগডুগির তালে বানরের নাচ অনেক দেখেছি। শৈশবে স্কুলের কাছেই ছিল পুলিশ প্যারেড ময়দান। সেখানে সকাল-বিকেল সাপের খেলা আর বানরের নাচ হতো। ডুগডুগি বাজিয়ে সাপুড়ে বা বানরওয়ালা হাঁক দিত, ‘বাচ্চা লোক, তালিয়া বাজাও!’

আমরা তালু ফাটিয়ে হাততালি দিতাম। কাজেই ডুগডুগির কথা শুনলে বানরের নাচ চোখ ভাসে, সংসারত্যাগী বৈরাগীর চেহারা দেখি না। এখানে বৈরাগী আসবে কোত্থেকে? ভরা মৌসুমে বাজারে লাউয়ের যে দাম, তাতে ওর সবুজ গায়ে মুনাফাখোর বদরাগী মহাজনের ছবি ভাসে, পানসে চেহারার বৈরাগীর দেখা মেলে না।

গ্রামগঞ্জে ‘ভাও’ বলে একটা কথা আছে। বলে, ‘দয়াল, ভাও কইরা দেও।’ যুগ যুগ ধরে লাউ দিয়ে এই ভাও করার আয়োজন কিন্তু কম নয়। সেকালে টোলের গুরুমশাইয়ের আনুকূল্য পেতে পাড়াগাঁয়ের অনেক মা-বাবা মাচার সুপুষ্টু লাউটা শিশুসন্তানের কাছে দিয়ে দিতেন। সে তখন এক হাতে বই, আরেক হাতে ওজনদার লাউটা সস্নেহে সামলে গুরুর বটতলার পাঠশালায় হাজির হতো, গুরুজির আকর্ণ হাসি লাউয়ের মতো ঝুলে পড়ত। মাচাভরা লাউ স্বজন-শুভানুধ্যায়ী আর পাড়াপড়শির হাতে বিলিয়ে দিয়েও তৃপ্তি। সম্পর্কের বন্ধনে সংগত কারণেই দুফোঁটা মধু পড়ে তখন। বড় কোনো জিয়াফত বা দাওয়াতে লাউয়ের সঙ্গে অন্যান্য সবজির মিশেল ঘন্ট বেশ বরকত দেয়। ‘দুধকদু’ বলে ঘন দুধে লাউয়ের যে একটা মিষ্টান্ন হয়, এর কদরও কিন্তু কম নয়। লাউ দিয়ে মাছ-মাংসের এমন কিছু পদ রয়েছে, পাতে দিলে লাজ ভুলে বলতে হবে, ‘আরেকটু দাও!’

লাউয়ের সঙ্গে তাই এই ‘দাও’ যত মানায়, ত্যাগ-তিতিক্ষার বৈরাগ্য ঠিক যায় না। এই ধন্দ আর ঘোর-চক্কর নিয়েই ছিলাম এত দিন, ভুল ভাঙল বুধবার। এক লাউ নিয়ে কাইজ্যায় ৫০ জন আহত হওয়ার খবরটা যখন পড়লাম। এক কেজি ওজনের লাউ এমন ডুগডুগি বাজিয়েছে, সমরনৃত্যে মাতাল হয়েছে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার দুই গ্রামের মানুষ। তাঁদের সম্মুখসমরে আহত কমপক্ষে ৫০। ২৪ জন চিতপটাং হাসপাতালে।

শান্তিপুর জামে মসজিদের জমিতে একটি লাউ জন্মে। বুধবার দুপুরে এটি নিলামে তোলা হয়। এক কেজি ওজনের লাউটির নিলাম ডাক দেন পাশের মর্দনপুর গ্রামের কবির মিয়া। লাউটির দাম ৬০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এ সময় বাধা দেন শান্তিপুরের জালাল মিয়া। তাঁর দাবি, অন্য গ্রামের মানুষ এখানে নাক গলাবে কেন? এ নিয়ে তর্কাতর্কি, একপর্যায়ে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে লাঠিসোঁটা আর ধারালো অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষ। তা থেকে অর্ধশত লোক আহত। তবে লাউয়ের যে কী গতি হয়েছে, শেষতক জানা যায়নি। সে কি এখনো ডুগডুগি বাজিয়েই যাচ্ছে? হবে হয়তো।

লাউ স্ফীতোদর নিতান্ত নিরীহ ঝুলন্ত সবজি বটে, কিন্তু তার সুপ্ত তেজ যে কী, তা তো বোঝা গেল। এখন লাউয়ের দিকে হাত বাড়ানো মানেই যদি টেঁটা-লাঠি হয়, সেখানে ভোগের আশা ত্যাগ করে বৈরাগ্য ধারণ ছাড়া উপায় কী? এ জন্যই তো গান হয়েছে—‘লাউ বানাইল মোরে বৈরাগী!’

পুলিশ এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ঘটনাস্থল থেকে দেশীয় অস্ত্রসহ আটজনকে আটক করে। পরে তাঁদের ভ্রাম্যমাণ আদালতে হাজির করা হয়। ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক বানিয়াচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স্বদ্বীপ কুমার সিংহ উপস্থিত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং আটক ব্যক্তিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন। ৪০ টাকা দামের লাউয়ের নিলাম উঠল ৬০০ টাকা! আর তা নিয়ে বিবাদে জরিমানা হলো ১০ হাজার টাকা, আহত হলো ৫০ জন ! সত্যিই, লাউ তুমি বৈরাগী বানাও বটে!

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here