খাদিজার লড়াই অন্যদের জন্য দিশা

0
59

পাকিস্তানের আইনের ছাত্রী খাদিজা সিদ্দিকীর ওপর তাঁর সহপাঠী এক যুবক ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। তাঁকে ২৩টি ছুরিকাঘাত করা হয়। সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান তিনি। শত প্রতিকূলতায় হাল ছাড়েননি খাদিজা। ন্যায়বিচার পেতে লড়েছেন। প্রভাবশালী হামলাকারী যুবক এখন জেলের ভাত খাচ্ছেন।

সম্প্রতি নিজের ‘দ্বিতীয়’ জীবনের গল্প শুনিয়েছেন খাদিজা। এক নিবন্ধে এই তরুণী লিখেছেন, নৃশংস হামলার পর বেঁচে যাওয়া এবং আইনি বিজয়কে তিনি আরও অর্থপূর্ণ জীবনযাপনের এক সুযোগ হিসেবে দেখছেন।

২০১৬ সালের ৩ মে প্রকাশ্যে লাহোরের রাস্তায় খাদিজার ওপর হামলা চালান তাঁর সহপাঠী শাহ হুসাইন। ছোট বোনকে স্কুল থেকে আনতে গিয়েছিলেন খাদিজা। এ সময় তাঁর ওপর হামলা হয়। ২৩টি কোপ পড়ে তাঁর শরীরে। সৃষ্টি হয় গভীর ক্ষত। বলতে গেলে অলৌকিকভাবেই বেঁচে যান তিনি।

চুপ না থেকে ন্যায়বিচারের জন্য আইনি লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নেন খাদিজা। কিন্তু তাঁর আইনি লড়াইয়ের পথ মোটেও মসৃণ ছিল না। পদে পদে ছিল প্রতিকূলতা। সাহস হারাননি তিনি। দৃঢ় মনোবল নিয়ে এগিয়ে গেছেন। শেষ পর্যন্ত তাঁরই জয় হয়েছে।

গত মাসের শেষদিকে খাদিজার মামলার রায় দিয়েছেন লাহোরের একটি আদালত। হামলাকারীর সাত বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এখন তিনি জেলে।

বিচারপ্রক্রিয়ার কথা স্মরণ করে খাদিজা লিখেছেন, এটা নিছক একটা বিচার ছিল না। এর সঙ্গে তাঁর ধৈর্য, মর্যাদা ও নৈতিক বিষয় জড়িত ছিল।

আদালতে শুনানিকালে খাদিজাকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল। মামলায় তাঁকে হারিয়ে দিতে সব চেষ্টাই করেছে আসামিপক্ষ। এমনকি খাদিজার চরিত্রহননেরও চেষ্টা হয়েছে। একাধিক অবৈধ সম্পর্ক ছিল—এমন অপবাদও তাঁকে দেওয়া হয়েছে। এসব শোনা তাঁর জন্য বেশ কষ্টকর ছিল।

খাদিজা বিশ্বাস করতেন, যত যা-ই হোক না কেন, ‘সত্যের জয় হবেই।’

আইনি লড়াইটাকে শুধু নিজের হিসেবে ভাবেননি খাদিজা। পাকিস্তানে যেসব নারী ও মেয়ে নীরবে সব অন্যায়-অবিচার সয়ে যান, তাঁদের হয়ে লড়াই করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন তিনি। বর্বরতার কথা সবাইকে জানিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

খাদিজা লিখেছেন, এটা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় ছিল না। ব্যক্তি খাদিজার চেয়ে অনেক বড় বিষয় এখানে যুক্ত। পাকিস্তানে যেসব নারী প্রতিদিন সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়ে বিচার থেকে বঞ্চিত হন, তাঁদের সবার সঙ্গে বিষয়টি জড়িত।

বিচার পর্যায়ে খাদিজার আকাঙ্ক্ষায় ছিল নিরাপত্তাবোধ। তিনি ডরভয় ছাড়াই বাইরে মুক্তভাবে হাঁটাচলা করার নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন। আর এর জন্য তাঁর হত্যাচেষ্টাকারীকে জেলে দেখতে চেয়েছেন।

খাদিজা দৃঢ়তার সঙ্গে তাঁর অন্তরে এই বিশ্বাস স্থাপন করেছিলেন যে, তাঁর ওপর হামলাকারী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, তিনি কোনোভাবেই ছাড় পেতে পারেন না। কৃতকর্মের জন্য হামলাকারীকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে।

নারীর প্রতি সহিংসতার মামলায় ভুক্তভোগীকে (নারী) দোষারোপ করে অপরাধীর অপরাধ জায়েজের একধরনের চেষ্টা লক্ষ করা যায়। খাদিজার মামলার ক্ষেত্রেও তেমনটি হয়েছে। আসামিপক্ষের আইনজীবী তাঁর নীতিনৈতিকতা ভুলে খাদিজাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালিয়েছেন। শুনানিতে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী নানা প্রশ্ন করেছেন। তবে সব উদ্ভট প্রশ্নই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন খাদিজা। জয় তাঁরই হয়েছে।

খাদিজার বিশ্বাস, তাঁর সাফল্যের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে। ‘হাল ছেড় না, দৃঢ় চিত্তে লড়’—এই শিক্ষাই তাঁরা এখান থেকে পাবেন।

দ্য ডন পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ অবলম্বনে মেহেদী হাসান

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here