‘গান্ধীর’ সেই জোর কোথায়?

0
81

ভারতের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। দলটির নেতৃত্বে নেহরু-গান্ধী পরিবারের সদস্যরা। স্বাধীনতার পর থেকেই কখনো ক্ষমতায়, কখনোবা বিরোধী দলের ভূমিকায় থেকেছে কংগ্রেস। তবে ২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে পরাজয় এবং এরপর বিধানসভা নির্বাচনে একের পর এক ভরাডুবির কারণে কংগ্রেস নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

সর্বশেষ ভারতের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হারের পর দলটির জনপ্রিয়তা তলানির দিকে ঠেকেছে কি না, সেই সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে দেশটির কয়েকটি গণমাধ্যমে। বলা হচ্ছে, নেহরু-গান্ধীর পরিবারের প্রতি জনগণের যে টান ছিল—তা কি পড়তির দিকে? গান্ধী পরিবারের ‘ব্র্যান্ড নেমে’ কি আর কাজ হচ্ছে না?

গত শনিবার ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল বিজেপির প্রার্থীর কাছে হেরে যান কংগ্রেস-সমর্থিত প্রার্থী। গত মাসে বিজেপির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ ভোটের লড়াইয়ে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ প্রার্থী মীরা কুমারকে হারান। এর মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো ভারতের রাষ্ট্রপতি, উপরাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী—শীর্ষ এই তিনটি পদই বিজেপির দখলে গেল।

দেশের শীর্ষ তিনটি পদ বিজেপির দখলে যাওয়া আর একের পর এক বিধানসভায় হেরে যাওয়ায় কংগ্রেসের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর প্রপৌত্র ৪৭ বছর বয়সী রাহুল গান্ধীর নেতৃত্ব নিয়েই কথা উঠেছ বেশি। দলটির সহসভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন তিনি। রাহুলের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্নের শুরু ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচন দিয়ে। তাঁর ব্যাপক প্রচারণার পরও লোকসভার ৫৪৩ আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র ৪৪টি আসন পায়। তারপর শুরু হয় বিধানসভার নির্বাচনগুলোতে একের পর এক হার।

ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস থিংকের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মিলান বৈষ্ণবের মতে, কংগ্রেস এখন দুটি বড় সমস্যার মধ্য পড়েছে। প্রথমত, নেতৃত্বের অভাব; দ্বিতীয়ত, ভবিষ্যতের জন্য সংহতিপূর্ণ উচ্চাকাঙ্ক্ষার অনুপস্থিতি।

গুজরাটে রাহুলের ওপর হামলার পর কংগ্রেস নেতাদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপিমিলান বৈষ্ণব বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে হারের পর দুর্বলতাগুলোর ব্যাপারে কংগ্রেসের কোনো উন্নতি হয়নি। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দল হিসেবে কংগ্রেস ভবিষ্যতে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে পড়বে।’

বিজেপি ক্ষমতায় থাকলেও গত সপ্তাহেই মাত্র উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় সর্ববৃহৎ দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। যার ফলে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হাত আরও শক্তিশালী হলো—তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কারণ, রাজ্যসভার চেয়ারম্যান হলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট।

ভারতের প্রায় ৭০ বছরের ইতিহাসে ৫০ বছরের বেশি দেশটি শাসন করেছে কংগ্রেস; এর অধিকাংশই নেহরু ও তাঁর বংশধরদের হাতেই ছিল শাসনভার। নেহরু, তাঁর কন্যা ইন্দিরা গান্ধী ও নাতি রাজীব গান্ধী ছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।

কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনে হতাশজনক ফলাফলের পর থেকে ‘প্রকৃতিগতভাবে জন্ম নেওয়া নেতাদের’ দল কংগ্রেস যেন যথাযথ নেতৃত্বের অভাবে ভুগছে। ‘বহিরাগত’ তকমা সাঁটানো ইতালিতে জন্ম নেওয়া সোনিয়া গান্ধীও যেন এগিয়ে আসতে পারছেন না। কংগ্রেস সভাপতি ৭০ বছর বয়সী সোনিয়া মাঠে নেমেও গত মার্চে উত্তর প্রদেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় নির্বাচনে কংগ্রেস জোটের পরাজয় ঠেকাতে পারেননি।

মুম্বাইভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্বরাজের সম্পাদকীয় পরিচালক আর জগন্নাথন বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি মনে করি “গান্ধী” নামটির এখন আর সেই “বিক্রয়মূল্য” নেই। রাহুলের মায়ের রাজনীতিতে আগ্রহ আছে, কিন্তু রাহুলকে ঠিক ততটা আগ্রহী বলে মনে হয় না…তিনি (রাহুল) নেতৃত্বের জন্য অনুপযুক্ত।’

গত মাসে বিহারের রাজ্য রাজনীতিতে মধ্যস্থতা করতে ব্যর্থ হন রাহুল গান্ধী। আর এই সুযোগে সেখানে ক্ষমতার অংশ হয়ে যায় বিজেপি। আর বিহারের এ অবস্থার কারণে তাঁর (রাহুল) দলীয় আনুগত্যও সন্দেহের মুখে ঠেলে দিয়েছে বলে মনে করেন কেউ কেউ।

রাহুলের দিকে কংগ্রেসের কর্মী-সমর্থকেরা তাকিয়ে থাকলেও তিনি সেভাবে দলকে এগিয়ে নিতে পারছেন না। ছবি: এএফপিজগন্নাথন পরামর্শ দেন, একসময় প্রভাবশালী এই পরিবারকে ‘সত্যিকারের তৃণমূল নেতাদের’ জন্য পথ তৈরি করে দিতে হবে। কিন্তু ওয়াশিংটন-ভিত্তিক আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক সদানন্দ দুমে মনে করেন, নেতৃত্বে পরিবর্তন আনাটাও সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে দলটিতে।

কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে, রাহুলের ছোট বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকেই বেশির ভাগ মানুষ কংগ্রেসে রাহুলের বিকল্প নেতা হিসেবে দেখেন। কিন্তু তাঁর স্বামী রবার্ট ভদ্রের সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিতর্ক চলছে। এ ছাড়া দলে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে তিনি ততটা আগ্রহী নন বলেই মনে হয়।

ভারতের ২৯টি রাজ্যর মধ্য ১৮ টিতেই এখন ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি বা তার মিত্ররা। অন্যগুলোর দিকেও দৃষ্টি তাদের। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কী করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

এএফপি, ইকোনমিক টাইমস ও ডেইলি মেইল অবলম্বনে শাওন

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here