জেনারেলদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আসছে

0
57

রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়নের কারণে মিয়ানমারের জেনারেলদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তাভাবনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র। তারা মনে করছে, রোহিঙ্গা সংকটের মূল হোতা মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ও তার অধীনস্থ জেনারেলরা। ফলে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতেই হবে।

রোহিঙ্গা সংকটের সুরাহা না হলে মিয়ানমারে বিনিয়োগ বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিতে পরে ইইউ জোট। এছাড়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আর কী পদক্ষেপ নেয়া যায় তা নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ১৬ অক্টোবর বৈঠকে বসবেন। এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ ও নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে প্রস্তাব উত্থাপনের বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে। ওয়াশিংটন, ইয়াংগুন ও ইউরোপভিত্তিক ১২ জনের বেশি কূটনীতিক ও সরকারি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের শীর্ষ জেনারেলদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেকগুলো বিষয় নিয়ে ভাবা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে এখনও কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ওয়াশিংটন ও ইইউর সদর দফতর ব্রাসেলস এ জন্য আরও কিছু সময় নিতে পারে। মিয়ানমার নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের আলোচনা সম্পর্কে অবগত দুই মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইয়াং এবং তার অধীনস্থ কয়েকজন জেনারেল এবং রোহিঙ্গাদের গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়ার অভিযোগে রাখাইন বৌদ্ধ মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিবেচনা করে দেখা হচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হলে তাদের যুক্তরাষ্ট্রে থাকা সম্পদ জব্দ, যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষিদ্ধ, তাদের সঙ্গে আমেরিকানদের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধসহ আরও কিছু বিষয় আসতে পারে। মার্কিন ওই দুই কর্মকর্তা বলেন, বিষয়টি নিয়ে ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সরকারের সঙ্গে আলোচনার কারণে ওয়াশিংটন এ বিষয়ে সাবধানতার সঙ্গে এগোচ্ছে। এছাড়া রাখাইনে সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য সহায়তা বাড়ানোর বিষয় নিয়েও আলোচনা চলছে।

এক মাস আগেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি ছিল কল্পনাতীত। এখন এটা ভাবা হচ্ছে। এতেই প্রমাণিত হয়, সেনাবাহিনীর নির্যাতনে মিয়ানমারের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাখাইন রাজ্য থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ পশ্চিমা নীতিনির্ধারকদের কতটা চাপে ফেলেছে।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে সেনাবাহিনীর ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিশ্বজুড়ে শান্তিতে নোবেলজয়ী গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সমালোচনা চলছে। তবে বেশিরভাগ পশ্চিমা কূটনীতিকই মনে করছেন সু চির বিকল্প নেই।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ১৬ অক্টোবর মিয়ানমার প্রসঙ্গে বৈঠকে বসবেন। তবে তারা মনে করছেন খুব শিগগিরই নিষেধাজ্ঞা বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে না। নেদারল্যান্ডসের উন্নয়ন সহযোগিতা বিষয়কমন্ত্রী উলা টর্নায়েস রয়টার্সকে বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর আরও চাপ প্রয়োগ করতে’ কোপেনহেগেন সংকটের বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে আনার চেষ্টা চলছে।

ইয়াংগুনে নিয়োজিত ইউরোপীয় এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, পশ্চিমা দেশগুলো এই সংকট নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে। তারা এ বিষয়ে একমত যে, সমস্যার মূলে সেনাবাহিনী, বিশেষত সেনাপ্রধান। তার বিরুদ্ধে কোনো না কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নেয়া দরকার। ইয়াংগুনভিত্তিক কূটনীতিকরা বলছেন, আলোচনার দ্বার খোলা রাখতে প্রথম পর্যায়ে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ প্রতীকী বা নমনীয় হতে পারে। তারা উদাহরণ টেনে বলেন, সেনাপ্রধান গত বছর ব্রাসেলস, বার্লিন ও ভিয়েনা সফর করলেও এখন তার ইউরোপ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হতে পারে।

১৮ মাস আগে সু চি ক্ষমতায় আসার পর মিয়ানমারের সঙ্গে পশ্চিমাদের সুসম্পর্ক দেখা দিলেও চীনের তুলনায় তা নগণ্য বলে স্বীকার করেন কূটনীতিকরা। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের তেমন বিনিয়োগ নেই, সামরিক সংশ্লিষ্টতাও কম। ফলে তাদের পক্ষে বেশি কিছু করা কঠিন। এ ছাড়া কোনো পদক্ষেপ নিলে অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত বা অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে, যা সু চি ও সেনাবাহিনীর সম্পর্ক আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

মার্কিন ও ইইউ কূটনীতিকরা বলছেন, মিয়ানমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়ার ক্ষেত্রে তারা রাখাইনে ত্রাণ তৎপরতা বাড়ানো, নিপীড়নের অভিযোগ তদন্ত এবং শরণার্থীদের ফেরত নেয়ার বিষয় গুরুত্ব দেবে। মিয়ানমারের ওপর চাপ প্রয়োগ নিয়ে ব্রাসেলসভিত্তিক একজন ইইউ কূটনীতিক বলেন, ‘আমরা রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারি। আবার সেখানে আমাদের যে বিনিয়োগ আছে, তা খতিয়ে দেখতে পারি। আমাদের মানবিক ও উন্নয়ন সহায়তা আছে… কিন্তু নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ অবস্থার উন্নতি না হলে মিয়ানমারের উন্নয়নে কোনো বিনিয়োগ করবে না ইউরোপীয় কমিশন।’ এই কূটনীতিক আরও বলেন, ‘এখানে অস্ত্র বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে। আমরা নিয়মিত আলোচনা করছি, আমরা কি মিয়ানমারকে সংস্কারের জন্য পুরস্কৃত করব, ধীরে ধীরে ওই নিষেধাজ্ঞা শিথিল করব, নাকি আরও কঠোর হব।’

২০১২ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সরাসরি দেশ পরিচালনা থেকে সরে দাঁড়ালে দেশটির ওপর থেকে ইইউ অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে। তবে নব্বইয়ের দশক থেকে চলে আসা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল আছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের ওপর থেকে বেশির ভাগ নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলেও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা রেখেছে। ওয়াশিংটনে নিয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বলেন, নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা না থাকলেও আগামী নভেম্বরের প্রথমার্ধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এশিয়া সফরের সময় মিয়ানমার বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়ার পরিকল্পনায় পৌঁছানোর আশা করছে ওয়াশিংটন।

ওই কর্মকর্তা বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে একটি কড়া বার্তা দিতে চাইছে প্রশাসন। কিন্তু এই বার্তাই আবার দেশটির ওপর চীনের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব আরও বাড়িয়ে দেয় কিনা তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে আবারও মিয়ানমারের ওপর বড় পরিসরে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে প্রশাসনের তেমন সমর্থন নেই। রয়টার্সের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে অভ্যন্তরীণ চিন্তাভাবনা কী, তা জানতে চাইলে কোনো মন্তব্য করেনি হোয়াইট হাউস।

নিউইয়র্কে কর্মরত কূটনীতিকরা বলছেন, মিয়ানমারের ওপর আরও চাপ বাড়াতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেশটির মানবাধিকার লংঘনের বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করতে পারে ইসলামী সম্মেলন সংস্থার সদস্য দেশগুলো। সংস্থার চলতি অধিবেশন ইইউ ওআইসির এ ধরনের প্রস্তাবে সমর্থন দিতে পারে।

কূটনীতিকরা বলছেন, নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্য দেশ খতিয়ে দেখতে শুরু করেছে যে, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি কিংবা প্রস্তাব পাস করা যায় কিনা যেখানে রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, পুরোদমে ত্রাণ তৎপরতা ও রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার আহ্বান জানানো হবে। তবে এ ধরনের প্রস্তাব থেকে রক্ষা পেতে মিয়ানমার চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি দেশের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে নিরাপত্তা পরিষদে।

image_pdfimage_printPrint

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here